Bangladesh

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের ৪৯ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী আজ

আজ বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের ৪৯ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর এই মহান আত্মত্যাগকে স্মরণীয় করতে এবং আগামী প্রজন্মের সামনে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিাহাস তুলে ধরতে নড়াইলে নেওয়া সরকারি বিবিধ উদ্যোগ প্রসংশিত হলেও, এখনও এসব উদ্যোগের অনেক কিছুই রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ।

১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল জেলার মহিষখোলা গ্রামের এক দরিদ্র পরিবারে নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোহাম্মদ আমানত শেখ, মাতা জেন্নাতুন্নেসা। অল্প বয়সে বাবা-মাকে হারান ফলে শৈশবেই ডানপিটে হয়ে পড়েন। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়া শেষ করে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সপ্তম শ্রেণীর পর আর পড়াশোনা করেননি।

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গোয়ালহাটি যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার অন্তর্গত সীমান্তবর্তী এলাকা। এ গ্রামের পাশ দিয়ে কপোতাক্ষ নদ। গোয়ালহাটির পাশেই সুতিপুরে (বাংলাদেশের অভ্যন্তরে) ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা অবস্থান। এ অবস্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা প্রায়ই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর ঝটিকা আক্রমণ চালাতেন। তাঁদের এই আক্রমণের মাত্রা আগস্ট মাসে ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়ে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ ও গতিবিধি লক্ষ করার জন্য সুতিপুর প্রতিরক্ষার অগ্রবর্তী এলাকা গোয়ালহাটিতে নিয়োজিত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি স্ট্যান্ডিং পেট্রোল পার্টি। এই পেট্রোল পার্টির অধিনায়ক ছিলেন নূর মোহাম্মদ শেখ। তিনি সহযোদ্ধাদের নিয়ে নিষ্ঠার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করছিলেন।


পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৫ সেপ্টেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের এই স্ট্যান্ডিং পেট্রোলের অবস্থান কীভাবে যেন টের পেয়ে যায়। খবর পাওয়ামাত্র তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তিন দিক থেকে ছোট ওই পেট্রোল পার্টির ওপর আক্রমণ চালায়। জরুরি অবস্থা বুঝতে পেরে নূর মোহাম্মদ শেখ সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন।
কিন্তু পাকিস্তানি সেনারা ছিল অনেক ও অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। মুক্তিযোদ্ধারা বুঝতে পারেন, তাঁরা বেশিক্ষণ পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে পারবেন না। মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাঁরা পেছনে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। এ সময় নান্নু মিয়া গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে নিয়ে নূর মোহাম্মদ শেখ গুলি করতে করতে পেছনে সরে আসছিলেন। তখন হঠাৎ দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলার আঘাতে তাঁর ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।


বিপর্যয়কর এ অবস্থায় নূর মোহাম্মদ শেখ দুঃসাহসী ভূমিকা পালন করেন। তিনি সহযোদ্ধা মোস্তফা কামালকে নির্দেশ দেন, আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে করে নিয়ে পেছনে সরে যেতে। আর তাঁদের পশ্চাদপসরণের সহযোগিতার জন্য কাভারিং ফায়ার দেওয়ার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেন। মোস্তফা কামাল তাঁকে ফেলে কোনোভাবে পিছু হটতে রাজি ছিলেন না। নূর মোহাম্মদ শেখ জোর করে তাঁদের পেছনে পাঠান। এরপর মর্টার শেলের আঘাতে যন্ত্রণায় কাতর নূর মোহাম্মদ মৃত্যু অবধারিত জেনেও জীবনের শেষনিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত একাই লড়াই করেন। বীরের মতো শহীদ হন তিনি।


যুবক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে চাকরি করে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই তাকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা’র নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহস ও বীরত্বের জন্য নূর মোহাম্মদ শেখকে মরণোত্তর বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হয়।

আরো পড়ুনঃ বার বার অভিযোগ,ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর লোক পাঠালো তিতাস