Bangladesh Rangpur

জুয়েলের দুই সন্তান বাবার মৃত্যুর খবর এখনো জানেনা

বিশেষ প্রতিবেদক : আবু ইউনুছ মো. সহিদুন্নবী ওরফে জুয়েল বাসা থেকে বাড়ির বাহিরে গেছে। সকাল গড়িয়ে রাত শেষে ফিরে আসেনি। কেন আসেনি, কোথায় আছে? জুয়েলের দুই সন্তান বাবার মৃত্যুর খবর এখনো জানেনা । শুধু জানে প্রতিদিনের মতো ঘোরাঘুরি শেষে জুয়েল ফিরে আসবে। কাঁদতে কাঁদতে এই কথাগুলো বলছিলেন নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হওয়া জুয়েলের বড়বোন হাসনা আখতার লিপি।

গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বিকেলে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রামের বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে কোরআন অবমাননার অভিযোগ উঠে মানসিক ভারসাম্যহীন আবু ইউনুছ মো. সহিদুন্নবী  জুয়েল (৫১) এর বিরুদ্ধে। এর পরই সংঘবদ্ধ জনতা তাকে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে ফেলে।

আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) সকালে নিহত জুয়েলের বাড়িতে গেলে তার দুই সন্তানকে ঘিরে এভাবেই শ্বাসরুদ্ধকর সময় পার করার কথা বলছিলেন বড়বোন হাসনা আক্তার লিপি।
তিনি বলেন, জুয়েলের স্ত্রী ওই খবর (মৃত্যুর বিষয়টি) জানার পর থেকে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাচ্চা দুটি আজ সকালে ওদের বাবার কিছু হয়েছে, এটা আঁচ করতে পেরেছে। কিন্তু নরপশুরা যে জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যার পর পুড়িয়ে দিয়েছে।

লালমনিরহাটে তিন সাংবাদিক কন্যার ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি লাভ

এ খবর জানে না ওর দুই সন্তান। শেষ বারের মত বাবার মুখটা দেখার অপেক্ষায় ওরা বসে আছে।বুকফাটা আর্তনাদ করতে করতে হাসনা আক্তার লিপি বলেন, আমি ওদের বড় ফুফু।ওরা আমার কাছে গিয়ে বারবার জানতে চাইছে- বাবাকে দেখতে পারবো তো? কখন নিয়ে আসা হবে বাবাকে? আমি কি উত্তর দেব, আপনারা বলেন? ওর মতো ভারসাম্যহীন মানুষকে এভাবে কেন মেরে ফেলা হলো।
নির্বাক বড় ফুপি সব জেনেও বলতে পারছে না- জুয়েলকে দেখার শেষ ইচ্ছেটুকু আগুনে পুড়ে ছাই করে দিয়েছে নরপশুরা।

রংপুর নগরীর শালবন ( সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজ সংলগ্ন) মহল্লায় জুয়েল পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। সেখানে গিয়ে চোখে পড়ে হৃদয়বিদারক আহাজারি।জুয়েলদের আদিবাড়ি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ১৫নং কাবিলপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের সখিপুরে। তার যবাবা প্রয়াত আব্দুল ওয়াজেদ মিয়া। যখন জুয়েলের ১২ বছর, তখন মাকে হারিয়েছেন। এরপর বড়বোনের লালন-পালনে বেড়ে ওঠা।

জানা গেছে, রংপুরে এসএসসি ও এইচএসসি পাশের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাইব্রেরি সায়েন্সে স্নাতকোত্তর শেষ করে রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে গ্রন্থাগারিক পদে চাকরি করতেন জুয়েল। ষড়যন্ত্রে তার চাকরি চলে যাওয়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এরপর থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ আর প্রেসক্রিপশনে ঔষধ সেবন করতেন আবু ইউনুছ মো. সহিদুন্নবী জুয়েল।

এরমধ্যে মেয়ে দেবা তাসনিয়া অনন্যা কারমাইকেল কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বর্ষে এবং ছেলে আবু তাহের মো. আশিকুন্নবী অরণ্য রংপুর ক্যান্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৫ম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।
হাসনা আখতার লিপি আরও জানান, মাঝে মধ্যে মানসিক বিষণ্নতায় ভুগলেও দুশ্চিন্তা ছিল না। তবে বছর খানেক আগে চাকরিচ্যুত হবার পর থেকে মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে জুয়েলের।

তিনি বলেন, ঘটনার দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে মুঠোফোন শেষ বারের মত জুয়েলের সাথে কথা হয় তার ‌। এসময় জুয়েল তাকে বলেছিলেন, চিন্তা করো না বুবু। আমি ভালো আছি। তাড়াতাড়ি ফিরে আসবো। এরপর থেকেই সারাদিন ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। রাতে ফেসবুকে তার মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।

এদিকে প্রতিবেশীরা জানান, ছোট বেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও ধার্মিক ছিলেন জুয়েল। নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। মেধাবী এই মানুষটার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তার বন্ধু, স্বজন, প্রতিবশীসহ শুভাকাঙ্ক্ষীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) লালমনিরহাটের বুড়িমারী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ শেষে পাঠ করার জন্য মসজিদের সানসেটে রাখা কোরআন শরীফ নামাতে গিয়ে অসাবধনাতাবশত কয়েকটি কোরআন ও হাদিসের বই তার পায়ে পড়ে যায়। এ সময় তুলে চুম্বনও করেন জুয়েল। বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে মুয়াজ্জিনের ভুল বোঝাবুঝি হয়।

এরপর আশপাশের লোকজন ছুটে এসে সন্দেহবশত জুয়েল ও তার সহযোগীকে পাশে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। পুরো বাজারে এবং পার্শ্ববর্তী গ্রামে ধর্ম অবমাননার গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় উত্তেজিত হয়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের দরজা জানালা ভেঙে জুয়েলকে পিটিয়ে হত্যা করে। পরে মরদেহ বাহিরে বের করে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়।