প্রবাস

সৌদির যেতে না পারা নতুন কর্মী নিয়োগে নানা শর্তে সংকট

ভিসা পেয়েও করোনার কারণে সৌদি আরব যেতে না পারা প্রায় পৌনে এক লাখ নতুন কর্মীর ওপর নিত্যনতুন শর্ত চাপাচ্ছে দেশটি। প্রথমে শর্ত ছিল কর্মীদের ফের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে বহির্গমন, পুলিশের ছাড়পত্রসহ নতুন ভিসার আবেদন করতে হবে। এরপর শর্ত তালিকায় যোগ হয়েছে ভিসা পেতে নতুন করে ওকালা নিতে হবে এবং কর্মী পাঠানোর দায়িত্বে থাকা রিক্রুটিং এজেন্সি মালিককে স্নাতক পাস হতে হবে।

এসব কঠিন শর্তের কারণে বহু কর্মীর সৌদি আরব যাওয়া হবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। যেতে পারলেও কর্মীপ্রতি কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ হবে। শর্ত শিথিলে সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে আলোচনার অনুরোধ জানিয়ে গত রোববার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। এতে বলা হয়েছে, করোনার আগে দেওয়া ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি, কোনো ভিসা বাতিল না করাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনা প্রয়োজন।

চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র। পশ্চিম এশিয়া উইংয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধিসহ কয়েকটি ইস্যুতে আগামী সপ্তাহে ঢাকায় সৌদি দূতাবাসের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে। রোববার বৈঠকের সময়সূচি ঠিক হতে পারে।


প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিক্রুটিং এজেন্সি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে এক লাখ ৩৩ হাজার ৯৯৭ কর্মী সৌদি গেছেন। লকডাউনে বিমান চলাচল বন্ধ হওয়ায় ১৭ মার্চ থেকে দেশটিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। ফলে ৭৭ হাজার নতুন কর্মী ভিসা পেয়েও যেতে পারেননি। এর মধ্যেই শেষ হয়েছে তাদের ৯০ দিনের ভিসার মেয়াদ। প্রত্যাশা ছিল করোনা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে নতুন কর্মীরা কাজে যোগ দিতে পারবেন। ছুটিতে এসে আটকেপড়া কর্মীদের ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিলেও নতুনদের ক্ষেত্রে নানা শর্ত দিয়েছে সৌদি আরব।


জনশক্তি খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এসব শর্তের কারণে অভিবাসন ব্যয় বাড়বে। প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতিতে রিক্রুটিং এজেন্সি বা কর্মীরা নতুন করে টাকা খরচ করার মতো অবস্থায় নেই। অনেক এজেন্সি বা কর্মীর পক্ষে নতুন করে ওকালা (কর্মী নিয়োগে সৌদির এজেন্সি থেকে বাংলাদেশের এজেন্সিকে দেওয়া পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) জোগাড় করাও সম্ভব নয়।
বায়রা মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, বহু এজেন্সি মালিক ৪০-৪২ বছর ধরে বিদেশে কর্মী পাঠাচ্ছেন। তাদের মধ্যে যারা উচ্চশিক্ষিত নন, তারা হঠাৎ করে স্নাতক পাসের সনদ কোথায় পাবেন? বিদেশে কাজ করতে যাবেন কর্মী। এজেন্সি মালিকের স্নাতক পাসের সনদ দিয়ে কী করবে সৌদি আরব! এ শর্তকে অগ্রহণযোগ্য বলছেন বায়রা মহাসচিব।


শামীম চৌধুরী বলেছেন, নির্ধারিত সময়ে সৌদি যেতে না পারায় কর্মীরা দায়ী নন। তারা করোনা পরিস্থিতির শিকার। তারা এর আগে ভিসা পেয়ে ওকালা নিয়েছে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছে, বহির্গমন ও পুলিশ ছাড়পত্র নিয়েছে। নতুন করে আবার এগুলো করানোর কী প্রয়োজন।


রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকরা বলছেন, সবচেয়ে বড় বিপদ হয়েছে ওকালা বাতিল হওয়ায়। নতুন করে ওকালা করাতে কর্মীপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে সাড়ে ৯ হাজার এবং দূতাবাসের ফি বাবদ প্রায় এক হাজার ৮০০ টাকা দিতে হবে। সব মিলিয়ে কর্মীপ্রতি বাড়তি প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হবে। অথচ করোনার আগে ভিসা পেতে কর্মীদের এক দফা এসব খরচ করতে হয়েছিল। নতুন করে টাকা খরচের মতো অবস্থা তাদের নেই।


রিক্রুটিং এজেন্সির ঐক্য পরিষদের যুগ্ম মহাসচিব জাহিদুল ইসলাম ফাতেমা ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্টের মালিক। তিনি জানিয়েছেন, নিয়ম অনুযায়ী ওকালা পেতে খরচ লাগার কথা নয়। কিন্তু বাংলাদেশিরা যেভাবে ভিসা কিনে বিদেশ যান, তেমনি এজেন্সিগুলোও একই প্রক্রিয়ায় সৌদির জনশক্তি আমদানিকারকদের কাছ থেকে ওকালা আনে। এ টাকা কর্মীর পকেট থেকেই যাবে।


কর্মীদের নতুন করে বহির্গমন ছাড়পত্র নিতে বলেছে সৌদি আরব। সরকারি নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনশক্তি, প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) থেকে স্মার্টকার্ড নামে পরিচিত এ ছাড়পত্র পেতে কর্মীপ্রতি তিন হাজার ৯০০ টাকা ব্যয় হয়। সংস্থাটির মহাপরিচালক শামসুল আলম জানিয়েছেন, ভিসা পেয়েও করোনায় বিদেশ যেতে না পারা কর্মীদের বিনাখরচে ছাড়পত্র দেবে বিএমইটি।


পুলিশ ছাড়পত্র (ভেরিফিকেশন) পেতে খরচ হওয়ার কথা না থাকলেও কর্মীদের সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ-ছয় হাজার টাকা লেগে যায়। শামীম আহমদ চৌধুরী জানান, তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে আবেদন করেছেন, পুরোনো ছাড়পত্রের বিপরীতে যেন নতুন ছাড়পত্র দেওয়া হয়।


জনশক্তি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, বহির্গমন ও পুলিশ ছাড়পত্র বাংলাদেশের হাতে থাকলেও ওকালা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা সৌদির নিয়ন্ত্রণে। উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্ধারিত গামকা অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হবে।


বায়রার আশঙ্কা, কঠিন শর্তের কারণে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কর্মীর সৌদি আরব যাওয়া হবে না। সংগঠনটিতে দেওয়া ৩২৬টি রিক্রুটিং এজেন্সির হিসাব অনুযায়ী, ৮৬ হাজার ৩০৬ নতুন কর্মী ভিসা পেয়েও বিদেশ যেতে পারেননি। তাদের মধ্যে ৪৫ হাজার ৬৩১ জনের ভিসা স্ট্যাম্পিং, সরকারি ছাড়পত্র এবং বিমানের টিকিট হয়েছিল। ৪০ হাজার ৬৭৫ জনের ভিসা প্রসেসিং চলছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৭৭ হাজার সৌদি আরবের ভিসা পেয়েছিলেন।


বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য নতুন ওকালার শর্ত দেওয়া হলেও ফিলিপাইনের কর্মীরা পুরোনো ভিসায় সৌদি যাচ্ছে। জনশক্তি খাত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, অন্যান্য দেশের কর্মীদেরও ভিসা বাতিল করেছিল সৌদি। কিন্তু তাদের লোকসান নেই। বাংলাদেশিরা বিপাকে পড়েছেন ভিসা কেনাবেচার অবৈধ ব্যবসায়। কর্মী, এজেন্সি সবার ‘বিনিয়োগ’ আটকে গেছে। পরিস্থিতি ঠিক হলে অন্য দেশের কর্মীরা আগের খরচে সৌদি যাবেন। বাংলাদেশি কর্মীদের বাড়তি টাকা লাগবে।


শুধু নতুন কর্মী নন, বিপাকে আছেন সৌদি থেকে এসে করোনায় আটকেপড়া পুরোনোরাও। ইতোমধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার কর্মী ফিরে গেছেন। এখনও অনেকে আটকে আছেন শর্তের বেড়াজালে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত সবার ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধির কথা বলা হলেও নিয়োগকর্তার (কফিল) সত্যায়িত চিঠি ছাড়া কাজে ফেরার অনুমতি মিলছে না। ভিসার মেয়াদ বাড়াতে জমা দেওয়া পাসপোর্ট ফেরত দিয়েছে সৌদি দূতাবাস।