Politics

‘অরাজনৈতিক’ হেফাজতে ঢুকল বিএনপি,একাংশের কাউন্সিল,পাল্টা কাউন্সিলের প্রস্তুতি

হেফাজতে ইসলামের নতুন কমিটিতে জায়গা হয়নি শাহ আহমদ শফীর অনুসারী দাবিদারদের। হেফাজতের পরিচয় ‘অরাজনৈতিক’ সংগঠন হলেও বিএনপি জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এবং খেলাফত মজলিস বাংলাদেশের অন্তত ২০ জন নেতা এসেছেন কমিটিতে। সরকারের সমালোচক হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও খেলাফত আন্দোলনের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নেতা স্থান পেয়েছেন এতে। অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও কমিটিতে রয়েছেন। তবে বাদ পড়েছেন সরকারের বিষয়ে অপেক্ষাকৃত নমনীয় নেতা ও আলেমরা।গতকাল রোববার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় হেফাজতের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। আহমদ শফীর উত্তরসূরি হিসেবে আমির নির্বাচিত হয়েছেন মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী। তিনি কোনো দলের সদস্য নন। মহাসচিব হয়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব মাওলানা নূর হোসেইন কাসেমী। হেফাজতের দায়িত্বে আসার পর জমিয়তের পদ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

কাউন্সিলে ১২ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ এবং ১৫৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির ১২২ জনের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস নতুন কমিটি গঠনকে অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক আখ্যা দিয়েছেন। বিএনপি জোটের সাবেক এই এমপি বলেছেন, নায়েবে আমির হওয়া সত্ত্বেও তাকে কাউন্সিলে ডাকা হয়নি। আহমদ শফীর মৃত্যুতে কেবল শূন্য আমির পদ পূরণ হওয়ার কথা। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল করতে হলে নির্বাহী কমিটির অনুমোদন নিতে হবে। তা না করে আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি করা হয়েছে, যা অগণতান্ত্রিক।

জমিয়তের একাংশের সভাপতি মুফতি ওয়াক্কাস একাদশ জাতীয় নির্বাচনে যশোর-৫ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। হেফাজতের নতুন কমিটি প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেছেন, আগামী শনিবার আহমদ শফীর স্মরণসভা হবে। ওই দিন তারা পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করবেন।

হেফাজতের আগের কমিটিতে নায়েবে আমির ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের আমির তথা চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করীম। নতুন কমিটিতে তাকে রাখা হয়নি। বাদ পড়েছেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে বেরিয়ে যাওয়া ইসলামী ঐক্যজোটের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত আলেম মাওলানা ফরীদউদ্দীন মাসঊদ, মাওলানা রুহুল আমিন দুটি কওমি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। কিন্তু তাদের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক হেফাজতে নেওয়া হয়নি। তবে বাকি চার বোর্ডের প্রতিনিধিরা আছেন কমিটিতে। সরাসরি জামায়াতে ইসলামী সংশ্নিষ্ট কাউকে রাখা হয়নি।

নিজেদের অপরাধ অন্যের উপর চাপানো বিএনপির অভ্যাসে পরিণত হয়েছে : কাদের

ইসলামী আন্দোলনের যুগ্ম মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান বলেছেন, আহমদ শফীর নেতৃত্বাধীন হেফাজত নির্ভেজাল অরাজনৈতিক সংগঠন ছিল। চরমোনাই পীর এ কারণে তাতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। পরে অনেক নেতা হেফাজতকে রাজনীতিতে টেনে আনেন। যেসব ইসলামিক রাজনৈতিক দলের গণভিত্তি নেই, জনসমর্থন নেই, তারা টিকে থাকতে খন হেফাজতকে আঁকড়ে ধরছে। একটি দলেরই কেন্দ্রীয় কমিটির ২০/২৫ জন নেতা হেফাজতের কমিটিতে এসেছেন। এটা তাদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বে বহিঃপ্রকাশ।

কাউন্সিল ও নতুন কমিটি গঠনের প্রতিবাদ করেছেন জুনায়েদ বাবুনগরীর বিরোধীরা। গতকাল সন্ধ্যায় রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতের সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মঈনউদ্দীন রুহী বলেছেন, তারা এই একতরফা কাউন্সিল মানেন না। হেফাজতের নামেই এ সংবাদ সম্মেলন করা হয়।

বাবুনগরীবিরোধী এবং আহমদ শফীর ছেলে আনাস মাদানীর পক্ষের নেতারা সরকার সমর্থক হিসেবে পরিচিত। এ বলয়ের নেতা ও সদ্য সাবেক দপ্তর সম্পাদক আলতাফ হোসেন সমকালকে বলেন, সারাদেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে করণীয় ঠিক করা হবে। পাল্টা কাউন্সিল ও কমিটি গঠনের চিন্তাও রয়েছে তাদের।

আহমদ শফীর পর কে হেফাজতের নেতা হবেন- তা নিয়ে অনেক আগে থেকেই বিরোধ চলছে সংগঠনটিতে। তার জীবদ্দশাতেই গত জুনে আনাস মাদানীর সমর্থকরা হাটহাজারী মাদ্রাসার দায়িত্ব থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরিয়ে দেন। আহমদ শফীর মৃত্যুর পর তিনি আবার মাদ্রাসায় ফেরেন। অন্যদিকে আনাস মাদানী ও তার সমর্থকদের মাদ্রাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়।

এদিকে হেফাজতের সদ্য সাবেক জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে গতকাল রোববার সকাল ১০টায় কাউন্সিল শুরু হয়। সারাদেশ থেকে অন্তত সাড়ে তিনশ প্রতিনিধি এতে যোগ দেন। আনাস ডাক না পেলেও  আহমদ শফীর বড় ছেলে মুহম্মদ ইউসুফ আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন। তিনি যোগ না দিলেও কাউন্সিল বা নতুন কমিটি নিয়ে কোনো কথা বলেননি। নীরব রয়েছেন আনাস মাদানীও।

আমির ও মহাসচিব নির্বাচনে কাউন্সিলে ১২ সদস্যের সাব-কমিটি করা হয়। মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে সর্বসম্মতিক্রমে আমির পদে তার ভাগ্নে জুনায়েদ বাবুনগরী ও মহাসচিব নূর হোসেইন কাসেমীকে নির্বাচিত করা হয়। পরে কমিটির বাকি সদস্যদের নাম ঘোষণা করা হয়। জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির হয়েছেন নূরুল ইসলাম জিহাদী। তিনি রাজনীতি সংশ্নিষ্ট নন। মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী হেফাজতে নেই। কাউন্সিল আহ্বান ও এতে সভাপতিত্ব করার এখতিয়ারও তার নেই। কওমি মাদ্রাসার সনদের স্বীকৃতির জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ২০১৮ সালে আহমদ শফীর নেতৃত্বে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের সমালোচনা করে পদত্যাগ করেছিলেন মুহিবুল্লাহ বাবুনগরী। জুনায়েদ বাবুনগরীর সমর্থকদের দাবি, আহমদ শফী সেই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি।

কয়েক দিন আগে থেকেই একপ্রকার নিশ্চিত ছিলেন জুনায়েদ বাবুনগরী আমির হতে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর বলেছেন, তিনি এ দায়িত্ব নিতে চাননি। শীর্ষ আলেমদের অনুরোধে রাজি হয়েছেন।

নতুন কমিটিতে ৩২ জন নায়েবে আমির, চারজন যুগ্ম মহাসচিব, ১৮ জন সহকারী মহাসচিব রয়েছেন। বিবদমান দুই পক্ষই বলছে, এবারের কমিটিতে নূর হোসেন কাসেমীর নেতৃত্বাধীন বিএনপির শরিক জমিয়তের নেতার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর সংখ্যায় বেশি মাহফুজুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের নেতারা। দলটির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মামুনুল হক যুগ্ম মহাসচিব হয়েছেন।

নতুন কমিটির জ্যেষ্ঠ নায়েবে আমির নুরুল ইসলাম জিহাদী কোনো দলের সদস্য না হলেও নায়েবে আমিরদের মধ্যে আতাউল্লাহ হাফেজ্জী খেলাফত আন্দোলনের আমির। ড. আহমদ আবদুল কাদের খেলাফত মজলিসের মহাসচিব। আবদুল হামিদ মধুপুরী, আবদুর রব ইউসুফী ও বাহাউদ্দীন জাকারিয়া জমিয়তের নেতা এবং শায়খ সাজিদুর রহমান ঐক্যজোটের নেতা।

যুগ্ম মহাসচিবদের মধ্যে মাওলানা আল হাবিব জমিয়তের, সহকারী মহাসচিবদের মধ্যে ফজলুল করীম কাসেমী জমিয়তের, খুরশিদ আলম কাসেমী খেলাফত মজলিসের, মনজুরুল ইসলাম আফেন্দি জমিয়তের, হাবিবুল্লাহ মিয়াজি খেলাফতের নেতা। সহসাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে মুজিবুর রহমান হামিদী খেলাফতের, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী ইসলামী ঐক্যজোটের, মাসউদুল করীম জমিয়তের নেতা।

ইসলামী ঐক্যজোটের এক অংশের নেতা মুফতি মুহম্মদ ইজহারের দুই ছেলে মুসা বিন ইজাহার ও হারুন বিন ইজাহারের নাম রয়েছে কমিটিতে। বিএনপি জোটের মনোনয়নে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা মুফতি মুনির হোসাইন অর্থ সম্পাদক হয়েছেন। ধানের শীষ প্রতীকের সাবেক এমপি জমিয়তের নেতা অ্যাডভোকেট শাহিদুল পাশা চৌধুরী হয়েছেন আইন সম্পাদক।

আহমদ শফীর নেতৃত্বে গঠিত হওয়ার প্রথম চার বছর হেফাজত চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ ছিল। ইসলাম অবমাননায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে আইন প্রণয়নসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল ঢাকায় সমাবেশ করে সংগঠনটি জাতীয়ভাবে আলোচনায় আসে। ওই বছরের ৫ মে সংগঠনের নেতাকর্মীরা একই দাবিতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন। মধ্যরাতে তাদের উচ্ছেদ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এরপর থেকে হেফাজত অনেকটাই নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে যায়। জুনায়েদ বাবুনগরীসহ কয়েকজন মতিঝিলের সহিংসতার মামলায় জেলে গেলেও আহমদ শফীকে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর থেকে জুনায়েদ বাবুনগরীকে সরকারের সমালোচকের ভূমিকায় দেখা যায়।