Technology সম্পাদকীয়

তথ্য প্রযুক্তি এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

তথ্য প্রযুক্তি এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ; জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে ২০১২ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে তথ্য প্রযুক্তি অপর নাম আইসিটি ।ইতিহাসে এখন পর্যন্ত তিনটি শিল্পবিপ্লব পাল্টে দিয়েছে সারা বিশ্বের গতিপথ। প্রথম শিল্পবিপ্লবটি হয়েছিল ১৭৮৪ সালে ইংল্যান্ডে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে।

এরপর ১৮৭০ সালে বিদ্যুৎ ও ১৯৬৯ সালে ইন্টারনেটের আবিষ্কার শিল্পবিপ্লবের গতিকে বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। তবে আগের তিনটি বিপ্লবকে ছাড়িয়ে যেতে পারে ডিজিটাল শিল্প বিপ্লব। এটিকে এখন বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব।

যেখানে প্রতিটি কাজ করা হবে ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে এতে করে মানুষের যেমন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হবে তেমনি অনেক মানুষ তাদের কাজ হারাবে।উন্নত দেশগুলো ভবিষ্যৎ দক্ষ নাগরিক গড়ে তুলতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহন করছে গবেষণা ও কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে।ধারণা করা হচ্ছে ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে পোশাক শিল্পসহ অনেক কাজ রোবটের মাধ্যমে করা হবে।

উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই আগে যে কাজ মানুষ করতো এসব কাজ এখন ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়। বলা হচ্ছে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব কোন নির্দিষ্ট দেশে হবে না। যারা এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে, তাঁরাই সফল হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো যদি এই প্রতিযোগিতা টিকতে না পারে তাহলে তারা আরো পিছিয়ে পড়বে।

বর্তমানে বাংলাদেশে অর্থনীতি চালিকাশক্তির অন্যতম হচ্ছে তৈরী পোশাক শিল্প। এ খাতে প্রায় ৪৫ লক্ষ লোক কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করে। আসছে চতুর্থ ডিজিটাল শিল্প বিপ্লবের কারনে এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে বিভিন্ন রোবট,যন্ত্রপাতি যার ফলে অল্প কর্মদক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা ও বাজার কমে যাবে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এই প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে প্রযুক্তির ব্যবহারের উপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং দেশের নাগরিকদের প্রযুক্তি জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত অর্থনীতিবীদ প্রফেসর Gerschenkron এর Gerschenkron’s hypothesis এখানে প্রযোজ্য এই তত্ত্ব অনুযায়ী তিনটি শর্ত পূরণ করলেই যে কোন উন্নয়নশীল দেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সফলতা অর্জন করতে পারবে।

প্রথমত, যে জাতির একটা অভিজাত শ্রেণী আছে যারা নতুন প্রযুক্তি বোঝেন। দ্বিতীয়ত, যে জাতির মধ্যে প্রযুক্তি বিরোধী কোন দল নেই। তৃতীয়ত, যে জাতির রাষ্ট্র ক্ষমতায় একজন দৃঢ় চেতনার একজন নেতা আছে যিনি এটা গ্রহণ করবেন।

তার এই তত্ত্ব মতে বলা যায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সরকার এই খাতকে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক ভাবে ব্যবহারের জন্য যথাযথ তাগিদ দিয়েছেন।

তথ্য প্রযুক্তি এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ

১৯৮০ সালের পর থেকে পার্সোনাল কম্পিউটার উন্নয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তথ্য প্রযুক্তির বিপ্লব মূল বিপ্লব শুরু হয়। ১৯৮৩ সালে স্বতন্ত্র তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তি বিপ্লব আরও এগিয়ে যেতে শুরু করে।

তারপর অনেকটা সময় পরে ১৯৯৭ সালে জাতীয় সফটওয়্যার খাতকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বেসিস Bangladesh Association of Software and Information Services (BASIS) এর প্রতিষ্ঠা। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশের তথ্য ও প্রযুক্তি খাত।

বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে আধুনিক প্রযুক্তি-জ্ঞানে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে গড়ে তুলে দেশকে এগিয়ে নিতে পরবর্তীতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতের মতো এই বিষয়টিও তাই আবশ্যিক বিষয় করার চিন্তাভাবনা করা হয়।

সরকার ভিশন ২০২১ বাস্তবায়ন এবং Digital Bangladesh বিনির্মাণের লক্ষ্যে ইউনিয়ন তথ্যসেবার নামে সেবা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে এর দ্বারা একদিকে যেমন জনগণের উপকার হয়েছে অন্যদিকে উদ্যোক্তাদেরও।

একই লক্ষ্যে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ এর আলোকে ২০১২ সালে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে। ২০১৩ সালে ৭ম, ২০১৪ সালে ৮ম, ২০১৫ সালে নবম-দশম শ্রেণীতে বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়। পাশাপাশি ২০১৩-১৪ সালে একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়টি অন্তর্ভুক্তি এবং বাধ্যতামূলক করে।

বিজ্ঞান, মানবিক এবং ব্যবসায় এই তিন শাখাতেই বিষয়টি বাধ্যতামূলক।সারাদেশে প্রায় এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীর কথা মাথায় রেখে বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটাও ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের একটি মহতি উদ্যোগ।

২০১০ পূর্ববর্তী শিক্ষানীতিতে ঐচ্ছিক বিষয় হিসাবে কম্পিউটার শিক্ষা নামে নবম-দশম এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে বিষয়টি চালু ছিল। ২০১৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীগণ সর্বশেষ এই বিষয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। এই বিষয়টিই কিছুটা আপডেট এবং নাম পরিবর্তন হয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) করা হয়েছে।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেন যথাযথ প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে পারে সেই লক্ষে কাজ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন প্রাথমিক থেকেই প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হতে পারে এবং প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার জানতে পারে। প্রযুক্তি মানুষের কাজ করে দিবে আর মানুষ প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ করবে।

লেখক: ইফতেখার আহমেদ ।। সম্পাদক , দৈনিক আস্থা। অল্টারনেটিভ CAREER গাইডলাইন

অল্টারনেটিভ-career-গাইডলাইন
Alternative Career Guideline