Bangladesh

রূপপুর প্রকল্প:আবারো বাড়তি ১১ কোটিতে কেনা হচ্ছে আসবাব!

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের ‘রূপপুর গ্রিনসিটি রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স’র এক হাজার ২৫০ বর্গমিটারের চারটি ২০তলা ভবন এবং ছয়টি ১৬তলা ভবনের ৯৫৬টি ইউনিটের আসবাবপত্র কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে পাবনার গণপূর্ত বিভাগ। এর পরিপ্রেক্ষিতে পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেড ও হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড দরপত্র জমা দেয়।

পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড জমা দেয়া দরপত্রে ৪৪ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার টাকায় সমুদয় আসবাবপত্র সরবরাহের কথা জানায়। আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেড ৫৪ কোটি ৮৮ লাখ ১২ হাজার ৫৯৯ টাকার কথা উল্লেখ করে। বাড়তি দাম হাঁকায় হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড। তারা আসবাবপত্র সরবরাহে ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৯ টাকার কথা উল্লেখ করে দরপত্রে।

কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য কারণে কম টাকায় পণ্য সরবরাহ করতে চাওয়া পারটেক্স ও আরএফএলকে বাদ দিয়ে হাতিলকে কাজ দিয়েছে পাবনার গণপূর্ত কার্যালয়। ফলে পারটেক্সের চেয়ে ১০ কোটি ৯৭ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ এবং আরএফএলের চেয়ে এক কোটি দুই লাখ ৩২ হাজার ৮২০ টাকা বেশি দামে পণ্য কিনছে গণপূর্ত কার্যালয়। ইতোমধ্যে এই বাড়তি মূল্যে আসবাবপত্র সরবরাহের কার্যাদেশ বা নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) হাতিলকে দিয়েছে পাবনা গণপূর্ত।

গণপূর্ত সূত্রে জানা গেছে, ওই কেনাকাটার জন্য দুবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। প্রথমবার দরপত্র আহ্বান করা হয় গত বছরের ২ ডিসেম্বর। ওই দরপত্রও অদৃশ্য কারণে বাতিল হয়ে যায়। প্রথম দরপত্রে হাতিল কমপ্লেক্স আসবাবপত্র সরবরাহের জন্য ৬৭ কোটি ২৬ লাখ ৮৯ হাজার ২৭৯ টাকার কথা উল্লেখ করে। তখন তারাই ছিল সর্বোচ্চ দরদাতা। দ্বিতীয় দরপত্র আহ্বান করা হয় চলতি বছরের ১৯ জুলাই। এবার প্রথম দরপত্রের চেয়ে ১১ কোটি ৩৬ লাখ ৪৩ হাজার ৮৬০ টাকা কমিয়ে ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৯ টাকায় আসবাবপত্র সরবরাহের কথা উল্লেখ করে হাতিল।

একই আসবাবপত্র সরবরাহে প্রথমবারের চেয়ে ১১ কোটি টাকা কমিয়ে আনায় পণ্যের মান ঠিক থাকবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান খন্দকারের হাতে। ১৩ দিন আগে বদলি হয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) যোগ দিয়েছেন তিনি। বদলির আগেই সবকিছু সম্পন্ন করেন আরিফুজ্জামান খন্দকার। তার বদলির পরপরই দরপত্রের কার্যাদেশ বা এনওএ ইস্যু হয়। পাবনার গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নতুন যোগ দিয়েছেন আনোয়ারুল আজিম। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। যার হাতে দরপত্রের কাজটি সম্পন্ন হয়েছে, সেই আরিফুজ্জামান খন্দকারের সঙ্গে কথা হয়েছে জাগো নিউজের।

গত ২৬ আগস্ট সচিবালয়ে জুম অ্যাপের মাধ্যমে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পে ডেলিগেটেড ওয়ার্ক হিসেবে গণপূর্ত অধিদফতরের বাস্তবায়নাধীন গ্রিনসিটি আবাসিক পল্লী নির্মাণের আওতায় চারটি ২০তলা এবং ছয়টি ১৬তলা আবাসিক ভবনের ৯৫৬টি ইউনিটে আসবাবপত্র সরবরাহ কাজের ক্রয়প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে কমিটি। এতে মোট ব্যয় হবে ৫৫ কোটি ৯০ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে এসব আসবাবপত্র সরবরাহ করবে।

অথচ একটি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সর্বনিম্ন দরদাতা ছিল না হাতিল কমপ্লেক্স। হাতিলের চেয়ে কম দর উল্লেখ করেছিল পারটেক্স ও আরএফএল। পারটেক্সকে বাদ দেয়ায় ১০ কোটি ৯৭ লাখ এবং আরএফএলকে বাদ দেয়ায় এক কোটি দুই লাখ ৩২ হাজার ৮২০ টাকা বাড়তি দামে এখন আসবাবপত্র কিনতে হচ্ছে সরকারকে।

এ বিষয়ে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান খন্দকার বলেন, ‘সমস্যা না থাকলে কেউ কি বাদ যায়? সমস্যা অবশ্যই আছে। এটা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাস হয়েছে। যেহেতু আমি এখন ওখানে নেই, আমি তো আর বলতে পারব না। তাছাড়া পারটেক্স কী কারণে বাদ গেল, তা তারা নিশ্চয়ই জানে। তারপরও তারা জানতে চাইলে অভিযোগ করতে পারে। নির্বাহী প্রকৌশলী, গণপূর্ত বিভাগ, পাবনা বরাবর আবেদন করলে সবকিছু জানতে পারবে তারা।’

‘দরপত্র কম দেয়া প্রতিষ্ঠান দুটির কাগজপত্রে কী সমস্যা ছিল, সেটা আমি বলতে পারব না। আমি তো ১৩ দিন আগে এসেছি। একদিন আগে বদলি হলেও তো আমি বলতে পারব না’— বলেন আরিফুজ্জামান খন্দকার।

দরপত্রের পুরো প্রক্রিয়াটি তো আপনার হাত দিয়ে হয়েছে— এর জবাবে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই, কোনো কিছু জানার থাকলে এখন চিঠি দিয়ে জানতে হবে। দুটা নাকি তিনটা-কে (প্রতিষ্ঠান) বাদ দিয়ে, সেটা যার কাগজপত্র…; লোয়েস্ট (সর্বনিম্ন দরদাতা) কেউ এক কোটি দিয়ে কাজ করে দিতে চাইলে সে কাজ পাবে, এমন তো নয়। কাগজপত্র ঠিক থাকতে হবে তার। নিশ্চয়ই তাদের কাগজপত্রে কোনো ফল্ট (ত্রুটি) ছিল। তা না হলে বাদ পড়ার কোনো সুযোগ নেই।’

হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড প্রথম দরপত্রের চেয়ে দ্বিতীয় দরপত্রে প্রায় ১১ কোটি টাকা কম খরচের প্রস্তাব করেছে। এত টাকা কমে কীভাবে তারা এখন এসব আসবাবপত্র সরবরাহ করবে— এমন প্রশ্নের জবাবে পাবনা গণপূর্ত বিভাগের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী বলেন, ‘এখানে মান (পণ্যের মান) খারাপ দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। যে কোয়ালিটি চাওয়া হয়েছে সেটাই দেবে। তাদের লাভ কম হবে। সবগুলো টেন্ডারের রেট দেখেন। ৫৪/৫৫/৫৭ কোটি— এই রেটগুলো কিন্তু একই পর্যায়ে আছে। তারা হয়তো জানতে পেরেছে যে, হয়তো এই রেটে কাজ পেতে পারে তারা। এখানে কোয়ালিটিলেস (নিম্নমান) মালামাল দেয়ার কোনো সুযোগ নাই। আলাদাভাবে কমিটি করে দেয়া আছে। সেই কমিটির মাধ্যমে মালামাল গ্রহণ হবে।’

এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, ‘বিষয়টা পুরোপুরি গণপূর্ত বিভাগ দেখে। গণপূর্তই ভালো বলতে পারবে। এ বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।’

সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) পরিচালক মো. শামিমুল হক এ প্রসঙ্গে জাগো নিউজকে বলেন, ‘যদি ইভালুয়েশনে নন রেসপন্সিবিলিটি (মূল্যহীন মূল্যায়ন) হয় বা কোয়ালিফিকেশন ক্রাইটেরিয়া (যোগ্যতার মানদণ্ড) যদি পূরণ করতে না পারে, তখন কম দরদাতা হলেও তারটা বিবেচনা করার সুযোগ থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন তারা বাদ পড়ল, সেটা যদি তারা জানতে চান, জানাবেন।’

এ বিষয়ে কথা হয় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘কোন প্রতিষ্ঠানের মান ভালো, এটা কারিগরি দক্ষতার বিষয়। কারিগরি প্রক্রিয়ায় এটা নির্ধারণ হয়। তবে সাধারণভাবে তিনটি প্রতিষ্ঠানই (পারটেক্স, আরএফএল ও হাতিল) বাজারে সমান প্রতিযোগিতা করছে। দামের যদি সামান্য হেরফের হতো তাহলে প্রশ্ন উঠত না। যেহেতু প্রায় ১১ কোটি টাকার তফাৎ, সে কারণে বিষয়টা খতিয়ে দেখা অপরিহার্য বলে মনে করছি।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘প্রথম কথা হলো, সরকারি ক্রয় খাতে দুটা মাপকাঠিতে মোটা দাগে ক্রয় কার্যাদেশ দেয়া হয়। একটা হচ্ছে টেকনিক্যাল কোয়ালিটি। আরেকটা হচ্ছে মূল্য। স্বাভাবিকভাবে সর্বনিম্ন মূল্য ও সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন- এই দুইটা হচ্ছে বিবেচ্য বিষয়। এই দুইটার সংমিশ্রণ হতে হবে। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দিতে হবে, এমনও নয়। কারণ তার প্রতিষ্ঠানের যে ক্রেডিবিলিটি বা প্রস্তাবনার যে গুণগতমান সেটা পর্যাপ্ত নয়। এমন হলে সর্বনিম্ন দরদাতা হয়তো নাও পেতে পারে কার্যাদেশ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা থাকতে হয়। বিশেষ করে, কোন বিবেচনায় সর্বোচ্চ দর দেয়া সত্ত্বেও নেয়া হলো, সেটার পেছনের যুক্তিটা ব্যাখ্যা করতে হবে। যদি ব্যাখ্যা না থাকে তাহলেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে যে, এখানে অন্য কোনো বিষয় কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যদি সদুত্তর (পাবনা গণপূর্ত) না দিতে পারে, তাহলে অনুসন্ধান-সাপেক্ষে একটা সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা/মন্ত্রণালয় আর দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্ত করে দেখতে পারে যে, এর মধ্যে নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটেছে কি-না। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা এবং সর্বোচ্চ মানসম্মত পণ্য ও সর্বনিম্ন মূল্য—এই তিনটা জিনিস নিশ্চিত হয়েছে কি-না? সেখানে যদি ঘাটতি থাকে, তাহলে যারা এর সঙ্গে জড়িত তারা অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে থাকতে পারেন। যোগসাজশ থাকতে পারে, যাদের কার্যাদেশ দেয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে যারা কার্যাদেশ দিয়েছেন তাদের। কাজেই বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা দরকার।’