Bangladesh অপরাধ

ইসির দুজন অপারেটরের সহায়তায় তথ্য ফাঁকি দিয়ে ঋণ প্রতারণা

জাতীয় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কিছু ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের সহায়তায় জাল জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরী করতো চক্রটি। ঋণ খেলাপির কারনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) কালো তালিকাভুক্তি হওয়া ব্যক্তিদের পুনরায় ঋণ পেতেই এ জাল এন আইডি তৈরী হতো। ঋণ পেলেই মোট টাকার ১০ শতাংশ আর জাল এন আইডি তৈরীর জন্য দিতে হতো ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। মূলত ব্যাংক থেকে নেয়া ঋণের টাকা মেরে দিতেই এমন কাজ করতেন তারা। এমন একজনকে আমরা গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছি যিনি এ ভাবে দুটি ব্যাংক থেকে প্রায় ১৯ লাখ টাকা তুলে নিয়ে আর ফেরত দেননি। অপর এক ব্যক্তিকে আটক করা না গেলেও তিনি ৩ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে জানা গেছে। এ কাজে ব্যাংক সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির সম্পৃক্ততাও মিলেছে। বেসরকারী সিটি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, সাউথ বাংলা ব্যাংক ও ইউসিবি ব্যাংকে থেকে লোন নিয়েছে চক্র সংশ্লিষ্টরা।

ইসির দুজন ডাটা এন্ট্রি অপারেটরসহ পাঁচ প্রতারককে গ্রেপ্তারের বিষয়ে গতকাল রবিবার ভোরের কাগজকে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা লালবাগ বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের সহকারী কমিশনার (এসি) মধু সূদন দাস। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন- এ চক্রের অন্যতম হোতা মো. সুমন পারভেজ (৪০), মো. মজিদ (৪২), ইসির খিলগাঁও কার্যালয়ের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সিদ্দার্থ শংকর সূত্রধর (৩২), গুলশান কার্যালয়ের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. আনোয়ারুল ইসলাম (২৬) ও মো. আবদুল্লাহ আল মামুন (৪১)। গত শনিবার রাতে রাজধানী মিরপুরের চিড়িয়াখানা এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তাদের থেকে থেকে জাল ১২টি এনআইডি উদ্ধার করা হয়।

অভিযানের নেতৃত্বদানকারী গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) এ কর্মকর্তা বলেন, সিআইবি হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ বিভাগ। এ বিভাগ ব্যাংক ও ব্যাংক বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ বা লিজ গ্রহীতাদের তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ করে। ঋণ গ্রহণে আগ্রহী কোনো ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে ঋণ বা লিজ নিয়েছে কি-না বা নিয়ে থাকলে তার অবস্থা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঋণ খেলাপি কি-না তা সিআইবির ঋণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। এমতাবস্থায় এ সিআইবি রিপোর্টের ওপরেই ভিত্তি করে ঋণ হয়ে থাকে। আর ঋণ দেয়ার সময় গ্রহীতার এনআইডির সূত্র ধরেই তার লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা নির্নয় হয়ে থাকে। আর ইসির ডাটা এন্ট্রি অপরেটরদের সহায়তায় তারা এ কাজ করে আসছিল। তিনি আরো বলেন, সিদ্দার্থ শংকর সূত্রধর ও আনোয়ারুল ইসলাম ই-জোন কোম্পানীর মাধ্যমে আউট সোর্সিংয়ে নিয়োগ পান। এর ফলে ভূয়া জন্ম নিবন্ধন, নাগরীক সনদ ও বিদ্যুৎ বিলের কপি নিয়ে অফিসের সফটওয়্যার ব্যবহার করে সহজেই জাল এনআইডি তৈরি করতে পারেন তারা। এখানে জন্মসাল আর নামের একটু পরিবর্তণ হয়। তাদের ইনপুটের ফলে ইসির ওয়েবসাইটেও এন আাইড কার্ড নাম্বারের অস্তিত্ব দেখা যায়। আর ফিঙ্গার প্রিন্ট ভুল প্রথমে ধরা যায় না। তবে এফিসি সফটও্যারে তা ধরা পড়ে। তবে এর মধ্যে কাজ সেরে ফেলেন তারা। ঋণ গ্রহনের পথটি সুগম করে দিলেও তারা প্রতি কার্ডে পেতেন ৩৫-৪০ হাজার টাকা।

তবে এনআইডি করতে পারভেজ ও মো. মজিদ নিতেন ৮০ থেকে ১ লাখ টাকা। আর ঋণ হলে মূল টাকার ১০ শতাংশ। গ্রেপ্তার মো. আবদুল্লাহ আল মামুন পারভেজ ও মো. মজিদের সহায়তায় জাল এনআইডি দিয়ে ব্র্যাক ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও সিটি ব্যাংকের নিকেতন ব্রাঞ্চ থেকে ৯ লাখ ৫০ হাজার ঋণ নিয়ে টাকা আত্মসাৎ করে। মামুনের স্ত্রী রেজিনার নামে ঋণ নিতে তৈরী করা জাল এনআইডি নিতে এসই গ্রেপ্তার হয় তারা। এছাড়াও এ চক্র মো. লিটন নামে এক ব্যক্তিকে সাউদ বাংলা ব্যাংকের নর্থ সাউদ রোডস্থ শাখা থেকে ৩ কোটি টাকা, ইয়াছির নামে এক ব্যক্তিকে সিটি ব্যাংকের প্রগতি স্মরণী শাখা থেকে ওই ব্যাংকেরই কর্মকর্তা আরিফের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকা, সালেহ আহমেদ নামে এক ব্যাক্তিকে ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা, এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে মো. আবদুল মজিদ নামে একজনকে ২০ লাখ টাকাসহ ১৫-২০ জনকে তারা এভাবে ঋণ নেতে সহায়তা করেছে বলে তাদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। বিভিন্ন ব্যাংকের এজেন্ট, সহকর্মী ও চাকরির সূত্র ধরে অসুদউপায়ে ঋণ নিতে ইচ্ছুকদের যোগাড় করে। মো. আবদুল্লাহ আল মামুন ৫টি ব্যাংকে কাজ করেছেন। পারেভেজ ও মামুনের সঙ্গেও কিছু ব্যাংকে কর্মরতদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের রিমান্ডে আনা হবে। তখন আরো বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।