গণভোটে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও জনগণের সার্বভৌম অধিকার: সংবিধান, সরকার এবং হ্যাঁ/না ভোটের প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১০:০১:২১ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১০২৯ বার পড়া হয়েছে
গণভোটে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ও জনগণের সার্বভৌম অধিকার: সংবিধান, সরকার এবং হ্যাঁ/না ভোটের প্রশ্ন
মুফতী রবিউল ইসলাম শামীমঃ
হ্যাঁ/না ভোট বা গণভোট কোনো দলীয় কর্মসূচি নয়; এটি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে সরাসরি একটি সাংবিধানিক সংলাপ। এই প্রক্রিয়ায় জনগণ কোনো প্রতিনিধির মাধ্যমে নয়, নিজের বিবেক ও মতামতের মাধ্যমে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণ করে। বাংলাদেশের সংবিধান যেহেতু জনগণকে সকল ক্ষমতার উৎস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তাই গণভোটে সরকারের ভূমিকা শুরু থেকেই সীমাবদ্ধ ও নিরপেক্ষ হওয়ার কথা।
সংবিধানের মৌলিক চেতনা অনুযায়ী সরকার রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গ, মালিক নয়। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। ফলে জনগণ যখন হ্যাঁ বা না বলার অধিকার প্রয়োগ করে, তখন সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার কোনো নৈতিক বা আইনি অধিকার সরকারের নেই। গণভোটের অর্থই হলো জনগণের অবাধ সম্মতি বা অসম্মতি; সেখানে রাষ্ট্র যদি আগেই একটি নির্দিষ্ট অবস্থান নেয়, তবে গণভোট তার প্রকৃত অর্থ হারায়।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করেছে, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষিত।
গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত হলো নিরপেক্ষ প্রশাসন ও সমান সুযোগ। সরকার যখন হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালায়, তখন রাষ্ট্র নিজেই একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এতে করে না ভোট দেওয়ার অধিকার কাগজে থাকলেও বাস্তবে তা দুর্বল হয়ে পড়ে। সংবিধানের সমতার নীতি অনুসারে রাষ্ট্র কোনো নাগরিককে পরোক্ষ চাপের মুখে ফেলতে পারে না।
প্রশাসনের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে সংবেদনশীল। সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন, ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশকারী সাধারণ নাগরিক হিসেবে নয়। সংবিধানের প্রশাসনিক কাঠামো অনুযায়ী তারা জনগণের সেবক এবং নিরপেক্ষতা রক্ষায় বাধ্য। সরকারি পদবি, অফিসিয়াল ক্ষমতা বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহার করে হ্যাঁ ভোটের প্রচারণা চালানো মানে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভাঙা এবং সংবিধানবিরোধী কার্যক্রমে লিপ্ত হওয়া। সংবিধান অনুযায়ী সংবিধানপরিপন্থী যে কোনো রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম বাতিলযোগ্য ও বিচারিকভাবে চ্যালেঞ্জযোগ্য।
এখানে সরকার ও রাজনৈতিক দলের পার্থক্য পরিষ্কারভাবে বোঝা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে সমর্থন চাইতে পারে, যুক্তি তুলে ধরতে পারে, হ্যাঁ বা না-যেকোনো পক্ষে অবস্থান নিতে পারে। কিন্তু সরকার দল নয়, সরকার রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ভোটের পরিবেশ তৈরি করা, ভোটের নিয়ম ব্যাখ্যা করা এবং জনগণকে ভোটাধিকার প্রয়োগে উৎসাহিত করা। সরকার বলতে পারে আপনি ভোট দিন, কিন্তু বলতে পারে না আপনি কী ভোট দেবেন।
যখন সরকারি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালান, তখন তা শুধু ব্যক্তিগত মতামত হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা রাষ্ট্রীয় অবস্থান হিসেবে জনগণের কাছে প্রতিভাত হয়। এতে ভয়, দ্বিধা ও অনাস্থার পরিবেশ তৈরি হয়, যা অবাধ ও সুষ্ঠু গণভোটের পরিপন্থী। গণভোট তখন আর জনগণের স্বাধীন সিদ্ধান্ত থাকে না, বরং ক্ষমতার প্রভাবিত অনুমোদনে পরিণত হয়।
গণতন্ত্রে সরকার রেফারির ভূমিকা পালন করে, খেলোয়াড়ের নয়। রেফারি যদি নিজেই গোল করার চেষ্টা করে, তবে খেলার ন্যায্যতা নষ্ট হয়। ঠিক তেমনি সরকার যদি গণভোটে একটি পক্ষ হয়ে দাঁড়ায়, তবে জনগণের সার্বভৌম অধিকার ক্ষুণ্ন হয় এবং সংবিধানের আত্মা আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
অতএব সংবিধানের আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়, গণভোটে সরকার বা সরকারি কর্মকর্তাদের দ্বারা হ্যাঁ ভোটের পক্ষে বা না ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালানো অনুচিত, অগণতান্ত্রিক এবং আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সরকার নীরব থেকে জনগণের সিদ্ধান্তকে সম্মান করে। গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন জনগণের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের চেয়েও উচ্চ হয়ে ওঠে।
মুফতী রবিউল ইসলাম শামীম
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ (কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি)
রাষ্ট্রচিন্তক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।









