ঢাকা ০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬, ১২ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দুই লাখ নয়, চার লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৩:০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬
  • / ১০১৩ বার পড়া হয়েছে

দুই লাখ নয়, চার লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা

রাজু নূরুলঃ

একাত্তরে ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি–এমন বিকৃত বয়ান আর রাজাকারদের আস্ফালন বুকের ভেতর দহন জাগায়। এত রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশটা কি তবে জলের দামে বিক্রি হয়ে গেল?

 

 

 

 

 

 

 

কুমিল্লা কারাগারে বন্দি পাকিস্তানি এক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জিওফ্রে ডেভিস। সেই কর্মকর্তা ডেভিসকে বলেছিল, “সব পাকিস্তানি সৈন্যরা মনে করে ধর্ষণ জায়েজ।”

তারা টিক্কা খানের কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ পেয়েছিল যে, “যত পারো ধর্ষণ করো। যেহেতু একজন ভালো মুসলমান কখনো তার বাবার বিরুদ্ধে লড়বে না, ফলে যত বেশি সম্ভব বাংলাদেশি নারীদেরকে গর্ভবতী করো। এ থেকে একটা গোটা প্রজন্ম জন্মাবে, যাদের শরীরে বইবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের রক্ত।” এই ছিল ধর্ষণের পেছনে পাকিস্তানি সৈন্যদের মনস্তত্ত্ব! তার গলায় ছিল অবহেলার সুর, ‘যুদ্ধে তো অনেক কিছুই হয়! আমরা কী এমন করেছি!’

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর দেখা গেল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অথবা তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে হাজার হাজার নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন।

পরিবার ছেড়ে দিয়েছে তাদের। হয়ে পড়েছেন স্বামী পরিত্যক্তা। ভুলে গেলে চলবে না যে, গল্পটা ৫৪ বছর আগের! শিক্ষাদীক্ষা বলে তখন তেমন কিছু ছিল না। কোনো কোনো নারী গর্ভের সন্তান রাখতে চান, আবার অধিকাংশই ফেলে দিতে চান! আবার কারও গর্ভের সন্তানের বয়স হয়ে হয়ে গেছে ৭ থেকে ৮ মাস। ফলে শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণাটা গভীর। সে সময় হাসপাতালে গর্ভপাত অবৈধ ছিল বিধায় কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না।

ওরকম সময়ে ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান্ড ফাদারহুড, ইউএনএফপিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এগিয়ে আসল। তারা বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক জিওফ্রে ডেভিসকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করল। ডেভিস গর্ভপাত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন। বিশেষ করে সাড়ে ৭ মাস বয়সী ভ্রূণের গর্ভপাত বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল তার।

শুরুর দিকে কেউ ডেভিসকে সাহায্য করলেন না। সবাই ভয় পাচ্ছিলেন। ফলে ধানমন্ডির একটা ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর এগিয়ে আসে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। তারা একটা চিঠি লিখে ডেভিসকে গোটা অথরিটি দিয়ে দেয়। কিছুদিন যেতেই শত শত মেয়ে আসতে শুরু করল তার কাছে, যাদের সবার গর্ভে ‘যুদ্ধশিশু’।

ডেভিস একা হাঁফিয়ে উঠলেন। এত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে যে, তার একার পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল। তিনি একটা বুদ্ধি বের করলেন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্য কর্মীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলেন। একইসঙ্গে গর্ভপাতের কাজও চলতে থাকল।

এক শহরে কাজ শেষ হলে আরেক শহরে চলে যান তারা। ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০০জন মেয়ের গর্ভপাত করেছে তার টিম। ঢাকার বাইরেও এ সংখ্যা কাছাকাছি। প্রক্রিয়া তেমন কঠিন ছিল না, ধর্ষণের শিকার নারীরা এসে একটা কাগজে সই করে দিতেন।

১৩ বছরের এই কিশোরীকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পেট চালাতে পারবে এমন আশায় তাকে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায় রেখে গিয়েছিলেন তার বাবা।

 

 

 

 

 

 

 

 

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় প্রকাশিত এই ছবিটি তুলেছেন ডিক ডরেন্স

১৩ বছরের এই কিশোরীকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পেট চালাতে পারবে এমন আশায় তাকে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায় রেখে গিয়েছিলেন তার বাবা। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় প্রকাশিত এই ছবিটি তুলেছেন ডিক ডরেন্স

তবে ডেভিসের কাছে সাধারণত হতদরিদ্ররা আসছিলেন। যাদের টাকাপয়সা ছিল, তারা লোকলজ্জার ভয়ে গোপনে কলকাতা চলে যাচ্ছিলেন। ডেভিস বলছেন, “দেখলাম সব ধর্মের মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে একটা বিষয় আমাকে বিস্মিত করেছে। কোনো মেয়েকে আমি কাঁদতে বা ভেঙে পড়তে দেখিনি। তারা শান্ত হয়ে গোটা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতেন।”

৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের দ্বারা নারীরা কিভাবে নিপীড়নের শিকার হতেন, সে গল্পও বীণা কস্তার কাছে ২০০৬ সালে জিওফ্রে ডেভিস বলে গেছেন। বীণা তার পিএইচডির কাজে খুঁজতে খুঁজতে এই ডাক্তারের সন্ধান পান।

তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানিরা প্রথমে বোমা মেরে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করত। এরপর সেখানে সব মানুষকে জড়ো করা হতো। নিতান্ত শিশু বাদে বাকিদেরকে আলাদা করে ফেলা হতো। আওয়ামী লীগ বা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গুলি করে মারা হতো। তারপর মেয়েদেরকে একটা জায়গায় রেখে তাদেরকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করত তারা।”

কথায় আছে ডাক্তার ও উকিলের কাছে কিছু লুকাতে নেই। ডাক্তার হওয়ার সুযোগে নিপীড়নের শিকার হওয়া অসংখ্য নারীর কেইস স্টাডি ছিল তার কাছে। “ধনী ও সুশ্রী মেয়েদেরকে কর্মকর্তাদের জন্য রাখা হতো। বাকিদেরকে তুলে দেওয়া হতো নিম্নপদস্থ সিপাহীদের হাতে। এসব মেয়েরা সময়মত খাবার পেত না, অসুস্থ হলে জুটত না চিকিৎসা। অজস্র নারী ক্যাম্পেই মারা গেছে। কোনো কোনো মেয়েকে একদিনে ৮০ বারের বেশিও ধর্ষণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “বাংলাদেশে যা ঘটেছে পৃথিবীর আর কোথাও আমি এরকম ঘটনার কথা শুনিনি। এমন বিভীষিকার মধ্য দিয়ে মেয়েদেরকে যেতে হয়েছিল যে অনেকে নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তারা দুঃস্বপ্ন ও বিকারের মধ্যে থাকত। আমরা বিদেশি বলে আমাদেরও তারা বিশ্বাস করত না।” বিস্ময় নিয়ে ডেভিস বলেছেন, “মানুষ এরকম করতে পারে?”

নির্যাতিতা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। আলোকচিত্র: নাইব উদ্দিন আহমেদ

 

 

“ঠিক কত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল” বীণা কস্তা এই প্রশ্নটা ডেভিসের কাছে করেছিলেন। যদিও বিভিন্ন তথ্যে দুই লাখ নারীর কথা বলা হয়, কিন্তু ডেভিস মনে করতেন কমপক্ষে চার লাখ নারী এই ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের নারী পুনর্বাসন জাতীয় বোর্ডের (ন্যাশনাল বোর্ড অব বাংলাদেশ উইমেনস রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম) সভাপতিকে ড. ডেভিস ওই সংখ্যা বলেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেভিস পুরো বাংলাদেশ ঘুরে এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

২০২১ সালেও নিউইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেও চার লাখ নারীর কথা উল্লেখ করা হয়। ‘হোয়াই ইজ দ্য মাস সেক্সুয়ালাইজড ভায়োলেন্স অব বাংলাদেশ’জ লিবারেশন ওয়ার বিইং ইগনরড’ শিরোনামে নিবন্ধে বলা হয়, একাত্তরের যুদ্ধে নারী নিগ্রহের মূল কারণ ছিল বাঙালি সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং তাদের ক্ষমতাহীন করে তোলার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা। প্রতিবেদনে বলা হয়, “একাত্তরে হাজার হাজার বাঙালি নারীকে ধরে জোর করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের রাতের পর রাত ধর্ষণ করা হয়। একেবারে শিশুকন্যা থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাও এই নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পায়নি। প্রতিদিন ২ থেকে ৮০ জন পুরুষ একজন নারীকে ধর্ষণ করেছে।”

সুজান ব্রাউনমিলার ‘এগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন-উইমেন অ্যান্ড রেপ’ গ্রন্থে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী নিপীড়নের দিকটি আরও বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, “১৯৭১ সালের ৯ মাসে বাংলাদেশে ৪ লাখের মতো নারী পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত থাকায় পাকবাহিনীর পক্ষে তাদের অধিকৃত অঞ্চলে যখন-তখন যে কোনো ঘরবাড়িতে ঢুকে নিপীড়ন করা সহজ ছিল। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ৮ বছরের শিশু থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাকে পর্যন্ত বর্বরতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।”

১৯৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত ডেভিস বাংলাদেশে ছিলেন। ততদিনে ক্যাম্পগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। সেসব ক্যাম্পে পাওয়া হাজার হাজার মেয়েকে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েও কথা বলেছেন ড. ডেভিস–“অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, স্ত্রীকে স্বামীর হাতে তুলে দেওয়ার পর লোকটা মেয়েটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল! কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা জানতেও চাইত না, কী ঘটেছে তাদের স্ত্রীদের জীবনে। যমুনা নদীতে তখন অনেক লাশ ভেসে যেতে দেখা যেত; অনেক লাশ পড়ে ছিল দেশের আনাচেকানাচে। ফলে কোনো কোনো মেয়েকে সেসব বিভীষিকার দিনের কথা মনে করিয়ে দিলে তারা বলতো, ‘মনে নেই।’

“বাংলাদেশে মেয়েদের মর্যাদা এমনিতেই কম। পুরুষেরা তো একেবারেই মুখ খুলতে চাইত না। তাদের চোখে ওই সব নারী ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে, ফলে তাদের মরে যাওয়াই ভালো। এবং অনেককে হত্যাও করা হয়েছিল। আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কারণ পশ্চিমা সমাজে বিষয়টি এতই অচেনা, এতই অজানা!”

কোনো কোনো নারী সন্তান রেখে দিয়েছিলেন। সেসব সন্তানের ভাগ্যে কি ঘটেছিল ডেভিস জানেন না। তবে জন্ম নেওয়া শত শত শিশুকে তারা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় দান করে দিয়েছেন। সেখান থেকে সেসব শিশু নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরলেন, নারীদের এই দুর্দশা দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। নারীদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে তিনি ঘোষণা করলেন, “ধর্ষিত নারীদের পিতার জায়গায় আমার নাম লিখে দাও, ঠিকানা দিয়ে দাও ধানমন্ডি ৩২!”

কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বয়াণ তৈরি হতে দেখি। কেউ কেউ বলে যে, ১৯৭১ সালে কিছুই হয়নি, কাউকে কাউকে গোলাম আজমের বাংলাদেশ বলতে শুনি। এসব শুনলে, রাজাকারদের আস্ফালন দেখলে ঘৃণা হয়, বুকের ভেতরে দহন হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত রক্ত আর ইজ্জত দিয়ে কেনা দেশটা কি তবে জলের দামে বিক্রি হয়ে গেল। (সূত্র: বিডি নিউজ টুয়েন্টি ফোর. কম)।

https://bangla.bdnews24.com/opinion/57260a186c1d

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

দুই লাখ নয়, চার লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা

আপডেট সময় : ০৩:০৬:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৭ মার্চ ২০২৬

দুই লাখ নয়, চার লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা

রাজু নূরুলঃ

একাত্তরে ধর্ষণের কোনো ঘটনাই ঘটেনি–এমন বিকৃত বয়ান আর রাজাকারদের আস্ফালন বুকের ভেতর দহন জাগায়। এত রক্ত আর সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত দেশটা কি তবে জলের দামে বিক্রি হয়ে গেল?

 

 

 

 

 

 

 

কুমিল্লা কারাগারে বন্দি পাকিস্তানি এক কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ান ডাক্তার জিওফ্রে ডেভিস। সেই কর্মকর্তা ডেভিসকে বলেছিল, “সব পাকিস্তানি সৈন্যরা মনে করে ধর্ষণ জায়েজ।”

তারা টিক্কা খানের কাছ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশ পেয়েছিল যে, “যত পারো ধর্ষণ করো। যেহেতু একজন ভালো মুসলমান কখনো তার বাবার বিরুদ্ধে লড়বে না, ফলে যত বেশি সম্ভব বাংলাদেশি নারীদেরকে গর্ভবতী করো। এ থেকে একটা গোটা প্রজন্ম জন্মাবে, যাদের শরীরে বইবে পশ্চিম পাকিস্তানিদের রক্ত।” এই ছিল ধর্ষণের পেছনে পাকিস্তানি সৈন্যদের মনস্তত্ত্ব! তার গলায় ছিল অবহেলার সুর, ‘যুদ্ধে তো অনেক কিছুই হয়! আমরা কী এমন করেছি!’

মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর দেখা গেল, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী অথবা তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের হাতে ধর্ষণের শিকার হয়ে হাজার হাজার নারী গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন।

পরিবার ছেড়ে দিয়েছে তাদের। হয়ে পড়েছেন স্বামী পরিত্যক্তা। ভুলে গেলে চলবে না যে, গল্পটা ৫৪ বছর আগের! শিক্ষাদীক্ষা বলে তখন তেমন কিছু ছিল না। কোনো কোনো নারী গর্ভের সন্তান রাখতে চান, আবার অধিকাংশই ফেলে দিতে চান! আবার কারও গর্ভের সন্তানের বয়স হয়ে হয়ে গেছে ৭ থেকে ৮ মাস। ফলে শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণাটা গভীর। সে সময় হাসপাতালে গর্ভপাত অবৈধ ছিল বিধায় কেউ ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না।

ওরকম সময়ে ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান্ড ফাদারহুড, ইউএনএফপিএ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এগিয়ে আসল। তারা বিখ্যাত অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক জিওফ্রে ডেভিসকে বাংলাদেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করল। ডেভিস গর্ভপাত বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ছিলেন। বিশেষ করে সাড়ে ৭ মাস বয়সী ভ্রূণের গর্ভপাত বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল তার।

শুরুর দিকে কেউ ডেভিসকে সাহায্য করলেন না। সবাই ভয় পাচ্ছিলেন। ফলে ধানমন্ডির একটা ক্লিনিকে কাজ শুরু করেন তিনি। এরপর এগিয়ে আসে বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার। তারা একটা চিঠি লিখে ডেভিসকে গোটা অথরিটি দিয়ে দেয়। কিছুদিন যেতেই শত শত মেয়ে আসতে শুরু করল তার কাছে, যাদের সবার গর্ভে ‘যুদ্ধশিশু’।

ডেভিস একা হাঁফিয়ে উঠলেন। এত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছে যে, তার একার পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল। তিনি একটা বুদ্ধি বের করলেন। ঢাকা ও ঢাকার বাইরের স্বাস্থ্য কর্মীদেরকে প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করলেন। একইসঙ্গে গর্ভপাতের কাজও চলতে থাকল।

এক শহরে কাজ শেষ হলে আরেক শহরে চলে যান তারা। ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ১০০জন মেয়ের গর্ভপাত করেছে তার টিম। ঢাকার বাইরেও এ সংখ্যা কাছাকাছি। প্রক্রিয়া তেমন কঠিন ছিল না, ধর্ষণের শিকার নারীরা এসে একটা কাগজে সই করে দিতেন।

১৩ বছরের এই কিশোরীকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পেট চালাতে পারবে এমন আশায় তাকে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায় রেখে গিয়েছিলেন তার বাবা।

 

 

 

 

 

 

 

 

১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় প্রকাশিত এই ছবিটি তুলেছেন ডিক ডরেন্স

১৩ বছরের এই কিশোরীকে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর পেট চালাতে পারবে এমন আশায় তাকে কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিদেশী সাহায্য সংস্থায় রেখে গিয়েছিলেন তার বাবা। ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় প্রকাশিত এই ছবিটি তুলেছেন ডিক ডরেন্স

তবে ডেভিসের কাছে সাধারণত হতদরিদ্ররা আসছিলেন। যাদের টাকাপয়সা ছিল, তারা লোকলজ্জার ভয়ে গোপনে কলকাতা চলে যাচ্ছিলেন। ডেভিস বলছেন, “দেখলাম সব ধর্মের মেয়েরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে। তবে একটা বিষয় আমাকে বিস্মিত করেছে। কোনো মেয়েকে আমি কাঁদতে বা ভেঙে পড়তে দেখিনি। তারা শান্ত হয়ে গোটা প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতেন।”

৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের দ্বারা নারীরা কিভাবে নিপীড়নের শিকার হতেন, সে গল্পও বীণা কস্তার কাছে ২০০৬ সালে জিওফ্রে ডেভিস বলে গেছেন। বীণা তার পিএইচডির কাজে খুঁজতে খুঁজতে এই ডাক্তারের সন্ধান পান।

তিনি বলেছিলেন, “পাকিস্তানিরা প্রথমে বোমা মেরে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি করত। এরপর সেখানে সব মানুষকে জড়ো করা হতো। নিতান্ত শিশু বাদে বাকিদেরকে আলাদা করে ফেলা হতো। আওয়ামী লীগ বা পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গুলি করে মারা হতো। তারপর মেয়েদেরকে একটা জায়গায় রেখে তাদেরকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করত তারা।”

কথায় আছে ডাক্তার ও উকিলের কাছে কিছু লুকাতে নেই। ডাক্তার হওয়ার সুযোগে নিপীড়নের শিকার হওয়া অসংখ্য নারীর কেইস স্টাডি ছিল তার কাছে। “ধনী ও সুশ্রী মেয়েদেরকে কর্মকর্তাদের জন্য রাখা হতো। বাকিদেরকে তুলে দেওয়া হতো নিম্নপদস্থ সিপাহীদের হাতে। এসব মেয়েরা সময়মত খাবার পেত না, অসুস্থ হলে জুটত না চিকিৎসা। অজস্র নারী ক্যাম্পেই মারা গেছে। কোনো কোনো মেয়েকে একদিনে ৮০ বারের বেশিও ধর্ষণ করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “বাংলাদেশে যা ঘটেছে পৃথিবীর আর কোথাও আমি এরকম ঘটনার কথা শুনিনি। এমন বিভীষিকার মধ্য দিয়ে মেয়েদেরকে যেতে হয়েছিল যে অনেকে নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। তারা দুঃস্বপ্ন ও বিকারের মধ্যে থাকত। আমরা বিদেশি বলে আমাদেরও তারা বিশ্বাস করত না।” বিস্ময় নিয়ে ডেভিস বলেছেন, “মানুষ এরকম করতে পারে?”

নির্যাতিতা, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ, ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। আলোকচিত্র: নাইব উদ্দিন আহমেদ

 

 

“ঠিক কত নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছিল” বীণা কস্তা এই প্রশ্নটা ডেভিসের কাছে করেছিলেন। যদিও বিভিন্ন তথ্যে দুই লাখ নারীর কথা বলা হয়, কিন্তু ডেভিস মনে করতেন কমপক্ষে চার লাখ নারী এই ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের নারী পুনর্বাসন জাতীয় বোর্ডের (ন্যাশনাল বোর্ড অব বাংলাদেশ উইমেনস রিহ্যাবিলিটেশন প্রোগ্রাম) সভাপতিকে ড. ডেভিস ওই সংখ্যা বলেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেভিস পুরো বাংলাদেশ ঘুরে এ তথ্য সংগ্রহ করেছেন।

২০২১ সালেও নিউইয়র্ক টাইমস এ নিয়ে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানেও চার লাখ নারীর কথা উল্লেখ করা হয়। ‘হোয়াই ইজ দ্য মাস সেক্সুয়ালাইজড ভায়োলেন্স অব বাংলাদেশ’জ লিবারেশন ওয়ার বিইং ইগনরড’ শিরোনামে নিবন্ধে বলা হয়, একাত্তরের যুদ্ধে নারী নিগ্রহের মূল কারণ ছিল বাঙালি সমাজের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া এবং তাদের ক্ষমতাহীন করে তোলার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা। প্রতিবেদনে বলা হয়, “একাত্তরে হাজার হাজার বাঙালি নারীকে ধরে জোর করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাদের রাতের পর রাত ধর্ষণ করা হয়। একেবারে শিশুকন্যা থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাও এই নিগ্রহের হাত থেকে রেহাই পায়নি। প্রতিদিন ২ থেকে ৮০ জন পুরুষ একজন নারীকে ধর্ষণ করেছে।”

সুজান ব্রাউনমিলার ‘এগেইনস্ট আওয়ার উইল: মেন-উইমেন অ্যান্ড রেপ’ গ্রন্থে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারী নিপীড়নের দিকটি আরও বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। তিনি লিখেছেন, “১৯৭১ সালের ৯ মাসে বাংলাদেশে ৪ লাখের মতো নারী পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছেন। অস্ত্রেশস্ত্রে সজ্জিত থাকায় পাকবাহিনীর পক্ষে তাদের অধিকৃত অঞ্চলে যখন-তখন যে কোনো ঘরবাড়িতে ঢুকে নিপীড়ন করা সহজ ছিল। বাংলাদেশে ধর্ষণের ঘটনাগুলো এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে, ৮ বছরের শিশু থেকে ৭৫ বছরের বৃদ্ধাকে পর্যন্ত বর্বরতার ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে।”

১৯৭২ সালের মার্চ পর্যন্ত ডেভিস বাংলাদেশে ছিলেন। ততদিনে ক্যাম্পগুলো তুলে দেওয়া হয়েছে। সেসব ক্যাম্পে পাওয়া হাজার হাজার মেয়েকে তাদের নিজ নিজ বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েও কথা বলেছেন ড. ডেভিস–“অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে, স্ত্রীকে স্বামীর হাতে তুলে দেওয়ার পর লোকটা মেয়েটাকে পিটিয়ে মেরে ফেলল! কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা জানতেও চাইত না, কী ঘটেছে তাদের স্ত্রীদের জীবনে। যমুনা নদীতে তখন অনেক লাশ ভেসে যেতে দেখা যেত; অনেক লাশ পড়ে ছিল দেশের আনাচেকানাচে। ফলে কোনো কোনো মেয়েকে সেসব বিভীষিকার দিনের কথা মনে করিয়ে দিলে তারা বলতো, ‘মনে নেই।’

“বাংলাদেশে মেয়েদের মর্যাদা এমনিতেই কম। পুরুষেরা তো একেবারেই মুখ খুলতে চাইত না। তাদের চোখে ওই সব নারী ‘নষ্ট’ হয়ে গেছে, ফলে তাদের মরে যাওয়াই ভালো। এবং অনেককে হত্যাও করা হয়েছিল। আমি প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। কারণ পশ্চিমা সমাজে বিষয়টি এতই অচেনা, এতই অজানা!”

কোনো কোনো নারী সন্তান রেখে দিয়েছিলেন। সেসব সন্তানের ভাগ্যে কি ঘটেছিল ডেভিস জানেন না। তবে জন্ম নেওয়া শত শত শিশুকে তারা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থায় দান করে দিয়েছেন। সেখান থেকে সেসব শিশু নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে।

এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরলেন, নারীদের এই দুর্দশা দেখে হতবিহ্বল হয়ে গেলেন। নারীদের সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে তিনি ঘোষণা করলেন, “ধর্ষিত নারীদের পিতার জায়গায় আমার নাম লিখে দাও, ঠিকানা দিয়ে দাও ধানমন্ডি ৩২!”

কিন্তু এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বয়াণ তৈরি হতে দেখি। কেউ কেউ বলে যে, ১৯৭১ সালে কিছুই হয়নি, কাউকে কাউকে গোলাম আজমের বাংলাদেশ বলতে শুনি। এসব শুনলে, রাজাকারদের আস্ফালন দেখলে ঘৃণা হয়, বুকের ভেতরে দহন হয়। মাঝেমধ্যে মনে হয়, এত রক্ত আর ইজ্জত দিয়ে কেনা দেশটা কি তবে জলের দামে বিক্রি হয়ে গেল। (সূত্র: বিডি নিউজ টুয়েন্টি ফোর. কম)।

https://bangla.bdnews24.com/opinion/57260a186c1d

দৈনিক আস্থা/এমএইচ