ধর্ম

উত্তম ও সুন্দর চরিত্র গঠনে ইসলামের নির্দেশনা কি?

ইসলামে সুন্দর চরিত্রের মর্যাদাই আলাদা। মুমিন মুসলমানের চরিত্র কেমন হবে। সুন্দর ও উত্তম চরিত্রের জন্য কী কী বিষয় থাকা জরুরি। কীভাবে মুমিন মুসলমান উত্তম চরিত্রবান হতে পারবে। উত্তম ও সুন্দর চরিত্র গঠনে ইসলামের নির্দেশনা কি?

বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবনে সর্বোত্তম চরিত্রের মাধ্যমেই জাহেলিয়াতের অন্ধকার সমাজকে আদর্শ ও আলোকিত সমাজে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছেন। যার চরিত্রের ব্যাপারে মহান আল্লাহ তাআলা এভাবে ঘোষণা দিয়েছেন যে-
وَإِنَّكَ لَعَلى خُلُقٍ عَظِيمٍ
‘আর (হে রাসুল!) আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সুরা কালাম : আয়াত ৪)

উত্তম চরিত্রের উপকারিতা
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য উত্তম ও সুন্দর চরিত্র লাভের অন্যতম মডেল। এ ছাড়া তিনি উত্তম ও সুন্দর চরিত্র লাভের উপকারিতা তুলে ধরেছেন। তাহলো-
– বান্দার ঈমানের পূর্ণতা
উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তিই ঈমানের পরিপূর্ণতা লাভ করে। হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘মুমিনদের মাঝে পূর্ণ ইমানদার সেই ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী।’ (তিরমিজি)

– আল্লাহর কাছে বিনয়ী
উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি মহান রবের জন্য বিনয়াবনতভাবে ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেন, ‘নিঃসন্দেহে মুমিন ব্যক্তি তার সর্বোত্তম চরিত্রের মাধ্যমে সিয়াম পালনকারী, রাত জেগে ইবাদতকারীর মর্যাদায় ভূষিত হয়।’ (আবু দাউদ)

– আমলের পাল্লা ভারী
উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তি কেয়ামতের দিন উত্তম আমলকারী হবেন। তার আমলের পাল্লা ভারী হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘কেয়ামতের দিন উত্তম চরিত্রের চাইতে ভারী কোনো কিছু পাল্লায় রাখা হবে না।’ (তিরমিজি)

– জান্নাতের অধিবাসী
উত্তম চরিত্র এমন এক মহৎ গুণ। যে গুণের কারণে মানুষকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করা হলো, কোন বিষয়টি সর্বাধিক মানুষকে জান্নাতে নিয়ে যাবে? তিনি বললেন, ‘আল্লাহ ভীতি এবং উত্তম চরিত্র।’ (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ)

উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তিদের লক্ষণ বা চিহ্ন
ইসলামিক স্কলারদের বর্ণনায় উত্তম চরিত্রবান ব্যক্তিদের গুণাগুণ উঠে এসেছে। যেসব গুণের কারণে মানুষ উত্তম চরিত্র লাভের অধিকারী হয়। তাহলো-
– হজরত হাসান বাসরি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘উত্তম চরিত্র হলো- আতিথেয়তা, দানশীলতা এবং ধৈর্যাধারণ করা।’
– হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মুবারক রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘উত্তম চরিত্র হলো- মানুষের সামনে হাসি-খুশি থাকা, সৎ উপদেশ দেয়া এবং কাউকে কষ্ট না দেয়া।’
– ইমাম আহমদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘উত্তম চরিত্র হচ্ছে- তুমি অযথা কারো প্রতি রাগান্বিত হবে না এবং কারো প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ রাখবে না।’
– অনেক ইসলামিক স্কলারের মতে, ‘উত্তম চরিত্র বা সদাচার হলো-
– আল্লাহর জন্য রাগ নিয়ন্ত্রণ করা।
– পাপ এবং বিদআতের কাজে জড়িত ব্যক্তির সঙ্গে আনন্দ প্রকাশ না করা।
– ভুলত্রুটিতে লিপ্ত ব্যক্তিদের উত্তম শিক্ষা দেয়া কিংবা তাদের ওপর দণ্ডবিধি কায়েমের উদ্দেশ্য ছাড়া তাদের ক্ষমা করে দেয়া।
– প্রত্যেক মুসলমান এবং চুক্তিতে আবদ্ধ অমুসলমানদের কষ্ট না দেয়া। তবে অন্যায়ের প্রতিরোধ এবং সীমা লঙ্ঘন ব্যতীত মাজলুমের অধিকার আদায়ের উদ্দেশ্যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে।’

চরিত্র সুন্দর করার উপায়
চরিত্র সুন্দর করার সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে, বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের অনুসরণ ও অনুকরণ করা। কেননা কুরআনুল কারিমে মহান আল্লাহ তাআলা এ কথাই ঘোষণা করেছেন-
‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনে রয়েছে সর্বোত্তম নমুনা বা আদর্শ।’ (সুরা আহজাব : আয়াত ২১)

640.jpg

সুতরাং মুসলিম উম্মাহর জন্য আবশ্যক হলো- রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনের প্রতিটি দিক সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা। আল্লাহর সঙ্গে বিশ্বনবির সম্পর্ক কেমন ছিল? মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল? তিনি ব্যক্তি পরিবার সমাজের লোকদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতেন? তার সঙ্গী-সাথীদের সঙ্গে কীভাবে চলাফেরা করতেন এবং কেমন আচরণ করতেন? এমনকি অমুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্পর্কই বা কেমন ছিল?- এসব বিষয় সম্পর্কে গবেষণা করে সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনার মধ্যেই রয়েছে উত্তম চরিত্র গঠনের উপায়।

সর্বোপরি বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তম চরিত্র গঠনের বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতে বন্ধুত্ব করার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়েছেন। কেননা পরিচ্ছন্ন অন্তরের অধিকারী, পরহেজগার ও চরিত্রবান ব্যক্তিদের সংস্পর্শ লাভের চেষ্টা করা, তাদের বৈঠকে বসা। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা। কেননা একজন মানুষ অন্যজনের সংস্পর্শে আসলে তার প্রভাবে প্রভাবিত হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-

‘ব্যক্তি (মানুষ) তার বন্ধুর ধর্ম বা রীতিনীতির অনুসারী হয়। সুতরাং তোমরা দেখে নাও কার সঙ্গে বন্ধুত্ব (সুসম্পর্ক) স্থাপন করবে।’ (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ)

সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের বিষয়গুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। সুন্দর ও উত্তম চরিত্রবান লোকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা। কুরআন-সুন্নাহ এবং ইসলামিক স্কলারদের দেয়া উত্তম গুণগুলো নিজেদের মধ্যে বাস্তবায়ন করা। তবেই মুমিন মুসলমান হয়ে উঠবে উত্তম ও সুন্দর চরিত্রের অধিকারী।

উত্তম চরিত্র লাভে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি এ প্রার্থনা করা-
>> اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ مُنْكَرَاتِ الأَخْلاَقِ وَالأَعْمَالِ وَالأَهْوَاءِ وَ الْاَدْوَاءِ
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিন মুনকারাতিল আখলাক্বি ওয়াল আ’মালি ওয়াল আহওয়ায়ি, ওয়াল আদওয়ায়ি।’
অর্থ : হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার কাছে খারাপ (নষ্ট-বাজে) চরিত্র, অন্যায় কাজ ও কুপ্রবৃত্তির অনিষ্টতা এবং বাজে অসুস্থতা ও নতুন সৃষ্ট রোগবালাই থেকে আশ্রয় চাই।’ (তিরমিজি)

>> اَللَّهُمَّ اِنِّى اَسْئَلُكَ الْهُدَى وَ التُّقَى وَ الْعَفَافَ وَالْغِنَى
উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত্তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা।’
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত (পরিশুদ্ধ জীবন) কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা পরহেজগারি কামনা করি এবং আপনার কাছে সুস্থতা তথা নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ-সামর্থ্য (আর্থিক সচ্ছলতা) কামনা করি।’ (মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ ও মুসনাদে আহমাদ)

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সুন্দর ও উত্তম চরিত্রবান হওয়ার তাওফিক দান করুন। বিশ্বনবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের দিকনির্দেশনা মেনে এবং তাঁর অনুসরণ-অনুকরণ করার মাধ্যমে নিজেদের উত্তম ও সুন্দর চরিত্রবান হিসেবে গড়ে তোলার তাওফিক দান করুন। আমিন।