ঢাকা ০৪:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পাঁচ কারণে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিরসনে নীরব চীন

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১১:১৩:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬
  • / ১০০৮ বার পড়া হয়েছে

পাঁচ কারণে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিরসনে নীরব চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলে তোড়জোড় থাকলেও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন এই সংঘাত নিরসনে কোনো তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না। বরং বেইজিংয়ের বর্তমান অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততাকে নিজেদের জন্য লাভজনক মনে করছে। (সূত্র-আল-মনিটর)।

বুধবার (১৮ মার্চ) আল-মনিটর-এ প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে বিশ্লেষক জয়েস কারাম জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও চীন এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। এর প্রধান কারণ হলো, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সম্পদ ও মনোযোগ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে রাখছে, যা চীনের জন্য ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পূর্বনির্ধারিত চীন সফর পিছিয়ে দিয়ে বেইজিংয়ের কাছে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু চীন সেই অনুরোধে বিশেষ সাড়া না দিয়ে বরং প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে দায় সেরেছে।

প্রথমত, চীন চায় এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও শক্তি ক্ষয় করুক, কারণ বর্তমানে এই যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলেও চীনের হাতে প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা অনায়াসেই চার মাস চলতে পারবে। এ ছাড়া চীন বর্তমানে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়িয়েছে এবং ইরান থেকেও সস্তায় তেল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বেইজিং বর্তমান ইরানি শাসনের পতনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। যদিও তারা বর্তমান সরকারের টিকে থাকাকে প্রাধান্য দেয়, তবে অতীতের ইতিহাস বলে যে ইরানে যেকোনো শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই চীন নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম।

চতুর্থত, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও মজবুত করার সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর চীন এখন এই অঞ্চলে একজন নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে আরব দেশগুলো এখন নিরাপত্তার জন্য চীনের দিকে ঝুঁকছে।

পঞ্চমত, চীন এখন এই সংঘাতের মানবিক দিকটিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক সংকটে বেইজিংকে খুব একটা নেতৃত্ব দিতে দেখা না গেলেও এবার তারা জর্ডান, লেবানন ও ইরাকের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে চীন বিশ্ব দরবারে নিজেকে একটি ‘দায়িত্বশীল শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে এবং আমেরিকার আগ্রাসী ভাবমূর্তির বিপরীতে নিজেদের একটি মানবিক অবস্থান তৈরি করছে। কম খরচে বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়ানোর এটি একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, চীন এই যুদ্ধ শুরু করেনি এবং তারা স্থিতিশীলতা পছন্দ করলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য অনেক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করছে বা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংসের মুখে না ফেলছে, ততক্ষণ বেইজিং এই সংঘাত বন্ধে খুব একটা আগ্রহী হবে না।

ওয়াশিংটনের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেরিয়ে এশিয়ায় মনোযোগ দিতে চাইছিল, তখনই ইরান যুদ্ধ তাদের আবারো পুরনো জালে বন্দি করে ফেলেছে। (আল-মনিটর)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

পাঁচ কারণে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিরসনে নীরব চীন

আপডেট সময় : ১১:১৩:০৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬

পাঁচ কারণে ইরান-ইসরায়েল সংঘাত নিরসনে নীরব চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধে আন্তর্জাতিক মহলে তোড়জোড় থাকলেও বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি চীন এই সংঘাত নিরসনে কোনো তাড়াহুড়ো দেখাচ্ছে না। বরং বেইজিংয়ের বর্তমান অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সম্পৃক্ততাকে নিজেদের জন্য লাভজনক মনে করছে। (সূত্র-আল-মনিটর)।

বুধবার (১৮ মার্চ) আল-মনিটর-এ প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে বিশ্লেষক জয়েস কারাম জানিয়েছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও চীন এই যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়াকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। এর প্রধান কারণ হলো, এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সম্পদ ও মনোযোগ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আটকে রাখছে, যা চীনের জন্য ভূ-রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সুবিধাজনক।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার পূর্বনির্ধারিত চীন সফর পিছিয়ে দিয়ে বেইজিংয়ের কাছে হরমুজ প্রণালী খুলে দিতে এবং ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে সাহায্য চেয়েছিলেন। কিন্তু চীন সেই অনুরোধে বিশেষ সাড়া না দিয়ে বরং প্রচলিত কূটনৈতিক ভাষায় যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে দায় সেরেছে।

প্রথমত, চীন চায় এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও শক্তি ক্ষয় করুক, কারণ বর্তমানে এই যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলেও চীনের হাতে প্রায় ১৩০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা অনায়াসেই চার মাস চলতে পারবে। এ ছাড়া চীন বর্তমানে রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানি বাড়িয়েছে এবং ইরান থেকেও সস্তায় তেল সংগ্রহ অব্যাহত রেখেছে।

তৃতীয় কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বেইজিং বর্তমান ইরানি শাসনের পতনের ঝুঁকি নিতেও প্রস্তুত। যদিও তারা বর্তমান সরকারের টিকে থাকাকে প্রাধান্য দেয়, তবে অতীতের ইতিহাস বলে যে ইরানে যেকোনো শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই চীন নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম।

চতুর্থত, এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক আরও মজবুত করার সুযোগ করে দিয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালে সৌদি-ইরান চুক্তিতে মধ্যস্থতা করার পর চীন এখন এই অঞ্চলে একজন নিরপেক্ষ ও দায়িত্বশীল অংশীদার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের শীর্ষ কর্মকর্তারা এরই মধ্যে বেইজিং সফর করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয় যে আরব দেশগুলো এখন নিরাপত্তার জন্য চীনের দিকে ঝুঁকছে।

পঞ্চমত, চীন এখন এই সংঘাতের মানবিক দিকটিতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের মানবিক সংকটে বেইজিংকে খুব একটা নেতৃত্ব দিতে দেখা না গেলেও এবার তারা জর্ডান, লেবানন ও ইরাকের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোতে ত্রাণ সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে। এর মাধ্যমে চীন বিশ্ব দরবারে নিজেকে একটি ‘দায়িত্বশীল শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরছে এবং আমেরিকার আগ্রাসী ভাবমূর্তির বিপরীতে নিজেদের একটি মানবিক অবস্থান তৈরি করছে। কম খরচে বিশ্বজুড়ে সুনাম কুড়ানোর এটি একটি বড় সুযোগ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, চীন এই যুদ্ধ শুরু করেনি এবং তারা স্থিতিশীলতা পছন্দ করলেও বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য অনেক কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দুয়ার খুলে দিয়েছে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না করছে বা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে ধ্বংসের মুখে না ফেলছে, ততক্ষণ বেইজিং এই সংঘাত বন্ধে খুব একটা আগ্রহী হবে না।

ওয়াশিংটনের জন্য এটি একটি বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ, কারণ ট্রাম্প প্রশাসন যখন মধ্যপ্রাচ্য থেকে বেরিয়ে এশিয়ায় মনোযোগ দিতে চাইছিল, তখনই ইরান যুদ্ধ তাদের আবারো পুরনো জালে বন্দি করে ফেলেছে। (আল-মনিটর)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ