সাভারে নকল সদন ও সার্টিফিকেট এবং ভোটার কার্ড বানানোর কারনে গ্রেফতার ১
- আপডেট সময় : ০৪:৫৪:১৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ মার্চ ২০২১
- / ১০৯৪ বার পড়া হয়েছে
মোঃ আহসান হাবীব, সাভার প্রতিনিধি ঢাকাঃ
২১ মার্চ জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে প্রয়োজন জ্ঞান ও শিক্ষার। আর পেশাগত জীবনের প্রতিটি ধাপে পার হতে দরকার সনদ সার্টিফিকেটের। এসব অর্জন করতে হয় লেখাপড়ার মাধ্যমে। অধ্যবসায় আর শ্রমের মাধ্যমে এসব অর্জন করা সবার দ্বারা হয় না।
কিন্তু জীবিকা নির্বাহ করার জন্য চাকরিও দরকার। তাই চাকরি নিতে অনেকেইর অনৈতিকভাবে ঝুঁকে পড়েন নকল সনদ বানানোর জন্য। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাভারের আশুলিয়ায় বিভিন্ন ছবি তোলার স্টুডিও তৈরি করছে নকল সনদ।সাভার ও আশুলিয়া উৎপাদনমুখী শিল্পাঞ্চল এলাকা।
তাই এখানে অসংখ্য শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। অনেকেই এ অঞ্চলকে উপযুক্ত কর্মসংস্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। তবে যোগ্যতার সনদ না থাকায় অনেকেরই হাতছাড়া হয় চাকরি। বর্তমানে পোশাক কারখানায় চাকরি নিতে হলেও প্রয়োজন হয় সনদের।
আর চাকরিপ্রার্থীদের এই চাহিদার জোগান দিতে গিয়ে ছবি তোলার পাশাপাশি নকল সনদ সরবরাহ করছেন স্টুডিও, কম্পোজ ও ফটোকপির দোকানদারেরা।সাভারের অন্ধ মার্কেট, আশুলিয়ার জামগড়া, বাইপাইল, জিরানী বাজার ও পল্লী বিদ্যুৎ এলাকার বিভিন্ন স্টুডিওতে তৈরি হচ্ছে নকল সনদ।
তাই স্টুডিওতে ছবির ব্যবসার পাশাপাশি এ ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে স্টুডিও-মালিকরা চাহিদা অনুযায়ী তৈরি করছেন এসব নকল সনদ। শুধু শিক্ষাগত সনদই নয়, জন্মসনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, নাগরিকত্ব সনদসহ নকল সনদ।আশুলিয়ার একটি কারখানায় চাকরি নেবেন জোবায়ের নামের এক চাকরিহারা পোশাকশ্রমিক।
কাজের দক্ষতা থাকলেও সনদের অভাবে হচ্ছে না তার চাকরি। প্রতিষ্ঠান চায় এইচএসসি পাসের সনদ। তাই খোঁজ করছেন নকল সনদ তৈরির আস্তানা। পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে খোঁজ পেলেন সনদ বানানোর কারিগরের। ৫৫০ টাকায় মিলে গেল তার সনদ।
জোবায়েরের বলেন, আগে আমি কয়েকটি কারখানায় কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে কাজ করেছি। সর্বশেষ চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর সার্টিফিকেটের অভাবে আর চাকরি হচ্ছে না। পরে আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারি নকল সার্টিফিকেট ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা বিনিময় পাওয়া যায়। ঠিকানা নিয়ে দোকানে গেলে প্রথমে আমাকে ফিরিয়ে দেয়। পরে ওই বন্ধুর মাধ্যমে ৫৫০ টাকার বিনিময়ে নকল সনদ বানিয়ে নেই।
তবে এখনো চাকরি হয়নি। পরে নাসরিন নামের আরেক জনের কাছে জানা যায়, তার প্রয়োজন একটি নকল সনদ ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের। তিনিও নকল সনদ বানিয়ে নেন। তিনি আর ও বলেন, এত সহজে সার্টিফিকেট ও পরিচয়পত্র পাব, তা কখনো চিন্তা করি নাই।
এখন আমি এসব দিয়ে চাকরি করছি। সনদ ও জাতীয় পরিচয়পত্র বানাতে তার খরচ হয়েছিল ১ হাজার ৩০০ টাকা। তবে তাকে বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করে দোকানদার।এসব নকল সনদ বানানোকারী প্রতিষ্ঠানের নাম হলো ‘সাইম ডিজিটাল স্টুডিও’। নবীনগর চন্দ্রা মহাসড়কের সাভারের ডিইপিজেডের বিপরীতে হাশেম প্লাজা নামক মার্কেটের নিচতলায় এ ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী ইমরান বলেন, ১৫ হাজার টাকায় তিনি ওই স্টুডিও ও ফটোকপির দোকানে চাকরি করেন। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার বিনিময়ে প্রায় পাঁচ থেকে ছয়টি সনদ সফটওয়্যারের মাধ্যমে তৈরি করেন। তিনি সুযোগ ও ব্যক্তি বুঝে হাজার টাকাও গোনেন।ভাদাইলের রফিকুল ডিজিটাল স্টুডিওর মালিক আল আমিন বলেন, আমরা গরিব ও অশিক্ষিত মানুষের উপকার করে থাকি।
তারা চাকরি ছাড়া অসহায় জীবন যাপন করে। আমরা শুধু গরিব মানুষকে এ ধরনের সার্টিফিকেট বানিয়ে দেই। এটা যে অনেক বড় অপরাধ, এখন বুঝতে পেরেছি। আর কোনো দিন বানাবো না।আরও কয়েকটি এ রকম স্টুডিও, ফটোকপি ও কম্পোজের দোকান আছে জানা যায়, পোশাক কারখানা, নিরাপত্তাপ্রহরী এবং বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য আসা ব্যক্তিরা তাদের প্রধান টার্গেট।
তারা অষ্টম শ্রেণি থেকে উচ্চতর ডিগ্রির নকল সনদ তৈরি করে।তবে কোনো ধরনের রেফারেন্স কিংবা পরিচিত কারও সুপারিশ ছাড়া দেওয়া হয় না এসব নকল সনদ। প্রথম যে কেউ এমন নকল সনদ নিতে চাইলে যেন তারা কিছুই জানেন না। পরিচিত ব্যক্তি হলেই মিলে যায় নকল সনদ।এই সুযোগে নকল সনদ তৈরি করে কারখানায় চাকরি নিয়ে গা ঢাকা দেন নকল সনদ তৈরি করা হয় রফিকুল স্টুডিওতে।
শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য নয় এ রকম একটি অপরাধ কে কাজ হিসাবে বেছে নিয়েছে। এতে তারা আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধের সাথে ধাবিত হচ্ছে। তাদের এই উপলব্ধি থাকা উচিত। আর যারা এভাবে সনদ নিয়ে চাকরি করছে, তারাও আইনগত দণ্ডনীয় অপরাধের সাথে জড়িত।যারা এভাবে উপার্জন করছে, কী পরিমাণ উপার্জন হচ্ছে, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, যা উপার্জন হচ্ছে, সেটা সৎভাবে নাকি অন্যায়ভাবে হচ্ছে কি না, সেই দায়বদ্ধতা উপার্জনকারীর ওপরই।
ফলে গোটা জীবন এবং তার ওপর যারা নির্ভরশীল, তাদের সবাইকে এ রকম একটি পাপকাজের সাথে জড়িত থাকতে হবে,তা কতটা সঠিক তাদের ভাবতে হবে। আর চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো একটু সতর্ক হলেই এসব নকল সনদ সরবরাহ বন্ধ হবে বলে মনে হয়।সাভার রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজ পুলক বলেন, এ ধরনের নকল সনদ তৈরির অপরাধ যদি আমাদের আওতায় থাকে, তাহলে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, আমি উপজেলা প্রশাসনকে বলব। ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে যদি প্রমাণ পায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।তারই প্রমানসরুপ গত ১১ ডিসেম্বর সাভারের জাতীয় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সংস্থা মার্কেটের দ্বিতীয় তলার কম্পিউটার পয়েন্ট অ্যান্ড ভ্যারাইটিজ স্টোরে অভিযান চালিয়ে নকল সনদ তৈরির অভিযোগে পাঁচটি নকল সনদসহ রিয়াদ হোসেন মিঠু কে গ্রেফতার করে র্যাব-৪।অনেক দাগী অপরাধী। সুযোগ বুঝে তারা অপরাধ করে চলে।
কোনো সময় কর্মস্থলেই অপরাধ করেও পালিয়ে গেলে তাদের খুঁজে পাওয়াও যায় না। এতে অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটর ও অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, যারা এসব নকল সনদ দিয়ে চাকরির আবেদন করছেন, তারা সবাই একধরনের চাপে থাকেন। তারা চাপে পড়েই এ ধরনের কাজ করে থাক।
কিন্তু যারা এ ধরনের নকল সনদ তৈরি করে ব্যবসা করছে, তারা অর্থনীতির অভাবে আছেন তা না। উভয় পক্ষ অপরাধী।




















