ঢাকা ০৫:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

হরমুজ দখলে রাখেই কৌশলে হাঁটছে ইরান

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১২:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০১৫ বার পড়া হয়েছে

হরমুজ দখলে রাখেই কৌশলে হাঁটছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্ণ বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো দেখলে বোঝা যায়, ইরান কীভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করছে।

এই যুদ্ধবিরতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ইরানকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি নিয়ন্ত্রণ করে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র-সিএনএন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সামান্থা গ্রস বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে ইরানের খুব বেশি সামরিক শক্তির দরকার নেই।

যুদ্ধবিরতির খবর পেয়ে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন—জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। বুধবার তেলের দাম ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় একই হারে কমে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বলেন, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ।

নেতানিয়াহুকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করল ইরান:-

এখনো পরিষ্কার নয়, জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না। কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলেও পরে ইসরায়েলের লেবাননে হামলার পর ফের তা বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা গেছে। বর্তমানে ইরানের সামরিক বাহিনী এই পথ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে।

ছয় সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এবং এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার পরিবাহিত হয়।

বিশ্বজুড়ে এই তেলের সংকট বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে:-

এশিয়ার অনেক দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইনে জাতীয় জ্বালানিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপে বিদ্যুতের দাম বেড়ে গেছে, ঠিক তখনই যখন তারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠছিল। এমনকি তেলসমৃদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রোলের দাম বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে যুদ্ধবিরতি আদায় করতে সাহায্য করেছে। যদিও দেশটি দুর্বল হয়েছে, তবুও তার সরকার টিকে আছে। ইরান এই প্রণালিকে ব্যবহার করছে এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানকে দুটি বড় সুবিধা দিয়েছে। প্রথমত, এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তেলের দাম বাড়িয়ে নিজের আয় বাড়াতে পারে।

বিশ্বে তেলের ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। ইরানের তেল রপ্তানি বেড়েছে এবং তারা এখন বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। সাধারণত ইরানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়; কিন্তু সম্প্রতি চীন ও ভারতের মতো দেশে এটি বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইরানের তেলের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে। এদিকে ইরান ভবিষ্যতেও হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তারা এমন প্রস্তাব দিয়েছে যাতে এই প্রণালি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা থাকে।

একজন বিশ্লেষক বলেছেন, ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। ট্রাম্পও ইরানের প্রস্তাবকে আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য বলেছেন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে নিয়মিত ফি দিতে হতে পারে।

একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ওমান এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা জাহাজ থেকে টাকা নেবে এবং তার একটি অংশ ইরানকে দেবে। ইরান এরই মধ্যেই কিছু জাহাজ থেকে টাকা নেওয়া শুরু করেছে। একটি জাহাজ নাকি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিয়েছে এই পথে চলার জন্য। বাণিজ্যিক জাহাজ কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুতই এই ফি মেনে নিতে পারে, কারণ এই অঞ্চলের তেল রপ্তানির জন্য বিকল্প পথ খুবই সীমিত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি জলপথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র, যার মাধ্যমে ইরান পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারছে। (সূত্র-সিএনএন)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

হরমুজ দখলে রাখেই কৌশলে হাঁটছে ইরান

আপডেট সময় : ১২:৩৮:৫৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬

হরমুজ দখলে রাখেই কৌশলে হাঁটছে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পূর্ণ বিজয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু চুক্তির শর্তগুলো দেখলে বোঝা যায়, ইরান কীভাবে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর বিশাল প্রভাব বিস্তার করছে।

এই যুদ্ধবিরতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ইরানকে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দিতে হবে। এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে স্বীকার করা হয়েছে যে, বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি নিয়ন্ত্রণ করে তেহরান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সূত্র-সিএনএন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ সামান্থা গ্রস বলেছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে ইরানের খুব বেশি সামরিক শক্তির দরকার নেই।

যুদ্ধবিরতির খবর পেয়ে বিনিয়োগকারী ও ব্যবসায়ীরা স্বস্তি পেলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন—জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। বুধবার তেলের দাম ১৫-২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় এবং ইউরোপের প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও প্রায় একই হারে কমে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিং বলেন, এই যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তিতে রূপ নেবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। বাজারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ।

নেতানিয়াহুকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করল ইরান:-

এখনো পরিষ্কার নয়, জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে কি না। কিছু জাহাজ চলাচল শুরু হলেও পরে ইসরায়েলের লেবাননে হামলার পর ফের তা বন্ধ হয়ে যায় বলে জানা গেছে। বর্তমানে ইরানের সামরিক বাহিনী এই পথ নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে।

ছয় সপ্তাহ ধরে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালিতে বেশিরভাগ জাহাজ চলাচল বন্ধ করে রেখেছে, যা আগে অকল্পনীয় ছিল। সাধারণত এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস এবং এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার পরিবাহিত হয়।

বিশ্বজুড়ে এই তেলের সংকট বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে:-

এশিয়ার অনেক দেশে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। ফিলিপাইনে জাতীয় জ্বালানিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। ইউরোপে বিদ্যুতের দাম বেড়ে গেছে, ঠিক তখনই যখন তারা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব কাটিয়ে উঠছিল। এমনকি তেলসমৃদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রোলের দাম বেড়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ইরানকে যুদ্ধবিরতি আদায় করতে সাহায্য করেছে। যদিও দেশটি দুর্বল হয়েছে, তবুও তার সরকার টিকে আছে। ইরান এই প্রণালিকে ব্যবহার করছে এক ধরনের ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’ হিসেবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ইরানকে দুটি বড় সুবিধা দিয়েছে। প্রথমত, এটি বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, তেলের দাম বাড়িয়ে নিজের আয় বাড়াতে পারে।

বিশ্বে তেলের ঘাটতি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। ইরানের তেল রপ্তানি বেড়েছে এবং তারা এখন বেশি দামে তেল বিক্রি করছে। সাধারণত ইরানি তেল আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় কম দামে বিক্রি হয়; কিন্তু সম্প্রতি চীন ও ভারতের মতো দেশে এটি বেশি দামে বিক্রি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর তেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় ইরানের তেলের চাহিদা ও দাম দুটোই বেড়েছে। এদিকে ইরান ভবিষ্যতেও হরমুজ প্রণালির ওপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় তারা এমন প্রস্তাব দিয়েছে যাতে এই প্রণালি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকা থাকে।

একজন বিশ্লেষক বলেছেন, ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস বাজারকে প্রভাবিত করতে সক্ষম। ট্রাম্পও ইরানের প্রস্তাবকে আলোচনার জন্য গ্রহণযোগ্য বলেছেন।

অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের জন্য জাহাজগুলোকে নিয়মিত ফি দিতে হতে পারে।

একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ওমান এই প্রক্রিয়ায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে। তারা জাহাজ থেকে টাকা নেবে এবং তার একটি অংশ ইরানকে দেবে। ইরান এরই মধ্যেই কিছু জাহাজ থেকে টাকা নেওয়া শুরু করেছে। একটি জাহাজ নাকি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিয়েছে এই পথে চলার জন্য। বাণিজ্যিক জাহাজ কোম্পানি ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুতই এই ফি মেনে নিতে পারে, কারণ এই অঞ্চলের তেল রপ্তানির জন্য বিকল্প পথ খুবই সীমিত।

সব মিলিয়ে বলা যায়, হরমুজ প্রণালি এখন শুধু একটি জলপথ নয়, এটি হয়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্ত্র, যার মাধ্যমে ইরান পুরো বিশ্ব অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারছে। (সূত্র-সিএনএন)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ