হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চায় ফরিপুরের মালঞ্চ নদী
- আপডেট সময় : ০৭:৩৭:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ জুলাই ২০২৩
- / ১১০৯ বার পড়া হয়েছে
হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেতে চায় ফরিপুরের মালঞ্চ নদী
মামুনুর রশীদ/ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
সূজলা সুফলা বাংলাদেশের সৌন্দর্য বিকাশে নদ-নদের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের কথা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। তথাপি নদী মাতৃক বাংলাদেশের মানচিত্রের পাতায় আজকাল নদীর চিত্র দৃশ্যমান হলেও বাস্তব চিত্রে কালের গর্ভে বিবিধ কারণে হারাতে বসেছে আমাদের নদ-নদের সৌন্দর্যপূর্ণ অতীত ইতিহাস। দেশের প্রধান প্রমত্ত পদ্মা নদী, কুমার ও আড়িয়াল খাঁ নদের অববাহিকায় ফরিদপুর জেলা। যে জেলার শহরের উপর দিয়ে প্রবাহিত কুমার নদ। আর সে নদের দেহের মধ্যেব্তীর অঙ্গনে বয়ে চলেছে একটি শাখা নদ হিসেবে মালঞ্চ নদী। বিশেষ করে জেলার সালথা উপজেলার সালথা বাজার অতিক্রমকালে অনেকের কাছে দৃশ্যমান শাখা বিশেষ মালঞ্চ নদী।
যতদূর অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাতক্ষীরা জেলার সুন্দর বন ও রাজশাহীতে মালঞ্চর নামে আরও পৃথকভাবে দুটি নদী আছে। কিন্তু ফরিদপুরের মালঞ্চ নদ হয়তো অন্য দুটোর দীর্ঘ নদ না হলেও শতাব্দীর প্রাচীণ ইতিহাস ঐতিহ্য স্মৃতি বহন করছে বলে অভিমত অভিজ্ঞ মহলের।
জানা যায়, ফরিদপুরের মালঞ্চ নদী সালথা উপজেলার গট্টিবাজারে কুমার নদ থেকে উৎপত্তি লাভ করে সিংহপ্রতাপ, গৌড়দিয়া, সলিয়া, সেনহাটি, খাগৈড়, গোয়ালপাড়া, গোবিন্দপুর ও দুর্গাপুর এই আটটি গ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। এনদটি জনপদ ও গ্রাম ছাপিয়ে ১২ কিলোমিটার পথপাড়ি দিয়ে পুনরায় কুমার নদের সঙ্গে এসে মিশেছে। এরফলে অনেকে এটিকে কুমার নদের অংশ বলেই মনে করেন। মাত্র ৩০ থেকে ৪০ বছর আগেও মালঞ্চ নদীতে নানান প্রজাতের দেশীয় মাছের সম্ভারে পরিপূর্ণ থাকলেও আজ সেই অবস্থা চোখে পড়ে না।
স্থানীয় সূত্র মতে, মালঞ্চ নদের মাছ শুঁটকি দিয়ে সারা বছরের খাদ্য সংস্থানের জন্য রেখে দিতেন গ্রামের সাধারণ মানুষের থেকে শুরু করে জেলে সম্প্রদায় পরিবার।
কিন্তু কালের বিবর্তনে অনেক কিছুর সঙ্গে মালঞ্চ নদীও যেমন তার আগের রূপলাবন্য হারিয়েছে। তেমনি দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি অতীতের সেই সৌন্দর্যপূর্ণ নদীটি খরস্রোতা ও সুন্দর নামটি আজ হারাতে চলেছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই জানেন না মালঞ্চ নদীর নাম।নদীর পাড়ে বেড়ে ওঠা বর্তমান প্রজন্মেরও কেউ কেউ জানেন না মালঞ্চ ছিল নদীর আসল নাম। ফরিদপুরের সরকারি-বেসরকারি নথিপত্রে কোথাও নেই মালঞ্চ নদীর অস্তিত্বের বিবরণ।
স্থানীয়রা আরও জানান, শুকনো মৌসুমে খড়ায় পানি শুকিয়ে জেগে উঠে মালঞ্চ নদী। নদীটি সম্প্রতি খনন করা হয়েছে। শুকনো মৌসুমে হাটু পানি থাকে কোথাও। আবার বর্ষায় পানিতে ভরে উঠে নদীর বুক। এ মৌসুমে ফরিদপুরের প্রধান অর্থকরী ফসল পাট জাগ দেওয়া হয় এ নদীতে। পাটের পচা হাজামজা পানি নিয়েই বয়ে চলে নদী। গ্রামের সহজ সরল প্রকৃতির মতোই তার ছুটে চলা। সুন্দর স্নিগ্ধতা জড়ানো এই নদী যেনো সকলের অগোচরে হারিয়ে যাচ্ছে। মালঞ্চ নদীর নামকরণের সঙ্গে মিশে রয়েছে অনেকের করুণ শোক গাঁথা।
কিন্ডারগার্টেন স্কুলের পরিচালক সূধীর দত্ত ওরফে উত্তম জানান, নবাবী আমলে সালথায় বড় জমিদার ছিলেন প্রতাপ সিংহ। তার মেয়ে যার নাম ছিল মালঞ্চ। নদীতে নৌকায় বাড়ি ফেরার সময় সে নৌকাডুবিতে মারা গেলে তার নাম অনুসারেই এই নদীর নাম হয় মালঞ্চ।
সালথার বাসিন্দা শ্রাবণ হাসান বলেন, এমন একটি সুন্দর নামের নয়নাভিরাম নদী রয়েছে আমাদের সালথায় অথচ তেমনভাবে কখনো জানা হয়ে উঠেনি। নতুন প্রজন্মের বেশিরভাগই এ নদীর নাম জানে না।
স্থানীয় যুবক হারুন-অর-রশীদ বলেন, প্রকৃতির মাঝে বয়ে চলা মালঞ্চ নদীর অপরূপ দৃশ্য সৌন্দর্য পিয়াসীদের আকৃষ্ট করে। নদীটি এখনো হারিয়ে যায়নি। তবে এই নদীর সুন্দর নামটি এখন হারাতে চলেছে।
মাহবুব হাসান বলেন, বাপ দাদার মুখ থেকে আমরা শুনেআসছিলাম একটি সময় এনদীতে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতের অনেক মাছ পাওয়া যেত। চাহিদা মিটিয়ে অতিরিক্ত মাছ শুকিয়ে শুঁটকি করে রাখা হতো। এটি আজ অনেকের কাছে রুপকথা মনে হলেও বাস্তব সত্যি কথা। আশির দশকের দেখা সেই ভরা ঐশ্বর্যের মালঞ্চ নদী আজ শুধু তার নাব্যতাই হারায়নি আজ নামটিও হারাতে চলেছে।
অভিজ্ঞ মহলের দৃষ্টিতে নদীমাতৃক বাংলাদেশে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুপ প্রভাব থেকে বাঁচতে হলে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় অনেক নদ-নদী মালঞ্চ নদীর মত তার রূপলাবণ্য হারাতে চলেছে। কিন্তু নদী মাতৃক বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে সকল নদ নদীর বাঁক মুছে যাওয়ার আগেই তা ফিরিয়ে আনা শুধু সময়ের দাবীই নয় অপরিহার্য দাবি হয়ে উঠেছে।
ফরিদপুর নাগরিক মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক পান্না বালা বলেন, বর্তমান প্রজন্মের অনেকে মালঞ্চ নদীর নামই জানে না এটা উদ্বেগজনক। এ জন্য নদীটি রক্ষা যেমন জরুরি, তেমনি মালঞ্চ নদীর নামটিও সরকারি নথিপত্রে উল্লেখ থাকা দরকার বলে অভিমত প্রকাশ করেন।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আক্তার হোসেন শাহিন বলেন, মালঞ্চ নদীর বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমেই প্রথম জানতে পেলাম। অবশ্যই খোঁজখবর নিয়ে দেখবো। আর যদি সরকারি নথিপত্রে নদীটির নাম ও তথ্য না থাকে তাহলে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা সরকারের পক্ষ থেকে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পার্থ প্রতিম সাহা বলেন, মালঞ্চ নদী সম্পর্কে সেভাবে আমার জানা নেই। সারাদেশের নদীর তথ্য হালনাগাদ করছি। যদি এটি নদীর শ্রেণিভুক্ত হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই নদ-নদীর তালিকাভুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

















