সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও হয়নি গ্রেফতার হতাশ মুনিয়ার পরিবার
- আপডেট সময় : ০৮:২১:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৪ মে ২০২১
- / ১০৪০ বার পড়া হয়েছে
রাজধানীর গুলশানের আলোচিত মোসারাত জাহান মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর পর প্রায় এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ ও গ্রেফতার করেনি পুলিশ। এ নিয়ে ওই তরুণীর পরিবারসহ বিভিন্ন মহলে হতাশা দেখা দিচ্ছে।
গত রোববার কুমিল্লায় ও তার আগের দিন ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে দ্রুত আনভীরকে গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়। এছাড়া চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে চট্টগ্রামের এমপিপুত্রকে আসামি করে নতুন করে হত্যা মামলার আবেদন ও ভিকটিমের চরিত্রহননের অপচেষ্টা একই সুতোয় গাঁথা বলে দাবি করেন প্রথম মামলার বাদী ও মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। আনভীরকে রক্ষায় বিশেষ মহল থেকে প্রভাবিত হয়ে তার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ এ জঘন্য কাজ করছে বলে মনে করেন তিনি।
তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের দাবি, শক্ত প্রমাণ হাতে নিয়েই কলেজছাত্রী মুনিয়ার প্রেমিকা বসুন্ধরা এমডি সায়েম সোবহান আনভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। প্রধান অভিযুক্ত দেশেই আছেন এবং তাকে নজরদারিতে রাখার চেষ্টা চলছে। ওই তরুণীর মৃত্যু হত্যা নাকি আত্মহত্যা সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
[irp]
অপর একটি সূত্র মতে, আনভীরকে গ্রেফতারের বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। ‘ওপর মহলের’ সিগন্যালের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ। ওদিকে মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কল রেকর্ড ফরেনসিক পর্যালোচনার জন্য আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী। স্বরাষ্ট্রসচিব বরাবর গতকাল সোমবার এই নোটিশটি পাঠানো হয়।
এদিকে দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় নতুন করে মোড় নিয়েছে। মুনিয়ার যে ভাই এর আগে বলেছে, ঘটনার দুই দিন পর পর্যন্ত তিনি কিছু জানতেন না, দীর্ঘ দিন ধরে পারিবারিক কারণে কোনো সম্পর্ক ছিল না, হঠাৎ করে সেই ভাই সক্রিয় হওয়া ও আরেকজনকে আসামি করে হত্যা মামলার আবেদন-নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে। মূলত বসুন্ধরার এমডি আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দায়ের হওয়া হত্যা প্ররোচনা মামলাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমন প্রয়াস চালানো হতে পারে।
গুলশান থানার মামলার বাদী নিহত মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে মানবকণ্ঠকে বলেন, প্রেমের জালে ফেলে আমার বোনের সঙ্গে দীর্ঘদিন অবৈধ সম্পর্ক চালিয়েছে বসুন্ধরার এমডি আনভীর। ছয়টি ডায়েরিতে, দুটি মোবাইল ফোন সেটে ও ওই বাসার সিসি ক্যামেরায় এর সকল তথ্য-প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ।
আনভীর আত্মহত্যায় প্ররোচনা দিয়েছেন, সেই প্রমাণও পেয়েছে। এমনকি হত্যাও করতে পারে ধারণা করছি। কিন্তু, তাকে এখনো গ্রেফতার করেনি পুলিশ। আনভীরদের কালো হাত নিশ্চয়ই আইনের হাতের চেয়ে লম্বা নয়। শুধু আমরা নই, দেশের অধিকাংশ মানুষ মুনিয়ার রহস্যজনক মৃত্যুর বিচার চাইছে।
জানতে চাইলে ডিএমপির গুলশান বিভাগের ডেপুটি কমিশনার সুদীপ চক্রবর্তী বলেন, মুনিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় সন্দেহজনক আসামিদের প্রয়োজনে জেরা করবে পুলিশ। অনেককে নজরদারিতে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কলেজশিক্ষার্থী মুনিয়া তার ডায়েরিতে তাদের সম্পর্ক, সম্পর্কের সামাজিক স্বীকৃতিতে বাধা, অভিযুক্তের সঙ্গে তার সুখী দাম্পত্য জীবনের প্রত্যাশা ও পরিবারের বাধার বিষয়ে লিখে গেছেন। ডায়েরিগুলোতে চরম হতাশার বর্ণনা রয়েছে, যা মামলাটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের কল রেকর্ডের ফরেনসিক চেয়ে নোটিশ: কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান ওরফে মুনিয়ার সঙ্গে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া কল রেকর্ড ফরেনসিক পর্যালোচনার জন্য আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবী।
সোমবার স্বরাষ্ট্রসচিব বরাবরে পাঠানো আইনজীবী ইয়াদিয়া জামান তার নোটিশে বলেন, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান ও নুসরাত জাহান মুনিয়ার মধ্যে কথোপকথনের একটি রেকর্ড ফাঁস হয়েছে। ওই কল রেকর্ডে সায়েম সোবহান যেসব শব্দ ভিকটিম মুনিয়ার ক্ষেত্রে ব্যবহার করেছেন, তা যেকোনো নারীর জন্য অত্যন্ত অপমানজনক। উল্লিখিত কল রেকর্ড ফরেনসিক পর্যালোচনার জন্য এবং যদি ফরেনসিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ওই ‘অশ্লীল শব্দ’ প্রয়োগকারী ব্যক্তি সায়েম সোবহান, তাহলে তার বিরুদ্ধে যেন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
আনভীর কোথায়, প্রশ্ন মানববন্ধনে: বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে গ্রেফতারের দাবিতে গত শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড। বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরকে গ্রেফতারের দাবিতে এক মানববন্ধন থেকে তার বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে জানাতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ মানববন্ধনে সংগঠনের সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা দেখতে পেরেছি যারা অর্থ-বিত্তের মালিক, তারা বিভিন্নভাবে অপকর্ম করে পালিয়ে যায়। আবার কিছুদিন পরে দেশে ঢুকে আগের অবস্থানে চলে আসে। ‘সিভিল এভিয়েশন বলছে এক কথা, পুলিশ বলছে আরেক কথা। আমরা সুস্পষ্টভাবে জানতে চাই, আনভীর কোথায়? কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না?’
মুনিয়ার বাসায় আনভীরের যাতায়াতের তথ্য মিলেছে: গুলশানের আলোচিত মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। গুলশানের ওই বাসার মূল গেটে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ বিশ্লেষণ করে মুনিয়ার বাসায় বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের যাতায়াতের তথ্য পেয়েছে পুলিশ।
পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, আমরা সিসিটিভি ফুটেজের প্রতিটি সেকেন্ড বিশ্লেষণ করছি। ফুটেজে অনেক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্য-প্রমাণে এগুলো কাজে লাগবে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ছাড়াও মুনিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ফরেনসিক পরীক্ষা করিয়ে তার সঙ্গে সায়েম সোবহান আনভীরের প্রেমের সম্পর্কের বিষয়টি জানার চেষ্টা চলছে। ঠিক কী কারণে তাদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছিল এবং ভিকটিমকে মোবাইল ফোনে খুদেবার্তার মাধ্যমে কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল তা জানার চেষ্টা চলছে। এ ছাড়া মুনিয়ার ব্যবহৃত ছয়টি ডায়েরিতে সায়েম সোবহান আনভীরকে উদ্দেশ্য করে লেখা অভিমান ও হতাশার কথাগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় গুলশানের ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাসার তৃতীয় তলার একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বাদী হয়ে বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ এনে মামলা দায়ের করেন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, আনভীরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। প্রতি মাসে এক লাখ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে আনভীর মুনিয়াকে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করত বসুন্ধরার এমডি। তারা স্বামী-স্ত্রীর মতো করে থাকত।
মুনিয়ার বোন অভিযোগ করেছেন, তার বোনকে বিয়ের কথা বলে ওই ফ্ল্যাটে রেখেছিল। একটি ছবি ফেসবুকে দেয়াকে কেন্দ্র করে সায়েম সোবহান তার বোনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়। ফলে আত্মহত্যা নয়, মুনিয়াকে হত্যা করা




















