Home জাতীয় বাতাসে বাড়ছে ‘বিষ’,বিশেষজ্ঞদের জরুরি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ

বাতাসে বাড়ছে ‘বিষ’,বিশেষজ্ঞদের জরুরি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ

বাতাসে বাড়ছে ‘বিষ’,বিশেষজ্ঞদের জরুরি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ

শীত শুরু না হতেই বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে গেছে। রাজধানী ঢাকার বাতাসে দূষিত বস্তুকণার পরিমাণ এতই বেড়েছে যে, তা খুবই অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। অতিক্ষুদ্র এসব ধূলিকণার উপস্থিতির কারণে রাজধানীসহ দেশের প্রধান প্রধান শহরের বায়ু ইতোমধ্যে অস্বাস্থ্যকর থেকে অতিমাত্রার অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে পৌঁছেছে।এমন পরিস্থিতির মধ্যে চলতি সপ্তাহের পুরোটাই দেশের বায়ুর মান আরও খারাপ থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান। বিশেষজ্ঞরা তাই জরুরি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। বাতাসে এমন মানের কারণে প্রতিবছর এ সময় দেশে শ্বাসকষ্টজনিত বিভিন্ন রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। ধূলিকণা মিশ্রিত অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে শ্বাসনালি, ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি করছে। করোনাভাইরাসের চলমান পরিস্থিতিতে এই বাতাসে আরও ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমনিতেই করোনাভাইরাসের প্রধান লক্ষ্য ফুসফুস। এ সঙ্গে অতিরিক্ত বায়ুদূষণ যুক্ত হতে থাকায় অ্যাজমা, শ্বাসকষ্টসহ শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত রোগে ভোগা মানুষ চরমমাত্রার ঝুঁকিতে পড়েছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) এরই মধ্যে সতর্ক করে দিয়েছে, যেসব শহরে বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি, তাদের করোনা অতিমারির বিরুদ্ধে তৎপরতা জোরদার করতে হবে।

গতকাল রোববার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আইকিউ এয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে, টানা ছয় দিন বাংলাদেশের বায়ুর মান আরও খারাপ হবে। ২০ নভেম্বর পর্যন্ত দেওয়া পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এ সময়ে দেশে বায়ুদূষণের গড় হার বেড়ে হতে পারে ১৫১ থেকে ২০০ পিএম ২.৫, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ ক্যাটাগরির দূষণ।

ঢাকা মহানগরীর দূষণের চিত্র তুলে ধরে প্রতিষ্ঠানটি বলছে, রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুর মান ১৩১ পিএম ২.৫, গুলশানের বে’স এডজওয়াটারে ১২০, ঢাকার ইউএস এমবাসিতে ১১৭, বিটোপিতে ১১১, ওহাব বারিধারায় ১১১ ও বিটোপি গ্রুপে ৫৫। একই সময়ে সারাদেশের দূষণের চিত্র তুলে ধরে আইকিউ এয়ার বলছে, ঢাকায় বায়ুর মান ১১৬ পিএম ২.৫, সাভারে ১১২, ত্রিশালে ১০২, মানিকগঞ্জে ৮৩, শ্রীপুরে ৮১, কুমিল্লায় ৭২ ও নারায়ণগঞ্জে ৪।

পরিবেশবিজ্ঞানীদের মতে, বাতাসের একিউআই মাত্রা শূন্য থেকে ৫০ পিপিএম হলে তাকে ‘সবুজ বা স্বাস্থ্যকর’ বায়ু বলা হয়। একিউআই মাত্রা ৫১ থেকে ১০০ পিপিএম হলে তাকে ‘মধ্যম’ বায়ু বলা হয়, যা মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। মাত্রা ১০১ থেকে ১৫০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে ‘সতর্কতামূলক’ বায়ু বলা হয়, যেটা মানুষের জন্য মৃদু ক্ষতিকর। একিউআই মাত্রা ১৫১ থেকে ২০০ পিপিএম হলে সে বায়ুকে ‘অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণিতে ফেলা হয়। ২০১ থেকে ৩০০ পিপিএম একিউআই মাত্রার বাতাসকে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণিতে এবং ৩০১ থেকে ৫০০ পিপিএম মাত্রার বাতাসকে ‘চরম পর্যায়ের অস্বাস্থ্যকর’ বায়ু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুর মান বিভাগের পরিচালক জিয়াউল হক বলেন, শীতকালে বা শুস্ক মৌসুমে আমাদের দেশে ধূলিকণা বাড়ে। এর প্রধান কারণ ইটভাটা, নানা ধরনের নির্মাণকাজ বেড়ে যাওয়া, আন্তঃদেশীয় দূষণ ইত্যাদি। এ ছাড়া গাড়ির কালো ধোঁয়া, কুয়াশার কারণে ধূলির স্তর নিচে নেমে আসাসহ নানা কারণে বায়ুদূষণ বাড়ে। ডিসেম্বর নাগাদ বায়ুদূষণ আরও বাড়তে থাকে; কিন্তু আমাদের দেশে সাধারণত বায়ুর মান ২০০-এর মধ্যেই থাকে।

তিনি বলেন, আমরা বায়ুদূষণের মাত্রা কমাতে নানা ধরনের কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর থেকে আমরা বায়ুদূষণের অন্যতম প্রধান উৎস অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করে দেওয়া শুরু করেছি। এ বছর ইটভাটার পাশাপাশি নির্মাণকাজের ধুলা ও যানবাহনের ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

‘স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার ২০১৯’ প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাপী মৃত্যুঝুঁকির কারণ হিসেবে বায়ুদূষণকে চতুর্থ স্থানে রাখা হয়েছে। গত বছর বায়ুদূষণের কারণে বিশ্বজুড়ে ৬৭ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। বিশ্বে এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে যত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তার ১৫ শতাংশের পেছনে ভূমিকা রেখেছে লম্বা সময় বায়ুদূষণের প্রভাব। জার্মানি ও সাইপ্রাসের বিশেষজ্ঞরা এক গবেষণায় এ তথ্য জানিয়েছেন।

বায়ুদূষণ কমানোর উপায় জানাতে গিয়ে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুম লীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্রের (ক্যাপস) পরিচালক কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বায়ুদূষণ কমাতে হলে বড় ধরনের পরিকল্পনা বা উদ্যোগ নিতে হবে। এখন আমাদের দেশের প্রতিটি স্থানে সারা বছর উন্নয়নকাজ হয়। শীতকালে আরও বেশি হয়। কিন্তু বায়ুদূষণ কমাতে হলে একেকটা এলাকা ধরে উন্নয়নকাজ করতে হবে। প্রতিবছর কেন ফুটপাত ভাঙতে হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।

পাকিস্তানের কূটনৈতিক ডেকে কঠোর প্রতিবাদ ভারতের

তিনি বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দূষণের বড় একটি কারণ। এটা নিয়ে অনেক কাজ হলেও আজ পর্যন্ত আমরা তা ঠিক করতে পারিনি। এখনও যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা হয়। এই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতে হবে। সিটি করপোরেশন ছাড়াও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে পানি ছিটানোর যানবাহন আছে। সেগুলোকে ধুলাদূষণ নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগানো উচিত। নির্মাণকাজ ও যানবাহনের ধুলা নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর হতে হবে।

পরিবেশ আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি আমির হাসান মাসুদ বলেন, ইটভাটা থেকে সৃষ্ট দূষণ বন্ধে মালিকদের জ্বালানিসাশ্রয়ী আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে বাধ্য করা, শুস্ক মৌসুমে ধুলার দূষণ প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনকে সঠিকভাব রাস্তা পরিস্কার এবং যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি ধুলা ছড়িয়ে পড়া বন্ধে নিয়মিত রাস্তায় পানি ছিটানো, যত্রতত্র সিটি করপোরেশনের সংগৃহীত বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা, শিল্পকারখানর বায়ুদূষণ কমাতে ইটিপি ব্যবহারে বাধ্য করা, যানবাহন ও নৌযান থেকে দূষণ বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে বায়ুদূষণের মাত্রা কমতে পারে।