উড়ন্ত আশিক কি ইউনূসের মার্কেটিং ম্যানেজার?
- আপডেট সময় : ০৪:৫৭:২১ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
- / ১০৩৯ বার পড়া হয়েছে
উড়ন্ত আশিক কি ইউনূসের মার্কেটিং ম্যানেজার?
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
২০২৪ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের মেমফিসে ৪১ হাজার ফুট উচ্চতায় উড়ন্ত বিমান থেকে লাফ দেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে তাঁর ওই স্কাইডাইভ গিনেস বুকে বিশ্ব রেকর্ডের স্বীকৃতি পায় গত বছরের ১ জুলাই।
এর কয়েক মাস পর ১২ সেপ্টেম্বর/২০২৪ চৌধুরী আশিক বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর আশিক চৌধুরী নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর বিনিয়োগ বিষয়ে একের পর এক প্রচারমূলক কর্মকাণ্ডে উদ্যোগী হন।
১৮ মাস আগে যখন ড. ইউনূসের বিদেশ থেকে আশিক চৌধুরীকে ডেকে এনে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান বানাল, তখন তাকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল এক অদ্ভুত রকমের ভক্তিবাদ। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ইংরেজি বলার ঢং, স্মার্ট চেহারা আর আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপনা নিয়ে শুরু হয়ে গেল ‘আশিক ম্যাজিক’-এর গল্প। বলা হচ্ছিল, এই মানুষটাই নাকি বিদেশি বিনিয়োগের বন্যায় ভাসিয়ে দেবে দেশ।
কিন্তু দেড় বছর পার হয়ে যাওয়ার পর এখন প্রশ্ন উঠছে, সেই ম্যাজিকের বেলুনটা কি আদৌ কখনো হাওয়ায় ভেসেছিল, নাকি শুরু থেকেই সেটা ছিল একটা ফাঁপা প্রচার? অনুসন্ধানে দেখা যায়, বিডার চেয়ারম্যান যতটা না দেশের স্বার্থে কাজ করেছেন, তারচেয়ে অনেক বেশি দৌড়ঝাঁপ করেছেন, ড. ইউনূসের ইমেজ বৃদ্ধি এবং সামাজিক ব্যবসা সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে।
বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান যেন হয়ে ওঠেন গ্রামীণের বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং ম্যানেজার। আশিক মাহমুদের বিডার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তথ্যের দিকে তাকালে হতাশ হতেই হয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। করোনাকালেও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছিল।
নিট এফডিআই বেড়ে ১৬৯ কোটি ডলার হলেও সেটার বড় অংশ এসেছে আগে থেকে থাকা কোম্পানিগুলোর পুনর্বিনিয়োগ আর ঋণ থেকে, নতুন বিনিয়োগকারী আসেনি বললেই চলে। বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে ৫৮ শতাংশ।
করোনার সময়ে যেখানে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব নিবন্ধিত হয়েছিল, সেখানে গত অর্থবছরে হয়েছে মাত্র ৬৬ হাজার কোটি টাকার। আর চলতি বছরের ১০ মাসে নিবন্ধিত প্রকল্পের সংখ্যা নেমে এসেছে ৮১৪টিতে, যেখানে আগের বছর ছিল ১ হাজার ১১৩টি। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে ১৯ শতাংশ।
বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে, যেখানে আগে ছিল ১০ শতাংশের বেশি। গত বছর এপ্রিলে বড় ধুমধাম করে বিনিয়োগ সম্মেলন হলো। ৫০টি দেশের চার শতাধিক প্রতিনিধি এলেন, ঘোষণা এলো প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবের। সোশ্যাল মিডিয়া ভেসে গেল প্রশংসায়।
কিন্তু সেই ঘোষিত বিনিয়োগ এখন কোথায়? দেশের যেকোনো বড় উদ্যোক্তা একাই তিন-চার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে পারেন, কিন্তু তাদের তো আহ্বানই জানানো হলো না ঠিকমতো। যাদের নিয়ে এত গর্জন, তারা কেউই এখনো টাকা নিয়ে হাজির হননি। গর্জনটা তীব্র ছিল, বর্ষণ হয়নি মোটেই।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আসল সমস্যাগুলো তো সমাধান হয়নি একটুও। ব্যাংক খাত ধসে আছে, বেশ কিছু ব্যাংক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। ঋণের সুদের হার ১৫ শতাংশের বেশি, যেখানে ভিয়েতনাম বা ভারতে এটা অনেক কম। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট এখনো প্রকট, মানসম্মত সেবা পাওয়া যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য ওঠানামার সময় বেশি, ডিজিটাইজেশন সীমিত।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তীব্র। হামলা-মামলা চলছে দেশের উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে, আস্থা একেবারে তলানিতে। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই তাদের পুঁজি ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, তারা অপেক্ষা করছেন একটা নির্বাচিত সরকারের, যেটা তাদের বিনিয়োগের নিরাপত্তা দিতে পারবে। সেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কেন আসবেন? বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা পরিষ্কার বলে দিয়েছেন, নির্বাচিত সরকার ও স্থিতিশীলতা ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসা কঠিন।
২০২৪ সালে ভারত পেয়েছে ২৭ বিলিয়ন ডলার, ইন্দোনেশিয়া ২১ বিলিয়ন, ভিয়েতনাম ২০ বিলিয়ন। আর বাংলাদেশ পেয়েছে মাত্র দেড় বিলিয়ন। এমনকি পাকিস্তানও বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে। দুই বছর আগে যে পাকিস্তান বাংলাদেশের পেছনে ছিল, তারাই এখন এগিয়ে। এই তুলনা করলে আশিক চৌধুরীর ‘মিরাকল’-এর দাবি কতটা ফাঁপা, সেটা পরিষ্কার হয়ে যায়।
বিডার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অতীতে অনেক ভুয়া বা অকার্যকর নিবন্ধন হতো, সেগুলো বন্ধ করায় সংখ্যা কমেছে। কিন্তু এটা তো একটা দায় এড়ানোর চেষ্টা মাত্র। প্রকৃত বিনিয়োগ না এলে নিবন্ধনের মান উন্নত করার দাবিতে কোনো মূল্য নেই। মানুষ চায় কাজ, চায় কর্মসংস্থান, চায় কারখানা চালু হোক। শিল্প-কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কর্মসংস্থান কমছে, এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।
আশিক চৌধুরীর তৎপরতা মূলত ঘিরে আছে বড় বড় অবকাঠামো চুক্তি আর বন্দর লজিস্টিকসের চুক্তি নিয়ে। চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার বিতর্ক তাকে তাড়া করছে। দেশের সম্পদ যেভাবে হাতবদল হচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে দেশটা বিক্রির নীল নকশা বাস্তবায়ন করতেই তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। নীতিগত সংস্কার বা ব্যবসায়িক পরিবেশের প্রকৃত উন্নতির চেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে ‘হাই-ভ্যালু ডিল’ আর চমকপ্রদ ঘোষণায়। প্রচারে গর্জন তীব্র, বাস্তবে বর্ষণ শূন্য।
মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, আমলাদের বাইরে থেকে একজনকে আনা হয়েছিল সাহসী সংস্কারের আশায়। কিন্তু দেড় বছরে কোনো বড় কাঠামোগত সংস্কার হয়নি। উদ্যোগ ছিল, কর্মস্পৃহাও ছিল, কিন্তু সেগুলোকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া হয়নি। আর এখন আশিক চৌধুরী নিজেই একটা প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তার আনা বিনিয়োগ কোথায় গেল? সেই ঘোষিত তিন হাজার কোটি টাকা কোথায়?
দেশে কোনো নতুন কারখানা, কোনো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হলো না, কিন্তু তার নিজের ‘বেলুন’ বেশ ভালোই ভরছে বলে মনে হচ্ছে। বিনিয়োগ আসছে না, অর্থনীতি ধসছে, মানুষের কষ্ট বাড়ছে। আর আশিক চৌধুরীর মতো মানুষ শুধু প্রচারের কারিগর হয়ে বসে আছেন।
এখন প্রশ্ন ওঠা উচিত, এতদিনে আশিক চৌধুরী দেশ থেকে কত টাকা লুটপাট করেছেন? কোথায় গেল সেই বিনিয়োগ? কোন প্রকল্পে কত টাকা এসেছে, সেটার স্বচ্ছ হিসাব কোথায়?
বিনিয়োগ আকৃষ্টের হিটম্যাপ তৈরিসহ যার মধ্যে রয়েছে ইনভেস্টমেন্ট সামিট আয়োজন, স্যাটেলাইটভিত্তিক ইন্টারনেট সেবা পেতে ইলোন মাস্কের স্টারলিংকের নিবন্ধন, শান্তিপূর্ণ ও বেসামরিক মহাকাশ অনুসন্ধানে নাসার সঙ্গে চুক্তি, সব বিনিয়োগ প্রচার সংস্থাকে একই ছাদের নিচে নিয়ে আসা।
এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন লজিস্টিক অবকাঠামো শক্তিশালী করতে চট্টগ্রাম বন্দরে ডেনমার্কভিত্তিক এপি মোলার মায়ের্স্কের বিনিয়োগ। তবে বিনিয়োগ অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রচারণামূলক ওইসব কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন প্রকৃত বিনিয়োগ আকৃষ্টে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়।
বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের সূচক হিসেবে বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাবের সংখ্যা যেমন নিম্নমুখী, তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহও কমেছে। অন্যদিকে শিল্পের মূলধনি যন্ত্র আমদানিও নিম্নমুখী। সব মিলিয়ে বিনিয়োগ আকৃষ্টে চৌধুরী আশিকের প্রচার বা তৎপরতা যতটা আলোচিত হচ্ছে, প্রকৃত বিনিয়োগ পরিস্থিতি তার ঠিক বিপরীত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যালান্স অব পেমেন্টের (বিওপি) পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাস জুলাই থেকে মার্চে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ ছিল ৮৬ কোটি ১০ লাখ ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের একই সময়ে নিট এফডিআই প্রবাহ ছিল ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার। এ হিসেবে চলতি অর্থবছরের নয় মাসে এফডিআইয়ের নিট প্রবাহ কমেছে ২৬ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উইকলি সিলেকটেড ইকোনমিক ইন্ডিকেটরসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্র আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি বা আমদানি বাবদ অর্থ পরিশোধ হয়েছে ১শ ৫২ কোটি ১৫ লাখ ৫০ হাজার ডলারের। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছিল ২শ ১৩ কোটি ৩৩ লাখ ডলারের।
অর্থাৎ মূলধনি যন্ত্র আমদানি কমেছে ২৮ দশমিক সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় বেসরকারি বিনিয়োগের হার কমে দাঁড়িয়েছে ২২.৪৮ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৩.৫১ শতাংশ। একই সময়ে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে প্রায় ১৯ শতাংশ। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে রয়েছে, যেখানে এর আগে তা ১০ শতাংশের বেশি ছিল।
প্রশ্ন হলো, কোন যোগ্যতার ভিত্তিতে আশিক মাহমুদকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ি প্রধান উপদেষ্টার একক ইচ্ছায় আশিক কে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আশিক ড. ইউনূসের পূর্ব পরিচিত। ইউনূসের গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোনো।
সামাজিক ব্যবসার নামে ইউনূসের বিভিন্ন ধরনের প্রতিষ্ঠানের জন্য অতীতে তিনি পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশ থেকে ব্যবসা এনেছেন। এটাই তার একমাত্র যোগ্যতা। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভবান করার জন্যই ড. ইউনূস আশিক মাহমুদকে বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছিলেন।
দেশের জন্য তিনি কিছু না করলেও গ্রামীণ এন্টারপ্রাইজ, গ্রামীণ টেলিকম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের জন্য বিদেশে প্রচারণাটা ভালোই করেছেন। অনেকেই মনে করেন, তিনি বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান না, ছিলেন গ্রামীণ এবং ড. ইউনূসের মার্কেটিং ম্যানেজার।
এখন ড. ইউনূস প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাহলে আশিক মাহমুদকে কী দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এরকম একটি পদে রাখা উচিত। দেশি উদ্যোক্তাদের অভিমত, বিডার চেয়ারম্যান পদে অবিলম্বে একজন দক্ষ, যোগ্য এবং বিনিয়োগবান্ধব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়া উচিত। সূত্র:বাংলাদেশ প্রতিদিন।
















