দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের
- আপডেট সময় : ১০:০৫:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১০১৬ বার পড়া হয়েছে
দরিদ্র বাড়িয়ে বিদায় দারিদ্র্যের জাদুকরের
আস্থা ডেস্কঃ
শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’র কথা বলে আসছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর দারিদ্র্য বিমোচনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার একটি বড় সুযোগ থাকলেও অদক্ষ ও অযোগ্যতার কারণে দারিদ্রতা দুর না করে বরং দারিদ্র্যেতাকে বাড়িয়ে বিদায় নিয়েছে দারিদ্র্যের জাদুকর ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
সমালোচকদের দাবি, সেই সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। বরং তার দায়িত্বকালে দেশে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাব উল্লেখ করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবর্তনের পর তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। নিজের পছন্দ অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদ গঠন এবং রাজনৈতিক সমর্থন থাকার কারণে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কার, দুর্নীতি দমন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনার সুযোগ ছিল
কিন্তু অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচকে উন্নতির বদলে অবনমন দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর আবদুল বায়েসের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার পর সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে শিল্পোৎপাদন কমেছে, বিনিয়োগে আস্থা হ্রাস পেয়েছে এবং নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হচ্ছে, তার আমলে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন।
বিনিয়োগের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বে-সরকারি খাতে গড় বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনে নেমে আসে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে। এক বছরে প্রায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ পয়েন্ট পতন চার দশকের মধ্যে বিরল। সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে।
সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল সাড়ে ১১ শতাংশ, যা গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে:-
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে এই হার ছিল ২০ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, এই হার বিশ্বে অন্যতম সর্বোচ্চ।
সরকারি ঋণের বোঝাও বেড়েছে:-
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে সরকারি ঋণ দাঁড়ায় ২২ লাখ ৫০ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসেই ব্যাংকিং খাত থেকে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি ও মজুরির ব্যবধান সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়িয়েছে:-
ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল এর চেয়ে কম। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে এবং ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে এবং ব্যবসার পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি বিদায়ী বক্তব্যে তুলে ধরেন ড. ইউনূস বলেন, প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ফলে রিজার্ভ বেড়েছে এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষক ড. লুবনা তুরীনের মতে, রিজার্ভ নিজেই লক্ষ্য নয়; বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও নীতিগত স্বাধীনতাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। তার মতে, আমদানি সংকোচন ও উৎপাদন হ্রাসের বিনিময়ে রিজার্ভ বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধান নয়।
দায়িত্ব নেওয়ার সময় ড. ইউনূস প্রশাসন, বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সমালোচকদের মতে, একটি নির্বাচন আয়োজন ছাড়া অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি পূরণ হয়নি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ, উপদেষ্টাদের সম্পদ বিবরণী নিয়ে প্রশ্ন এবং ব্যক্তিগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সুবিধা পাওয়া নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে থাকা কিছু মামলা দ্রুত খারিজ হওয়া নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
গ্রামীণ ব্যাংকের কর মওকুফ ও শেয়ার কাঠামোয় পরিবর্তন, গ্রামীণ গ্রুপের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দ্রুত অনুমোদন পাওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সময়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগও সামনে এসেছে।
ড. ইউনূস বিশ্বব্যাপী ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—ধারণা প্রচার করেছেন। তবে তার শাসনামলে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির অভিযোগ ওঠায় এই দর্শনের বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দায়িত্ব শেষে তিনি যখন আগের কর্মক্ষেত্রে ফিরবেন, তখন এই লক্ষ্য নিয়ে কতটা দৃঢ়ভাবে কথা বলতে পারবেন—সচেতন মহলে এখন সেটিই আলোচনার বিষয়।



















