ইউনূস সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক কেন?
- আপডেট সময় : ০৪:১৭:১১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১০২২ বার পড়া হয়েছে
ইউনূস সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বিতর্ক কেন?
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
বিদায় নেওয়ার আগে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য চু্ক্তি করেছেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, নতুন সরকার এখনোই চুক্তি নিয়ে মন্তব্য করেনি।
“আপনার মেয়াদ শুরুর এই সময়ে আমি আশা করি, আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দারুণ গতি ধরে রাখতে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এই চুক্তিতে আমাদের উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা সুবিধা পাবেন”।
প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখা চিঠিতে এই কথা উল্লেখ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
সম্প্রতি বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপনে বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। “অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড” নামে এই চুক্তি বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের আগে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে স্বাক্ষর হওয়ায় পর এটা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে গোপনে এই চুক্তি স্বাক্ষর কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিলো নয় মাস ধরে। কিন্তু গোপনীয়তার শর্তের কারণে তখন এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। এখন চুক্তি প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তির পূনর্মূল্যায়ন হওয়া দরকার।
চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দিয়ে এটাও বলা হচ্ছে যে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, বরং প্রধান্য পেয়েছে আমেরিকার ইচ্ছা।
ফলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তি পরীক্ষা করে দেখা।
গতবছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের দোসরা এপ্রিল ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উপর বিভিন্ন হারে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র, যেটা বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছিলো।
বাংলাদেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ। সেসময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে সেই শুল্ক হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।
তবে শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত মতে পৌঁছাতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলতে থাকে। গত নয় মাস ধরে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি শেষে উভয় পক্ষ ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের উপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ।
চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের নেগোসিয়েশনে ‘দুর্বলতা’ দেখতে পেয়েছেন অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।
চু্ক্তিতে আর্থিক ক্ষতির বাইরেও আরো কিছু বিষয় আছে যেখানে চীন-রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
বাণিজ্য চুক্তি কার পক্ষে গেল?
যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশের বাণিজ্য ৮০০ কোটি ডলারের। তবে বাংলাদেশ সেখানে রপ্তানি বেশি করে, আমদানি কম করে।
ডলারের হিসেবে দেখলে বাংলাদেশ সেখানে বছরে রপ্তানি করে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য। বিপরীতে আমদানি করে ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ আমেরিকা ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশ থেকে বেশি কেনে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র বলছে বাংলাদেশকে কেনাকাটা বাড়াতে হবে। তারা শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করে।
আর এই সবকিছু নিয়ে একটা সমাধানে আসতেই দুই দেশের চুক্তি। এভাবে চাপ দিয়ে আমেরিকা ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে গিয়েছে বা যাচ্ছে।
কিন্তু সামগ্রিকভাবে চুক্তিতে বাংলাদেশের চেয়ে আমেরিকা বেশি লাভবান হয়েছে এমন মত দিচ্ছেন সেন্টার ফল পলিসি ডায়লগ -সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এই চুক্তি আমেরিকার পক্ষে গেছে।
“চুক্তিতে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তারা কী করবে, আমরা কী করবো -এই বিষয়গুলোতে যে চারগুণ বেশি আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে করার ক্লজগুলো আছে, সেখান থেকেও বোঝা যায় (আমেরিকার প্রাধান্য)। আর সাধারণভাবেও এটার যে সাবস্টান্স সেখান থেকেও বোঝা যায় যে, এটা তাদের পক্ষে গেছে।”
তাহলে এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করলো? এমন প্রশ্নে তৈরি পোশাক খাতের কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান।
তবে একইসঙ্গে তিনি বলেন, এই চুক্তির পেছনে সরকার মূলত রাজনীতির দিকে বেশি অর্জন করতে চেয়েছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে।
“আমি যদি বলি বাংলাদেশ এখানে যেটা অর্জন করতে চেয়েছে, সেটা হলো, আমেরিকান পলিটিক্যাল ফেইভার (রাজনৈতিক অনুগ্রহ)। ইকোনমিক ফেইভার চেয়ে পলিটিক্যাল ফেইভার। আমরা পলিটিক্যালি তোমাদের (আমেরিকা) সঙ্গে অ্যালাইনড। সুতরাং আমাদেরকে রক্ষা করো. আর গার্মেন্টসকে রক্ষা করো। এটাই ছিল বাংলাদেশের মেইন বেনেফিট।”
“অন্যদিকে আমেরিকা পলিটিক্যাল বেনেফিটের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ইকোনমিক বেনেফিটও নিশ্চিত করে নিয়েছে,” বলেন অদ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান।
চুক্তির কোন বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন?
চুক্তির শেষ দিকে সেকশন ছয় এ কমার্শিয়াল কনসিডারেশন নামে মূলত কিছু কেনাকাটার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে আমেরিকা থেকে কম আমদানি করছে সেটা পুষিয়ে নিতে বাংলাদেশ কী কী কেনাকাটা ভবিষ্যতে বাড়াবে সেটা উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে বলা হয়েছে:- বাংলাদেশ আমেরিকা থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে ১৪টি, ১৫ বছরে জ্বালানি কিনবে ১৫শো কোটি ডলারের, বছরে কৃষিপণ্য আমদানি করবে সাড়ে তিনশো কোটি ডলারের। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এতোসব কেনাকাটা শুধু ক্রয় বাড়ানোর জন্যই করা হচ্ছে, নাকি এগুলোর চাহিদা আছে?
আবার চাহিদা যাচাই না করেই এসব কেনা হলে সেটার অর্থনৈতিক ক্ষতিটা হবে বাংলাদেশেরই।
“এই যে এয়ারক্রাফটগুলো, এগুলোর কি বাংলাদেশের দরকার আছে? আমরা যেগুলো কিনছি সেগুলো কী ধরনের এয়ারক্রাফট আমরা জানি না। শুধু বলা হচ্ছে, ১৪টা কিনবো। এগুলো নিয়ে এসে আমরা কি আমাদের এয়ারলাইন্সটাকে লসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এগুলোও কিন্তু ভাবতে হবে,” বলেন আবু হেনা রেজা হাসান।
অন্যদিকে এভাবে সংখ্যা বা অংক ধরে কেনার কথা বলায় ঝুঁকি দেখতে পান সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তিাফিজুর রহমান।
“এগুলো একবারে কংক্রিট নাম্বার দিয়ে বলা হয়েছে। আবার পরে কোনো সময় যদি প্রয়োজন দেখা দেয় তখন এসব ক্রয় পেছানো দুস্কর হয়ে যাবে। তখন পেছাতে গেলেই বলবে যে তাহলে আবার পাল্টা শুল্ক যেটা প্রথমে দেওয়া হয়েছিলো ৩৭ শতাংশ, সেখানে নিয়ে যাবো।”
এছাড়া নেগোসিয়েশনে আরেকটি দুর্বলতা তারা উল্লেখ করেছেন যে, বিমান কিংবা গমের মতো আমদানিগুলো সরকারিভাবে করা হলেও অন্যান্য কৃষিপণ্য, তুলা, তেল এসব আমদানি হবে বেসরকারিভাবে। অর্থাৎ এগুলো আমদানি করবে বেসরকারি কোম্পানিগুলো।
কিন্তু বাংলাদেশের বেসরকারি কোম্পানিগুলো যেখানে ভারত, পাকিস্তান কিংবা চীন থেকে অল্প সময়ে কম খরচে আমদানি করতে পারে সেখানে আমেরিকা থেকে আনতে গেলে খরচ এবং সময় বাড়বে।
“কোম্পানিগুলো তো সরকারের আমদানি ঘাটতি মেটাতে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করে ভারত বা পাকিস্তানের পরিবর্তে আমেরিকা থেকে আনতে যাবে না। অথবা সেটা করতে গেলে সরকারের কাছে বাড়তি কোনো সুবিধা বা ভর্তুকি চাইতে পারে। সরকার কি চুক্তির সময় এই কস্টিং করেছে?” বলেন মোস্তাফিজুর রহমান।
ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপোড়েন হতে পারে। এছাড়াও অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড নামের এই চুক্তিতে উভয় দেশই বহু পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ছয় হাজার ৭১০টি পণ্য আর বাংলাদেশের এক হাজার ৬৩৮টি পণ্য থাকছে।
কোনো কোনো পণ্য শুরু থেকেই আবার অনেক পণ্য ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এতে করে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমবে।
এছাড়া এই সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বাইরেও আরো কিছু বিষয় আছে যেখানে চীন-রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কেও প্রভাব পড়তে পারে।
যেমন চুক্তির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে। বিপরীতে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করার চেষ্টা করবে। যদিও কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা কমাতে হবে সেটা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বাংলাদেশ এখন বেশি কেন মূলত চীন থেকে।
এছাড়া চুক্তির চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড অথবা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না।
তবে একটি ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি বিকল্প কোনো সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি না থাকে অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান চুল্লির জন্য উপকরণ কেনার চুক্তি হয়ে থাকে, তবে তা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।
অর্থাৎ রাশিয়ার প্রযুক্তি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যতের কোনো পারমাণবিক প্রকল্পের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে।
সেক্ষেত্রে এই ধারাগুলোর ফলে চীন-রাশিয়া যাদের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক কেনাকাটা কিংবা জ্বালানি আমদানির সম্পর্ক আছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক চাপে পড়তে পারে। কারণ এই চুক্তি বাংলাদেশেকে ধাপে ধাপে চীন, রাশিয়া থেকে আমেরিকামুখী করবে। যেখানে চীন, রাশিয়া তাদের বাংলাদেশের বাজার হারানোর শঙ্কায় থাকবে।
এরফলে শুধু এসব দেশের সঙ্গে সর্ম্পক চাপে পড়তে পারে তা নয়, বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও দুর্বল হবে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ডিফেন্সে আর কতটুকুই বা কিনবে। কিন্তু আমাদের ডিফেন্স যখন ওদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টেগ্রেড হয়ে গেলো তখন আমাদের ডিফেন্স স্ট্রাটেজি তো ওদের স্ট্রাটেজির বাইরে যেতে পারবে না।”
অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে এমন বিষয় আরো আছে। যেমন সেকশন চারে বলা হয়েছে, যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে বাংলাদেশকেও সেটা অনুসরণ করতে হবে।
এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে এমন কোনো পণ্য বিক্রি বা রপ্তানি করতে পারবে না যার কারণে আমেরিকার পণ্যের বিক্রি কমে যায়।
অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে পণ্য যেটা বলা হচ্ছে এটা নিয়ে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যা হতে পারে। কারণ বাংলাদেশের ব্যবসায়ী বা ভোক্তার চীন থেকে কম দামে পণ্য কেনেন। এটাই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, মূলত সরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিলে সেই প্রতিষ্ঠান অনেক সময় কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করার সক্ষমতা অর্জন করে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয়।
“আমেরিকা তাদের এই বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামের বিষয়টা দিয়ে সে জায়গাতেই বেশি ধরবে যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য স্বার্থ হুমকিতে পড়েব। এখন ধরেন আমেরিকার যে বাণিজ্য স্বার্থ বাংলাদেশে আছে এবং সেখানে চীন থেকেও হয়তো একই জিনিসটা আমদানি হচ্ছে। কিন্তু চীন কম দামে সেটা দিচ্ছে। এসব জায়গায় আমেরিকা সরাসরি ধরবে যে, এটা আমার বাণিজ্য স্বার্থের সরাসরি পরিপন্থি।”
“কিন্তু চীন বলবে যে, আমি তো এই কোম্পানিকে সরাসরি কোনো ভর্তুকি দেই না। তো এরকম নানাবিধ ঝুঁকি এসব ধারাকে কেন্দ্র করে আছে। যেখানে অর্থনীতি, ভূরাজনীতি সবই আছে। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আমাদের ব্যবসায়ীরা যেখান থেকে কম দামে পাবেন, লাভ বেশি, সেখান থেকেই তো পণ্য আনবেন,” বলেন মি. রহমান।
এমন চুক্তি কেন করা হলো?
চুক্তিতে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ই-কর্মাসসহ আরো বিষয় আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্রাপক আবু হেনা রেজা হাসান বলছেন, মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, মেধাসত্ত্ব আইন ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছে আমেরিকার।
“এখানে আমেরিকার চালাকিটা হচ্ছে যে, পাল্টা শুল্কের কথা বলে তারা যেটা করেছে সেটা হলো, তাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ প্রসিডিউর এবং লিগ্যাল সিস্টেমটাকে আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে। টেকনিক্যাল স্টান্ডার্ড, মেধাস্বত্ত্ব এগুলো দিয়ে ওরা আমাদের উপরে উঠে যাবে।”
“আমরা ওদেরকে কোনো নন-ট্যারিফ বাধা বা কারিগরি মানের কথা বলে ওদের পণ্যে কোনো বাধা দিতে পারবো না। কিন্তু ওরা কিন্তু পারবে। ওরা বলবে দেখো, তোমার পণ্যের কারিগরি মান আমাদের মতো না। সুতরাং এই পণ্য নিতে পারবো না। কিন্তু আমরা এরকম কিছু বলতে পারবো না। কারণ তাদের কারিগরি মান তো বিশ্বব্যাপী গৃহীত। আমাদেরটা না। আমরা এখানে পিছিয়ে আছি,” বলেন আবু হেনা রেজা হাসান।
কিন্তু তাহলে এমন চুক্তি কেন করা হলো? এক্ষেত্রে সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে তার শেষ ভাষণে অবশ্য নানাবিধ সুবিধার কথা বলেছেন। দাবি করেছেন, এই চুক্তি বাণিজ্য তো বটেই, তার ভাষায় এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে বাংলাদেশের।
“এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমে এসেছে। এই চুক্তির একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা। এটা একটা মস্তবড় সুবিধা। এরমাধমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্ক সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশি পোশাক আরো কম দামে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবে,” ভাষণে বলেন অধ্যাপক ইউনূস।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে তার শেষ ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তির নানাবিধ সুবিধার কথা বলেছেন, তবে এই চুক্তিতে যা দেখা যাচ্ছে তার ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা ভিন্ন কথা বলছেন।
অর্থাৎ পাল্টা শুল্ক কমেছে, তৈরি পোশাকের বাজার ঠিক থাকছে। কিন্তু এরজন্য যেসব ছাড় দিতে হয়েছে প্রশ্ন সেসব নিয়ে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনতে গেলে সেটার যদি আবার খরচ বেশি পড়ে তাহলে তৈরি পোশাকে শূন্য শুল্ক পেলেও লাভ কমে যাবে বলে মূল্যায়ন আসছে।
তবে সবচেয়ে বেশি বলা হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জড়িত এমন একটি স্পর্শকাতর চুক্তি কেন শেষ সময়ে সই করা হলো? নির্বাচিত নতুন সরকারের জন্য কেন রাখা হলো না?
তবে চুক্তি তো হয়েই গেছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিএনপির নবগঠিত সরকার এই চুক্তি নিয়ে কী করবে?
বিষয়টি নিয়ে নতুন সরকারের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেননি।
তবে চুক্তি প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের এমন একজন উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বিএনপির নতুন সরকারেও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। সবমিলিয়ে চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ থাকলেও বাংলাদেশের জন্য সেটা করা কঠিন হবে বলে মত পাওয়া যাচ্ছে।
নতুন ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখনই সেই ঝুঁকি নেবে কি না সেটাও প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র-বিবিসি বাংলা।


















