ব্যাক্তিগত বলে সরকারী টাকা: ১২ লাখ টাকার কাজে লাভ ৮ লাখ টাকা
- আপডেট সময় : ১২:০৩:৪৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
- / ১০২০ বার পড়া হয়েছে
ব্যাক্তিগত বলে সরকারী টাকা: ১২ লাখ টাকার কাজে লাভ ৮ লাখ টাকা
আস্থা ডেস্কঃ
এক টাকার দুর্নীতি প্রমাণ করতে পারলে সংসদ থেকে ইস্তফা দেবেন হাসনাত আব্দুল্লাহ। দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক জায়গায় দাঁড়িয়ে জনগণকে এমন চ্যালেঞ্জ দেন তিনি অথচ তার নিজ সংসদীয় আসনে লুটতরাজ ও অর্থনৈতিক অপরাধ এখন ওপেন সিক্রেট।
হাসনাত আব্দুল্লাহর নির্বাচিত এলাকা কুমিল্লার দেবিদ্বার পৌরসভার এক নম্বর ওয়ার্ডের মরিচাকান্দা পূর্বপাড়ার বাইতুলফালা জামে মসজিদ। জাতীয় নির্বাচনে শাপলা কলিতে ভোট দিতে হবে এমন শর্ত জুড়ে দিয়ে মসজিদ সংস্কার করে দেবেন নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে এমন আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয়দের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এমপি বনে গেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহ কিন্তু যে কথা দিয়েছিলেন এলাকাবাসীকে সেই কথা রাখেননি তিনি। এ নিয়ে চারদিকে সমালোচনা শুরু হলে কয়েক মাস পর নিজস্ব নেতাকর্মীদের পাঠিয়ে দায় সারা কাজ করে দেন এই সংসদ সদস্য।
স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিছে যে আমার ব্যক্তিগত টাকা দিয়ে কাজ করব। পরে শুনলাম যে ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা আসছে। কাজ করছে মাত্র সাড়ে তিন লাখ থেকে চার লাখ।’
ওই এলাকার এক তরুণ বলেন,‘বাজেট আনছে কুমিল্লা-৪ আসনের আমাদের এমপি হাসান আব্দুল্লাহ। উনি আইনা যারে এই কন্টাক্টে দিছে উনি এই কাজটা করছে। কিন্তু যতটুকু কাজ করছে ততটুকু কাজ ঠিক হয় নাই।’
আবার কাজের মান নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। এলাকাবাসী বলছে তরিঘরি করে কোনমতে কাজ করে গেছেন হাসনাত আব্দুল্লাহর লোকজন। কত টাকার কাজ হয়েছে এমন প্রশ্ন করলে তারা বলেন সর্বোচ্চ তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে এবং এমপি নিজ পকেট থেকে দিয়েছেন এই অর্থ।
মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা সিরাজুল ইসলাম মিরণ বলেন, তারা বলেছিল ব্যক্তিগতভাবে কাজটা যত টাকা খরচ লাগে এটা করে দেবে। সামনে জাতীয় নির্বাচন—একটা ভোটের জন্য এলাকাবাসী দাবি রাখবে। হাসনাত ভাই ব্যক্তি হিসেবে কাজ করাই দেবে।
তিনি বলেন, ১২ লাখ টাকা কাজ করছে। এটার খরচটা কতটুকু হতে পারে আমরা একটা কন্টাক্টর সাথে আলাপ করেছি, কন্টাক্টর বলছে তিন থেতে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হতে পারে এটার।
কিন্তু গণেশ উল্টে গেছে নদীতে। বাইতুলফালা জামে মসজিদ সংস্কারের জন্য ই-টেন্ডারের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ আসে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকা। এই তথ্য মসজিদ কমিটি জানে কিনা জানতে চাইলে তারা বলেন এ বিষয়ে তাদের কিছুই জানানো হয়নি।
সিরাজুল ইসলাম মিরণ বলেন, জেলা প্রশাসকের একটা মিটিংয়ে আমরা জানতে পারি আমাদের বাইতুলফালাহ জামে মসজিদের নামে ১১ লাখ ৮১ হাজার টাকার একটা বাজেট আসছে। উনারা ওই অতীতে বলছে ব্যক্তি দিছে অহন আমরা পরে দিয়া দেখি এটা সরকারিভাবে কাজটা আসছে।
মসজিদের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাতের ঘটনা শুনে অবাক স্থানীয় বাসিন্দারা। বলেন, সংসদে দাঁড়িয়ে নীতি কথা বলা হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজ এলাকায় লুটপাটের সংস্কৃতি চালু করবেন এটি তারা কখনো ভাবেনি।
মসজিদ কমিটির উপদেষ্টা মিরণ বলেন, হাসনাত ভাই উনি সবসময় নীতিতে থাকেন। উনি আমাদের সাথে ১২ লাখ টাকার বাজেটের প্রতারণা করছেন, এটা ভালো দেখা যায় নাই। এটা ভালো যুক্তিতে আসে নাই। এটা আমাদের সমাজবাসীর মনে খুব কষ্ট লেগেছে। যারা সরকারি বাজেট দেন তাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে বিষয়টা যেন একটু দেখে।
এ বিষয়ে ই-টেন্ডার আবেদনকারী ব্যক্তি ইয়াহিয়ার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, টেন্ডার তিনি আবেদন করেছিলেন ঠিক কিন্তু কত টাকা বরাদ্দ এসেছে সেটি তিনি জানেন না।
ইয়াহিয়া জানান, কত টাকা বরাদ্দ এসেছে সেটা জেলা পরিষদ লোকেরা ভালো জানেন, আর যে কাজ করছে উনি ভালো জানে। আমাদের কাগজ দেখান নাই। এটার বরাদ্দ কত টাকা আসছে ওইটা পর্যন্ত আমাদের জানানো হয়নি। আমাদের নানা তালবাহানা দেখাইছে।
পরে ঠিকাদার মেসার্স মমতাজ এন্টারপ্রাইজের স্বত্তাধিকারী মোঃ ফরহাদুল মিজানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, কার্যাদেশ তিনি পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সেই কাজ সাব-ঠিকাদার বিল্লাল হোসেনকে দিয়ে করিয়েছেন।
তিনি বলেন, বিক্রি না যাকে কাজ দিছি তিনি আমার পরিচিত আরকি। এটা জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার জানে। এটার কোন অনিয়ম হওয়ার কথা না। কারণ জেলা পরিষদের ইঞ্জিনিয়ার দাঁড়ায়ে কাজ তদারকি করে।
বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি কাজটি হাত বদল করে দিয়েছেন রিয়াদ নামের আরেক ব্যক্তির কাছে, যিনি স্থানীয় এনসিপির রাজনীতির সাথে জড়িত।
জানা যায়, বিল্লাল দেবিদ্বার ক্যাপটেন সুজাত আলী সরকারির কলেজ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি ও জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার আসামি।
বিল্লাল হোসেন জানান, আমি কাজ করি না ছোট ভাইকে রিয়াদকে দিয়ে দিছি। আমি তিন-চার বছর দেবিদ্বারে কোনো কাজ করিনি। কিন্তু দুই-একজনকে কাজ নিয়ে দিছি।
তিনি বলেন, আমরা এক সময় ঠিকাদারি করতাম। ছোট ভাই রিয়াদ নতুন আরকি, এনসিপিতে সংযুক্ত আছে কিনা আমি সঠিক জানি না। ছেলেটা আবার ওই মেইন ঠিকাদার থেকে ক্রয় করে নিয়ে আসছে এবং এটা ৫ শতাংশ না ১০ শতাংশ লেস আছে।
কালের কণ্ঠের হাতে আসা নথিতে দেখা যায়, বিল্লাল রিয়াদের কথা বললেও এই কাজ বাস্তবায়ন করেছে এই ছাত্রলীগ নেতার ছোট ভাই ইকবাল হোসেন।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন বরাদ্দ নিয়ে যদি কোনো নয়ছয় করা হয় তাহলে সেটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কুমিল্লা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ গোলাম জাকারিয়া বলেন, যে অভিযোগটি এখানে আমি জানলাম সেটি আমি নোটডাউন করেছি এবং আমি খোঁজ খবর নেব। খোঁজ খবর নিয়ে যদি সত্যি সত্যি এখানে কোনো ব্যত্যয় হয়ে থাকে আমার প্রশাসক মহোদয় আছে উনার সাথে আলাপ করে যে আইনগত প্রক্রিয়া আছে বা ব্যবস্থা আছে আমি সেটা নেব।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ









