Bangladesh অপরাধ

ইসির দুই অপারেটরসহ ভুয়া এনআইডি তৈরি চক্র ডিবির জালে

ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে সহায়তাকারী একটি চক্র ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) জালে আটকা পড়েছে। গত শনিবার রাতে রাজধানীর মিরপুর থেকে এ চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তারা হলেন সুমন, মজিদ, সিদ্ধার্থ শংকর, আনোয়ারুল ইসলাম ও মামুন। এ সময় তাদের থেকে দ্বৈত, জাল ও ডুপ্লিকেট ১২টি এনআইডি জব্দ করা হয়। এদের মধ্যে সিদ্ধার্থ ও আনোয়ারুল নির্বাচন কমিশন (ইসি) কার্যালয়ের ডেটা এন্ট্রি অপারেটর।

দুদিন রিমান্ডের প্রথম দিনে গতকাল সোমবার গ্রেপ্তারদের থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে ডিবির লালবাগ বিভাগের সংঘবদ্ধ অপরাধ ও গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিম। এসব তথ্যের ভিত্তিতে আরও কয়েকজনকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা হবে বলে জানিয়েছেন ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা। চক্রের সহায়তায় কোন কোন ব্যাংক থেকে ভুয়া তথ্যে ঋণ নেওয়া হয়েছে, তার তথ্যও মিলেছে। তাদের সঙ্গে ব্যাংক ও ইসির ঊর্ধ্বতন কারও সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তারা।

রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতে তদন্তসংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। তবে গণমাধ্যমে গ্রেপ্তারের সংবাদ আসায় অনেকে আত্মগোপনে চলে গেছেন। চক্রের সহায়তায় ঋণ নিয়েছে এমন আরও চার-পাঁচজনের নাম পাওয়া গেছে। যদিও তাদের ঠিকানা বলেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। ইসিও সহায়তা করছে। চিহ্নিতদের গ্রেপ্তারে রাতেই (গতকাল) অভিযান চালানো হতে পারে বলে জানান তারা।

এ বিষয়ে টিমের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) মধুসূদন দাশ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন, এমন কিছু নাম আমরা পেয়েছি। রিমান্ড শেষে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। চক্রের সঙ্গে ইসির সম্পৃক্ততা তদন্ত করা হচ্ছে। ইসি থেকেও যোগাযোগ করা হয়েছে। আমরা যৌথভাবেই কাজ করব।’

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ডেটা এন্ট্রি অপারেটররা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫টি সঠিক এনআইডির তথ্যের সঙ্গে অন্তত দুটি ভুয়া তথ্য দিতেন। তাদের সঙ্গে কমিশনের উচ্চপর্যায়ের কারও যোগসাজশ রয়েছে কি না তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গ্রেপ্তারদের থেকে জব্দ করা এনআইডিগুলোর বিষয়ে বিশদ খোঁজখবর করা হচ্ছে। রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কিছু অভিযান পরিচালনা করা হবে।’

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এ চক্রের সহায়তায় ঋণ নিয়ে লাপাত্তা হয়েছেন অনেকে। ঋণ নিতে ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করায় ব্যাংকও তাদের খুঁজে পায় না। এ চক্রের মাধ্যমে ঋণ নেওয়াদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর উত্তরার বাসিন্দা সাবেক ব্যাংকার আবদুল্লাহ আল মামুন (৪১)। তিনি বিভিন্ন সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হন। ফলে ক্রেডিট ইনফরমেশন (সিআইবি) প্রতিবেদন খারাপ হওয়ায় তিনি আর ঋণের আবেদন করতে পারছিলেন না। এ চক্রের সন্ধান পেয়ে তাদের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে পুনরায় ঋণ পেতে ভুয়া এনআইডি তৈরি করেন তিনি। এরপর ব্র্যাক ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং সিটি ব্যাংকের নিকেতন শাখা থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নেন।

এভাবে ঋণ পেতে চক্রকে ১ লাখ টাকা এবং ঋণ পাওয়ার পর ১০ শতাংশ করে দিতে হয়। পরে চক্রের সঙ্গে মামুন নিজেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি স্ত্রী রোজিনা রহমানের নামেও ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে ভুয়া এনআইডি তৈরি করেন।

এছাড়া একইভাবে এ চক্রের মাধ্যমে মো. মিল্টন রাজধানীর নর্থ সাউথ রোডের সাউথবাংলা ব্যাংক থেকে ৩ কোটি, ইয়াছির সিটি ব্যাংকের প্রগতি সরণি শাখা থেকে ১০ লাখ, সালেহ আহম্মেদ ইউসিবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ১৫ লাখ এবং আবদুল মজিদ এনআরবি ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। এভাবে অন্তত ২০ জনকে চক্রটি ব্যাংকঋণ পাইয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে।