Bangladesh

জমির চিন্তায় ঘুম নেই চোখে, দখল হয়ে যাচ্ছে জমি

সদর উপজেলার ভিতরগর মৌজায় ১৯৬০ সালে দুই বিঘা জমি কেনেন কৃষি শ্রমিক সরিফ উদ্দিন (৭৮)। বয়সের ভারে ন্যুজ এবং নানা রোগের মধ্যে দিন পার করছেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার জমি কেনার দলিলটি হারিয়ে যায়। বিরোধী পক্ষ জোর করে জমিটি দখল করে। প্রায় ৪০ বছর ধরে তিনি দলিল খুঁজছেন। অফিসে অফিসে ঘুরছেন। টাকা পয়সা খরচ করছেন। কিন্তু দলিল পাননি।

জেলা রেজিস্টার অফিস কর্তৃপক্ষ তাকে জানিয়ে দেয় এই দলিলের বালাম অফিসে পাওয়া যাচ্ছেনা। কর্তৃপক্ষ আরও বলেন এই বালাম সম্ভবত দিনাজপুর রেজিস্টার অফিসে আছে। বালাম নেই বলে তাকে দলিলের নকল কপিও দিতে পারছেনা কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি দলিলটি উদ্ধারের জন্য তিনি জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগের মাধ্যমে শরণাপন্ন হয়েছেন।

আরও পড়ুনঃ ‘বালিশ কাণ্ড’ : শাহাদাতের জামিন বাতিল প্রশ্নে রুল

সরিফ উদ্দিন জানান, ভিতরগড় বড় কামাত এলাকায় ৪৯৫০ নং দলিলের মাধ্যমে মৃত অফিরউদ্দিনের কাছে দুই বিঘা জমি ক্রয় করি। যা ১৯৬০ সালের ৪৭নং বালামে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু এই বালামটি জেলা রেজিস্টার অফিসে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা। তাই দলিলের নকল কপিও তুলতে পারছিনা। আমার জমি দখল করেছে বিরোধী পক্ষ। জমির শোকে আমি অসুস্থ হয়ে গেছি।

জেলা রেজিস্টার সূত্রে জানা গেছে, পঞ্চগড় আগে বৃহত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত ছিল। তাই পঞ্চগড়ের জমির কাগজপত্র দিনাজপুর রেজিস্টার অফিসে সংরক্ষিত ছিল। ২০০৫ সালে পঞ্চগড়ে জেলা রেজিস্টার ভবন নির্মিত হলে এই জেলার ভূমি সংক্রান্ত কাগজ পত্র দিনাজপুর থেকে নিয়ে আসা হয়। ওই সময়ে কিছু বালাম দিনাজপুরের আদালতসহ বিভিন্ন অফিসে পড়ে থাকে। ওই বালামগুলো নিয়ে আসার কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। কতগুলো বালাম নেই তার সঠিক হিসাবও দিতে পারেননি কর্তৃপক্ষ। বালামগুলো না থাকার কারণে এক শ্রেণির কর্মচারী এবং একটি অসাধু চক্র জাল দলিল দেয়া শুরু করে।

সাম্প্রতিক সময়েও অফিসের একশ্রেণীর কর্মচারী, মাস্টাররোলে কর্মরত কর্মচারী, নকল নবিসদের একটি অংশ এবং বহিরাগত দালালরা নানা ভাবে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে অর্থ আদায় করছেন। তেঁতুলিয়া উপজেলার ভজনপুর ইউনিয়নের বৈরাগীগজ গ্রামের পেসারউদ্দিন (৬৫) জানান, ৩২ শতক জমির নকল দলিল তোলার জন্য কয়েক হাজার টাকা খরচ করেছি। পরে রেজিস্টার অফিসের লোকজন জানায় ওই দলিলের বালাম নাই। এই সুযোগে আমার জমিটুকু দখল করে নিয়েছে বিরোধী পক্ষ।

অবশ্য অফিস কর্তৃপক্ষ এই সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। মাস্টাররোলে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী জানান, ৬০ টাকা দিন হাজিরা হিসেবে কাজ করছেন তারা। তাদেরও সংসার আছে। তাই অনেকে যে যেভাবে পারছে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে টাকা আদায় করছে।

সদর উপজেলা সাব রেজিস্টার আ.ন.ম বজলুর রহমান জানান, কিছু বালাম দিনাজপুরের রেজিস্টার অফিসেই পড়ে আছে। সেগুলো আনা হয়নি। হাজার হাজার মানুষ এ ব্যাপারে যোগাযোগ করে। কিন্তু কোন উপায় থাকেনা। বালাম ছাড়া তো দলিলের নকল কপি দেয়া যায়না। সাধারণ মানুষ আমাদেরকে ভুল বোঝে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর দালাল জাল দলিল তৈরি করছে। এতে সাধারণ মানুষ সমস্যায় পড়ছে।

এ প্রসঙ্গে জেলা রেজিস্টার মীর মাহবুব মেহেদী এই সংকট উত্তরণের জন্য কোন উপায় নেই বলে জানান। তিনি বলেন দিনাজপুরের বিভিন্ন অফিস আদালতে বালামগুলো পড়ে আছে। যাদের জমি দরকার তারা দিনাজপুরে যোগাযোগ করে বালামের খোঁজ দিলে আমরা সেটা আনতে পারি। আর কোন উপায় দেখছিনা।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, একটি অভিযোগ পেয়েছি। তবে বিষয়টি খুব কঠিন। বালাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।