দুই মন্ত্রীর সফর বাতিলে ভারতকে শেখ হাসিনার ‘বার্তা’

বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল (ক্যাব) নিয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সহিংস বিক্ষোভের মুখে পূর্বনির্ধারিত সফর বাতিল করেছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুই মন্ত্রীর সফর বাতিলকে ‘বার্তা’ হিসেবে দেখছে পশ্চিমবঙ্গে শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার।

শুক্রবার পত্রিকাটির এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি যে ঢাকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে তা এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট।

এতে বলা হয়, নয়াদিল্লির বিমানে ওঠার কয়েক ঘণ্টা আগে বৃহস্পতিবার সফর বাতিল করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন।

ভারত ওশিয়ান সংলাপে যোগ দিতে তিন দিনের এই সফর বাতিলের কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশে বিজয় দিবস (১৬ ডিসেম্বর) এবং বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস (১৩ ডিসেম্বর) সামনেই। সেই অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকতে হবে তাকে। একই সময়ে ওশিয়ান সংলাপের তারিখ পড়ায় তার আসা হলো না।

অন্যদিকে শুক্রবার মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড সাংমার আমন্ত্রণে শিলংয়ে যাওয়ার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের। রাতে তার মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পরে ‘উপযুক্ত সময়ে’ মন্ত্রী এই সফরে যাবেন।

আনন্দবাজারের প্রশ্ন, যেসব অনুষ্ঠানের কারণ দেখিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা হলো, সেগুলো বহু বছর ধরে ওই দিনেই হয়। ওশিয়ান সংলাপের দিনও স্থির হয়েছে মাসখানেক আগে। তা হলে সম্মতি দিয়েও শেষ মুহূর্তে কেন বিমানে উঠলেন না মোমেন?

কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। মোমেন বুধবার রাতে শেখ হাসিনার বাসভবনে দেখা করতে গিয়েই এই নির্দেশ নিয়ে ফিরেছেন।

এতে আরও বলা হয়, সম্প্রতি সংসদে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলটি যে ঢাকার রাজনৈতিক এবং সামাজিক পরিসরে গভীর অসন্তোষ তৈরি করেছে তা এই সিদ্ধান্তে স্পষ্ট হয়ে গেল। মোদি সরকারকে এতটা কড়া বার্তা দিতে সাম্প্রতিককালে দেখা যায়নি বলে মনে করছেন কূটনীতিকেরা।

অবশ্য সংবাদ সম্মেলন ডেকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার বলতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল করা আর নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাসের বিষয়টিকে পৃথকভাবে দেখা উচিত।

তার বক্তব্য, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ভারত সরকার মনে করে সামরিক শাসন এবং খালেদা জিয়ার সময়েই সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু এবং তার কন্যা শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসাই করেছেন অমিত শাহ।

রবীশ কুমার বলেন, ‘ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ এবং মজবুত। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর বাতিল এবং নাগরিকত্ব বিল পাস হওয়া দু’টি আলাদা ঘটনা। নয়াদিল্লি না আসতে পারার কারণ হিসেবে সে দেশের মন্ত্রী নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেটিকেই মানা উচিত।’

তিনি বলেছেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, কিছু বিভ্রান্তি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে সাফ ব্যাখ্যা করেছেন যে সংখ্যালঘুদের ওপর ধর্মীয় উৎপীড়ন বর্তমান সরকারের সময় হয়নি। সে দেশে পূর্ববর্তী সরকার এবং সামরিক শাসনের সময় এটা হয়েছে। বরং বর্তমান হাসিনা সরকার সংখ্যালঘুদের স্বার্থরক্ষায় বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছেন।’

এই বিল নিয়ে খোদ বাংলাদেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘তীব্র প্রতিক্রিয়া’ জানিয়েছেন বলে মনে করে আনন্দবাজার। প্রতিবেদনে তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘ভারতের নিজের দেশে অনেক সমস্যা রয়েছে। ওরা নিজেদের মধ্যে লড়াই করুক, তাতে আমাদের কিছু যায় আসে না। বন্ধু দেশ হিসেবে আমরা আশা করছি ভারত এমন কিছু করবে না, যাতে বন্ধুত্ব নষ্ট হয়।’

মোমেনের কথায়, ‘বাংলাদেশের মতো খুব কম দেশই রয়েছে যেখানে এত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রয়েছে। উনি (অমিত শাহ) আমাদের দেশে কয়েক মাস থাকলেই দেখতে পাবেন, এখানকার সম্প্রীতি নজির হতে পারে।’

বাংলাদেশ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিল পাসের সময় যেভাবে বারবার পাকিস্তানের সঙ্গে একই বন্ধনীতে বাংলাদেশকে রেখে সংখ্যালঘু নিপীড়নের দিকটি তুলে ধরা হয়েছে, তা শেখ হাসিনা সরকারের জন্য বিড়ম্বনার।

ঢাকা সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, কার সময়ে কী ঘটেছে সেই কাদা বারবার ছোড়ায় সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে সার্বিকভাবে একটি বার্তা গেছে। আওয়ামী লীগের কট্টর ইসলামী অংশকে ভারত-বিরোধিতার জিগির তোলায় উদ্বুদ্ধ করার পক্ষে তা যথেষ্ট। ভারত-বিদ্বেষী প্রচারের ইন্ধন জোগাতে শুরু করেছে বিএনপিও।

গত অক্টোবরে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যে কূটনৈতিক কর্মকর্তারা ভারতে এসেছিলেন, তাদের মতে- আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে মুসলিমদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের জনমানসে। ঘরোয়া রাজনীতিতে এটা শেখ হাসিনার পক্ষে অনুকূল নয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আওয়ামী লীগের ইসলামপন্থী অংশ ভারত-বিরোধী প্রচার শুরু করলে ভারত-বাংলাদেশ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক আদান-প্রদান বাধার মুখে পড়তে পারে বলে তাদের আশঙ্কা। মাঝখান থেকে চীনের প্রতি নির্ভরতা বাড়বে ঢাকার।

সুত্র: দৈনিক আনন্দবাজার।