ইরানে অভিযানরর জন্য সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
- আপডেট সময় : ১১:১৩:৫৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৫ মার্চ ২০২৬
- / ১০০৫ বার পড়া হয়েছে
ইরানে অভিযানরর জন্য সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র
স্টাফ রিপোর্টারঃ
ইরানে একটি শক্তিশালী অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরী ও যুদ্ধজাহাজগুলোতে ক্ষেপনাস্ত্র ও গোলাবারুদের স্টক ফুরিয়ে গেছে। তাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটামের পর ৫ দিন সময় নিয়েছেন।
যুদ্ধ করার মত রসদ যোগানোর জন্য কৌশল হিসেবে ট্রাম্প এখন আলোচনা ও সময়ক্ষেপণের কৌশল গ্রহণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য যুদ্ধজাহাজগুলো মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে গড়ে ৫ থেকে ৭ দিন সময় লাগে।ট্রাম্প প্রথমে ৪৮ ঘণ্টা এবং পরে ৫ দিনের মত সময় নিয়েছে।
ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য মূলত হরমুজ প্রণালিতে একটি যৌথ অভিযান চালিয়ে ইরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালির দখল নেওয়া। মাঝখানে শান্তি আলোচনার নামে ট্রাম্প একটি ধাপ্পাবাজি করার কৌশল নিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে চলমান সামরিক অভিযানে (অপারেশন এপিক ফিউরি) যুক্তরাষ্ট্রের যেসকল বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ সরাসরি যুক্ত রয়েছে এবং বেশ কিছু যুদ্ধজাহাজ এই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে বা হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
সেসকল মার্কিন রণতরীগুলোর তালিকা:-
ক. ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (USS Abraham Lincoln – CVN 72):
এটি বর্তমানে ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের মূল চালিকাশক্তি। রণতরীটি আরব সাগরে অবস্থান করছে এবং ইরান বিরোধী অভিযানে বিমান হামলা এবং গোয়েন্দা নজরদারি চালাচ্ছে। এই বিমানবাহী রণতরীর স্ট্রাইক গ্রুপে আরও রয়েছে তিনটি ‘আরলি বার্ক’ ক্লাসের ডেস্ট্রয়ার।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন (CVN 72) বিমানবাহী রণতরীকে সুরক্ষা দিতে এবং ইরানে সরাসরি আক্রমণে অংশ নিতে বর্তমানে যে তিনটি আরলি বার্ক (Arleigh Burke) ক্লাসের ডেস্ট্রয়ার যুক্ত সেগুলো হলো:-
১. ইউএসএস স্প্রুয়েন্স (USS Spruance – DDG 111): এটি বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে এবং আকাশপথের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থলভাগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
২. ইউএসএস মাইকেল মারফি (USS Michael Murphy – DDG 112): এই শক্তিশালী ডেস্ট্রয়ারটি বর্তমানে আব্রাহাম লিংকন স্ট্রাইক গ্রুপের প্রধান অংশ হিসেবে মোতায়েন আছে।
৩. ইউএসএস ফ্রাঙ্ক ই. পিটারসেন জুনিয়র (USS Frank E. Petersen Jr. – DDG 121): এটি এই বহরের সবচেয়ে নতুন জাহাজগুলোর একটি। এটি বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নজর রাখছে।
এই জাহাজগুলো মূলত বিমানবাহী রণতরীকে ঘিরে একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করে রাখে এবং প্রয়োজনে শত শত টমাহক (Tomahawk) ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করতে সক্ষম।
খ. ইউএসএস জেরাল্ড আর. ফোর্ড (USS Gerald R. Ford – CVN 78): যুদ্ধের শুরু থেকে এটি লোহিত সাগরে মোতায়েন ছিল এবং সক্রিয়ভাবে ইরান আক্রমণে অংশ নিয়েছিল।
১২ মার্চ জাহাজটি ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে ওটা ছিল অগ্নিকাণ্ড। বর্তমানে এটি মেরামতের জন্য গ্রিসের সৌদা বে (Souda Bay) নৌ-ঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
গ. ইউএসএস ট্রিপলি (USS Tripoli – LHA 7): এটি একটি উভচর হামলাকারী জাহাজ (Amphibious Assault Ship), যা বর্তমানে জাপান থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে রওনা হয়েছে। এটি প্রায় ৫,০০০ মেরিন সেনা ও নাবিক নিয়ে এই অঞ্চলে শক্তিবৃদ্ধি করতে আসছে।
ঘ. ইউএসএস বক্সার (USS Boxer – LHD 4): ২০ মার্চ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রায় ২,৫০০ মেরিন সেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূল থেকে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে।
অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ:
পারস্য উপসাগরে বর্তমানে তিনটি লিটোরাল কমব্যাট শিপ যথাক্রমে ইউএসএস ক্যানবেরা, ইউএসএস টুলসা এবং ইউএসএস সান্তা বারবারা অবস্থান করছে।
এই তিনটি জাহাজই যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিপেন্ডেন্স-ক্লাস লিটোরাল কমব্যাট শিপ (LCS)। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সাথে যুদ্ধে এই তিনটি জাহাজকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে মোতায়েন করা হয়েছে।
এই তিনটি জাহাজের বর্তমান অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য:
১. ইউএসএস ক্যানবেরা (USS Canberra – LCS 30): এটি বর্তমানে পারস্য উপসাগরে অবস্থান করছে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র যুদ্ধজাহাজ যা একটি বিদেশি শহরের (অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী) নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং সিডনিতে কমিশন লাভ করেছে। এটি মূলত দ্রুতগতির নজরদারি এবং মাইন শনাক্তকরণের কাজে নিয়োজিত।
২. ইউএসএস টুলসা (USS Tulsa – LCS 16): এটি ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যবর্তী এলাকায় টহল দিচ্ছে। ছোট এবং দ্রুতগামী হওয়ায় এটি উপকূলীয় অঞ্চলে ইরানের ছোট স্পিডবোট বা ড্রোনের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।
৩. ইউএসএস সান্তা বারবারা (USS Santa Barbara – LCS 32): এটি এই বহরের সবচেয়ে নতুন জাহাজগুলোর একটি। বর্তমানে এটি বাহরাইন ভিত্তিক মার্কিন ৫ম ফ্লিটের সাথে যুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
এই তিনটি জাহাজের প্রধান কাজ:
১. উপকূলীয় নিরাপত্তা: বড় রণতরীগুলো গভীর সমুদ্রে থাকলেও এই LCS জাহাজগুলো অগভীর পানিতে বা উপকূলের কাছাকাছি অপারেশন চালাতে পারে।
২. ড্রোন মোকাবিলা: ইরানের ছোট ড্রোন এবং কামিকাজে বোটের আক্রমণ ঠেকাতে এগুলো বিশেষভাবে কার্যকর।
৩. ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধ: এগুলো উন্নত সেন্সর ব্যবহার করে শত্রু জাহাজের সংকেত জ্যাম বা ট্র্যাক করতে পারে।
এছাড়া আরব সাগরে আরও ছয়টি মার্কিন ডেস্ট্রয়ার স্বাধীনভাবে টহল দিচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র অংশ হিসেবে আরব সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের ৬টি আরলি বার্ক-ক্লাস ডেস্ট্রয়ার (Destroyer) স্বাধীনভাবে মোতায়েন করা হয়েছে। এই জাহাজগুলো মূলত টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ এবং আকাশ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার কাজে নিয়োজিত।
ছয়টি মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের তালিকা:
১. ইউএসএস ম্যাকফল (USS McFaul – DDG 74): এটি বর্তমানে আরব সাগরে টহল দিচ্ছে এবং সম্প্রতি একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানের হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষা দিয়েছে।
২. ইউএসএস জন ফিন (USS John Finn – DDG 113): ১০ মার্চ এটি ইরান লক্ষ্য করে অন্তত ১৩টি টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে।
৩. ইউএসএস মিলিয়াস (USS Milius – DDG 69): এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল থেকে এসে বর্তমানে ইরান অভিযানে সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছে।
৪. ইউএসএস ডেলবার্ট ডি. ব্ল্যাক (USS Delbert D. Black – DDG 119): এটি নরফোক বন্দর থেকে মোতায়েন করা হয়েছে এবং বর্তমানে আরব সাগরে অবস্থান করছে।
৫. ইউএসএস পিঙ্কনি (USS Pinckney – DDG 91): এটি আরব সাগর থেকে ইরানে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।
৬. ইউএসএস মিটসার (USS Mitscher – DDG 57): এটি পারস্য উপসাগর ও আরব সাগরের মধ্যবর্তী কৌশলগত অবস্থানে মোতায়েন রয়েছে।
ইরান যুদ্ধে খুব শীঘ্রই মার্কিন যেসকল রণতরী মোতায়েন হতে পারে (Potential Deployment):
ক. ইউএসএস জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ (USS George H.W. Bush – CVN 77): এটি বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগরে চূড়ান্ত প্রশিক্ষণ (COMPTUEX) শেষ করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন-কে বিশ্রাম দিতে বা সহায়তার জন্য এটিকে শীঘ্রই মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হতে পারে।
খ. ইউএসএস হ্যারি এস. ট্রুম্যান (USS Harry S. Truman – CVN 75): এটি বর্তমানে নরফোক বন্দরে উচ্চ সতর্কতায় (High Alert) রয়েছে। ভূমধ্যসাগর বা লোহিত সাগরে আকাশ প্রতিরক্ষা জোরদার করতে একে যে কোনো সময় মোতায়েন করা হতে পারে।
এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে বিশেষ অপারেশন চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র কয়েকটি বিশেষ যুদ্ধজাহাজ (Surface Combatants) মোতায়েন করতে পারে। সেগুলো হলো:
১. ইউএসএস জুবওয়াল্ট (USS Zumwalt – DDG 1000): প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে থাকা এই স্টেলথ ডেস্ট্রয়ারটিকে ইরানের শক্তিশালী রাডার ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে হামলা চালানোর জন্য মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
২. ইউএসএস কানেকটিকাট (USS Connecticut – SSN 22): এটি একটি সি-উলফ ক্লাস পারমাণবিক সাবমেরিন। স্টিলথ সক্ষমতার কারণে এটিকে গোপনে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা হতে পারে।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ























