করোনা ফোকাস জাতীয়

করোনা জয় করে উঠছে বাংলাদেশ

বাংলাদেশে করোনা সংক্রমণের সাড়ে চার মাস পেরিয়ে গেছে। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতি এবং সংক্রমণ নিয়ে যে আতঙ্ক, উদ্বিগ্নতা, উৎকণ্ঠা তা ক্রমশ কেটে যাচ্ছে।

এখন মানুষের করোনার ব্যাপারে তেমন আগ্রহ নেই, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও আগের চেয়ে কমে গেছে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখের কিছু বেশি মানুষের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দুই লাখের কিছু বেশি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়েছে এবং তিন হাজারের কিছু বেশি মানুষ করোনায় মৃত্যুবরণ করেছে।

গত ৪ মাসের এই হিসেবে বলা হচ্ছে যে, আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৭ তম অবস্থানে রয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশ ২৭ তম অবস্থানে রয়েছে। তবে এসব তথ্যের বাইরে যে তথ্যটি বলা হচ্ছে না তা হচ্ছে, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল দেশ এবং জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে অষ্টম। কাজেই এরকম একটি জনবহুল আর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় করোনা সংক্রমণের পরেও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত যেভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে তাতে তা বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এর পেছনে সবথেকে বড় কারণ হচ্ছে বাংলাদেশে গত ৪ মাস যাবত যে সমস্ত আতঙ্ক, পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে তা প্রায় সবই ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশে করোনা একটি নির্দিষ্ট ধারায় চলছে এবং করোনা সংক্রমণের হার মোটামুটি একই পর্যায় বজায় রাখছে। এর ফলে বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে বা বাংলাদেশে মৃত্যুর মিছিল হবে বলে যে ধরণের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছিল তা সত্যি হয়নি। বরং করোনা আর ৮-১০ টি রোগের মতো স্বাভাবিক রোগ হিসেবে মানবজীবনে এসেছে এবং মানুষ করোনায় অভ্যস্ত হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, এখন করোনায় আক্রান্ত হলেই মানুষ আগের মতো উদ্বিগ্ন হচ্ছে না, আতঙ্কিত হচ্ছে না। বরং মানুষ বাড়িতেই চিকিৎসা নিচ্ছে এবং ততক্ষণ পর্যন্ত হাসপাতালমূখী হচ্ছে না যতক্ষণ পর্যন্ত অবস্থা গুরুতর হচ্ছে। যার ফলে ২ লাখ ২০ হাজারের বেশি আক্রন্তের পরেও বাংলাদেশের হাসপাতালের উপর কোন চাপ পড়েনি। বরং অনেক হাসপাতালের শয্যা এখনো খালি রয়েছে। এই অবস্থার কারণে বাংলাদেশের মানুষ করোনাকে একটি জ্বর-সর্দি-কাশি বা ডায়বেটিসের মতো স্বাভাবিক রোগ হিসেবে গ্রহণ করতে অভ্যস্ত হচ্ছে এবং গত ৪ মাসে এইভাবেই মানুষ অভ্যস্ত হয়েছে যে, করোনা হলেই মৃত্যু ভয় বা করোনা হলেই একঘরে করতে হবে সেই অবস্থা এখন আর নেই।

তৃতীয়ত, করোনায় এখন শিশু-বৃদ্ধরা আক্রান্ত হচ্ছে কম এবং তাঁরা স্বাস্থ্যবিধি মানছেন। তরুণরা আক্রান্ত হচ্ছে এবং সুস্থ হয়ে যাচ্ছে- এমন একটি প্রক্রিয়ার কারণে করোনা নিয়ে যে উদ্বেগ এবং ভয় তা আমাদের মাঝে কাটতে শুরু করেছে।

চতুর্থত, ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত করোনা থেকে মুক্তির কোন পথ নেই- এরকম একটি ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে। তাই মানুষ করোনাকে মাথায় নিয়েই জীবন-জীবীকার কাজে অংশগ্রহণ করছে এবং আস্তে আস্তে অর্থনীতির চাকা সচল করার যে উদ্যোগ তা সফল হচ্ছে। মানুষ এখন মাস্ক পরা বা স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাকে একটি স্বাভাবিক জীবন প্রক্রিয়া হিসেবেই গ্রহণ করেছে। যার ফলে করোনার সঙ্গে বসবাসের একটি অভ্যস্ততা তৈরি হয়েছে মানুষের মাঝে।

পঞ্চমত, সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা ঢুকে গেছে যে, করোনা আমাদের গরীব মানুষদের আক্রান্ত করতে পারবে না বা গরীব মানুষ করোনায় কাবু হওয়ার সম্ভাবনা কম, এর ফলে এরা অনেকেই পরীক্ষা করাতে অনাগ্রহী, মৃদু উপসর্গ বা উপসর্গহীনভাবে তাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছে।

এভাবেই বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তা প্রায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি। মানুষ প্রায় সবকিছুই স্বাভাবিকভাবে করার ক্ষেত্রে আগ্রহী হচ্ছে, উদ্যোগী হচ্ছে এবং নিজেকে বাঁচিয়ে রেখে সবকিছু স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে যে অভ্যস্ততা, সেই অভ্যস্ততা মানুষ তৈরি করেছে। এইভাবে করোনার মধ্যে বসবাসের এক সংস্কৃতি বাংলাদেশে ইতিমধ্যে চালু হয়ে গেছে।