ভোটের প্রচারে ভারত নিয়ে নীরব বিএনপি-জামায়াত
- আপডেট সময় : ০৯:৩৯:০৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১০৫৯ বার পড়া হয়েছে
ভোটের প্রচারে ভারত নিয়ে নীরব বিএনপি-জামায়াত
স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ৮ দিন। নির্বাচনি প্রচারে ব্যস্ত প্রধান দুই দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিগত নির্বাচনগুলোতে নির্বাচনি প্রচারে ভারত ইস্যুটি বিশেষ গুরুত্ব পেলেও এবারের প্রচারে ভারত ইস্যুটি নেই বললেই চলে।
আগামী নির্বাচনকে বিতর্কিত ও বাধাগ্রস্ত করতে দিল্লি যখন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে মাঠে নামানো, নির্বাচন নিয়ে নানামুখী নেতিবাচক প্রচারণাসহ বিরামহীন অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে ভারত ইস্যুতে নীরব বিএনপি ও জামায়াত।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান দুই দলের ভারতনীতি ঠিক কী হবে-তা নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নয় এই দুই দল। বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও এ ব্যাপারে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী আমার দেশকে জানিয়েছেন, ভারত ইস্যুতে নির্বাচনের আগে আমরা কথা বলতে চাই না। জামায়াত নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা শুধু বলেছেন, ভারতসহ আমরা সব দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক চাই।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এবং দলটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগবিষয়ক কমিটির সদস্য এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আমার দেশকে বলেন, জামায়াতের পররাষ্ট্রনীতি হলো- আমরা সব দেশের সঙ্গে সমান সম্মান ও মর্যাদার স্থান চাই। ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমরা একই নীতিতে বিশ্বাসী।
ভারত ইস্যুতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর এই নীরবতাকে দুর্ভাগ্যজনক আখ্যা দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত ইস্যুতে সুস্পষ্ট অবস্থান না থাকলে দিনশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকে তার মূল্য দিতে হবে। নির্বাচনের মাধ্যমে যারাই সরকার গঠন করবে, তাদের দিল্লিকে ডিল করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনের প্রধান দুই দল ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা করছে। তাই নির্বাচনের আগে ভারত অখুশি হয়-এমন কিছু বলতে চাইছে না তারা। তবে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে ভারত যে তাদের চেপে ধরবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আগামী নির্বাচিত সরকারকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার পাশাপাশি মনে রাখতে হবে-বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম ভারতীয় আধিপত্যবাদ কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
নির্বাচনি প্রচারে ভারত ইস্যু বিশেষ করে তাদের আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য তেমনভাবে না থাকা-দিল্লির জন্য স্বস্তিদায়ক বলে মনে করছেন ভারতের থিংকট্যাংক ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। তারা বলছেন, বিএনপির নির্বাচনি স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। দলটি দিল্লি ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সমদূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেছে। একই সঙ্গে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের ওপর পাকিস্তান জামায়াতের কোনো প্রভাব নেই।
উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে একের পর এক অপতৎপরতা চালিয়ে আসছে দিল্লি। শুরু তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতনের ভুয়া অভিযোগ তুলে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতে অব্যাহতভাবে চালানো হয়েছে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণা। নানা উসকানিমূলক বক্তব্য সংবলিত শেখ হাসিনার ফোনালাপ ধারাবাহিকভাবে ফাঁস করা হয়েছে। টার্গেট করা হয়েছে ভারতে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোকে। উগ্রবাদী হিন্দুরা মোদি সরকারের সম্মতিতে একের পর এক তাণ্ডব চালিয়েছে মিশনগুলোতে।
দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াজ হামিদুল্লাহকে হত্যার হুমকিসহ শিলিগুড়িতে অবস্থিত বাংলাদেশের ভিসা সেন্টার জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দু নির্যাতনের ভুয়া অভিযোগ তুলে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে। যার ফলে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সর্বশেষ আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে অপতৎপরতায় নেমেছে দিল্লি।
নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত ও বিতর্কিত করতে শেখ হাসিনাকেও শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে নামিয়েছে। প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতাদের মতবিনিময়ের সুযোগ করে দিয়েছে দিল্লির ডিপ স্টেট। ওই মতবিনিময় অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার চরম উসকানিমূলক একটি অডিওবার্তা তুলে ধরা হয়েছে।
ওই অডিওবার্তায় শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনকে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন ভন্ডুলে সন্ত্রাস উসকে দিয়েছেন। নির্বাচন বিতর্কিত বা বাধাগ্রস্ত করতে এসব অপতৎপরতার পাশাপাশি টার্গেট করা হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে এ যুগের ইয়াহিয়া খান হিসেবে তুলে ধরেছে। দিল্লির টার্গেট নির্বাচন ভন্ডুল করা। আর এটা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে ‘না’ ভোটকে জয়যুক্ত করার পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতি ৫০ শতাংশের নিচে রাখতে নানা তৎপরতা চালাচ্ছে দিল্লি।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বিষয়টি দেখভাল করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, দিল্লির বাংলাদেশবিরোধী এসব অপতৎপরতা তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে কড়া প্রতিক্রিয়া দেখানো হলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এসব ব্যাপারে একেবারেই নীরব। এটা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। রাজনৈতিক দলগুলো যদি দিল্লির এসব পদক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতো তাহলে দিল্লিকে ডিল করা আমাদের জন্য আরো সহজ হতো।
ওই কর্মকর্তা আরো বলেন, আমাদের মিশনগুলো আক্রান্ত হলো, এটা আমাদের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত। অথচ বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো কোনো ধরনের প্রতিবাদ করল না। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে আমরা কোনো বিবৃতিও দেখিনি। দিনশেষে রাজনৈতিক দলগুলোকেই দিল্লিকে ডিল করতে হবে। তখন নিশ্চিতভাবেই বিষয়টি রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে।


















