আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের আইন: বিএনপির আত্মঘাতী চাল
- আপডেট সময় : ১২:০৬:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১০ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০২৬ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত; তাকে আইনে রূপান্তর করাটা বহুদলীয় রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশটি মূলত সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তার পাশাপাশি তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করেছিল। বুধবার জাতীয় সংসদে পাস হওয়া বিলের মাধ্যমে সেই অধ্যাদেশই আইনের রূপ পেল।
মঞ্জুরে খোদা:
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে সবার প্রত্যাশা ছিল একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ ও রাজনীতি, কিন্তু তারা ওই বন্দোবস্ত দিতে ব্যর্থ হয়েছে। মানুষ অপেক্ষায় ছিল একটি নির্বাচিত সরকারের, এই আশায় যে, তাদের মাধ্যমেই হয়তো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত হবে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখা হলেও তাদের কর্মী-সমর্থকদের একটি বড় অংশ বিএনপি প্রার্থীদের ভোট দেয়। বিএনপি নেতারাও তাদের হামলা-মামলা ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিএনপি নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিভিন্ন জেলায় অফিস খুলে কার্যক্রম চালাতে তৎপর হয়। এরই মধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আসে, দলটির ওপর থাকা অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে কি না? ঠিক এমন সময়েই সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের বিষয়টিকে আইনি কাঠামো প্রদান করল।
আওয়ামী লীগ নিয়ে বিএনপি’র শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য:-
শেখ হাসিনার পতনের পর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ৭ অগাস্ট দলীয় কার্যালয়ের সামনে প্রথম ভার্চুয়াল ভাষণে বলেন, “ধ্বংস নয়, প্রতিশোধ নয়, প্রতিহিংসা নয়। আসুন ভালোবাসা, শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলি।” (মানবজমিন, ৭ অগাস্ট ২০২৪)
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে টাইম ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, নির্বাহী আদেশে তিনি কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। তিনি ওই সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “আজ যদি একটি দল নিষিদ্ধ করা হয়, তবে কাল আমার দলও নিষিদ্ধ হবে না, তার নিশ্চয়তা কী?” (টাইম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬)
গত বছর ১৩ ফেব্রুয়ারি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, “আমি বলেছি যে, জনগণ সিদ্ধান্ত নেবে। আমরা এই বিষয়টা বারবার করে বলে আসছি যে, আমরা একটা লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি… আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, গণতন্ত্রের সব নর্মস অ্যান্ড কন্ডিশন যেগুলো আছে, সেগুলোর ওপর আমরা আস্থা রাখি এবং সেটা আমরা চর্চা করি… অতীতেও চর্চা করেছি।”
“আমরা এই কথা বলে আসছি যে, ইট ইজ নট আস হু উইল ডিসাইড যে, কোন পার্টি নিষিদ্ধ হবে, কোন পার্টি কাজ করবে, কোন পার্টি কাজ করবে না… পিপলস উইল ডিসাইড… মানুষ বা জনগণ নির্ধারণ করবে কোনো পার্টি থাকবে কি থাকবে না, কোনো পার্টি নির্বাচন করবে কি করবে না।” (দ্য ডেইলি স্টার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫)
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “আমরা আগেও এই বিষয়ে আমাদের বক্তব্য পরিষ্কার করেছি, নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড বা কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা আমরা সমর্থন করি না।” তিনি আরও বলেন, “যেকোনো প্রক্রিয়ায় নির্বাহী আদেশের মধ্য দিয়ে যদি আমরা রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ চাই, তাহলে সেটা হবে একটা ভয়ঙ্কর চর্চা।” (দ্য ডেইলি স্টার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বর এমন অবস্থানের পর ওই বিএনপিই কেন এখন আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করল? নির্বাচনের আগে তারা নিষিদ্ধের কথা বলেনি। বিজয়ের পর এই কাজ করার মাধ্যমে কি তারা প্রমাণ করল যে, সেটি ছিল তাদের কৌশল? নাকি তারা ভাবছেন, প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীকে মাঠ থেকে সরানো গেলে জামায়াতকে গোনায় ধরার কেউ থাকবে না? আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত; তাকে আইনে রূপান্তর করাটা বহুদলীয় রাজনীতির জন্য এক অশনিসংকেত।
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি সংকটময়, যার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। এই অবস্থা সরকারের জন্য বহুমুখী সংকট তৈরি করছে। এমন প্রেক্ষাপটে দেশের অন্যতম বৃহত্তম দলকে নিষিদ্ধ করা কি বিএনপির জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ নয়? আওয়ামী লীগের অভিযুক্ত নেতাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন আছে। এছাড়া হাজার হাজার ভুয়া মামলা, গ্রেপ্তার ও পুলিশ হত্যার বিচার নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ১/১১-এর ইস্যু, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্য চুক্তি ও অর্থনৈতিক মন্দা। ক্ষমতার শুরুতেই কি এতগুলো বিষয় একসঙ্গে মোকাবিলা করা বিএনপির পক্ষে সম্ভব?
আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি কিন্তু বিএনপি’র বিকল্প কে?
আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করে বিএনপির দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে না। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুঁজি হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি সংস্কৃতি। বিএনপি কি ওই স্থান পূরণ করতে পারবে? তাদের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভিন্ন। যে কারণে তাদের মধ্যকার সম্পর্ক শত্রুতাপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ তার শাসনামলে কোনো প্রতিপক্ষ রাখতে চায়নি। বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন চালালেও তারা টিকে ছিল। আওয়ামী লীগের অবর্তমানে বিএনপি এখন প্রধান শক্তি, সঙ্গে জামায়াতও শক্তি প্রদর্শন করছে। তবে দেখা গেছে, মানুষ জামায়াতকে প্রত্যাখ্যান করে বিএনপিকেই বেছে নিয়েছে। সাংবাদিক নুরুল কবীর যেমনটি বলেছেন, দেশের বহু মানুষ জামায়াত থেকে বাঁচতে ‘নাকে রুমাল দিয়ে’ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে।
বিএনপির প্রকৃত প্রতিপক্ষ কে? আওয়ামী লীগ না জামায়াত? বিএনপি কি জামায়াতকে কম বিপজ্জনক ও নিরাপদ প্রতিপক্ষ মনে করছে? ওই সমীকরণেই কি আওয়ামী লীগকে মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো? এরকম অবস্থায় জামায়াতই হবে বিএনপির বিকল্প শক্তি। আর যদি জামায়াত রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে তারা কি দেশে গণতন্ত্র, স্বাধীনতার চেতনা ও সংবিধানকে অক্ষত রাখবে? তাদের রাজনীতি, নীতি-আদর্শ ও অতীত ইতিহাস তা বলে না। ওই পরিস্থিতি কি বিএনপির অস্তিত্বকেই সংকটে ফেলবে না?
কুটকৌশল না সুবিধা গ্রহণের রাজনীতি:-
প্রতিপক্ষের দুর্বল মুহূর্তে তার ওপর আঘাত করা বীরের ধর্ম নয়। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা কি বিএনপির সময় ও সুযোগের সদ্ব্যবহার? নাকি জামায়াত-এনসিপির কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কোনো কূটকৌশল?
আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করে বিএনপিকেও কি ওই সমীকরণে রাখা হবে? এটা যদি সেই নীতির অংশ হয় তবে বলতে হয় ডিপ স্টেটের ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার খেলা বন্ধ হয়নি, শুধু কৌশল পাল্টেছে। আর ওই ছকে পা দিয়েছে স্বয়ং বিএনপি নিজেই। সমস্যা হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে উদার গণতান্ত্রিক ধারার কোনো বিকল্প থাকছে না। সে কারণেই বিএনপির এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী।
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করে কি বিএনপি যেভাবে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলল:-
১। নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে আওয়ামী লীগ মজলুম হিসেবে জনগণের সহানুভূতি অর্জন করবে, আর বিএনপির বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
২। দলটিকে নিষিদ্ধ করার কারণে দেশে নাশকতা ও সহিংসতা বাড়তে পারে। গোপন রাজনীতির মাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
৩। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যেমন জাতিসংঘ, ইইউ, কমনওয়েলথ, দাতা সংস্থা, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে বিএনপি চাপের মধ্যে থাকবে।
৪। ত্রিশ লক্ষ মানুষের গণহত্যার সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত রাজনীতি করবে আর স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেওয়া দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে, তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এতে বিএনপি নিজেই স্বাধীনতাবিরোধীদের সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত হবে।
৫। এই আইন পাসের মাধ্যমে একটি দলকে ক্রিমিনালাইজ করা হলো! যে দলকে এ দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ তথা এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমর্থন করে, তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হলো।
বামপন্থীরা কি আওয়ামী লীগের বিকল্প হতে পারে?
বাংলাদেশে যে বাস্তবতা তাতে দরকার ছিল একটি উদার বামপন্থী রাজনৈতিক ধারার বড় দলের। কিন্তু তারা ওই স্থান দখল করতে পারেনি; আশু সে সম্ভাবনাও নেই। গেল নির্বাচনে বামদের করুণ ফলাফল ওই বাস্তবতা স্পষ্ট করেছে। সেক্ষেত্রে কে বা কারা পূরণ করবে আওয়ামী লীগের শূন্যতা? না হলে মানুষ বিএনপির বদলে আবার আওয়ামী লীগকেই খুঁজবে।
বিএনপি দলের যে অংশের পরামর্শে এই কাজটি করল, তারা কি তাদের উপকার করল? ক্ষমতাসীনদের মধ্যে সবসময় একটি অতি-উৎসাহী অংশ থাকে যাদের কারণে দল বিপজ্জনক পথে হাঁটে; যেমনটি আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, অতীতে বিএনপিরও হয়েছিল। বিএনপি হয়তো ভাবছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলে জেল-মামলার কারণে তাদের সমর্থকরা বাধ্য হয়েই তাদের ভোট দেবে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে জামায়াতকে সমর্থন করবে না, সে ক্ষেত্রে তাদের যুগ যুগ ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত হবে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার দম্ভ এভাবেই একটি রাজনৈতিক দলকে কর্তৃত্বপরায়ণ করে, যার পরিণতি যে ভয়াবহ হয়, তা নিকট অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের মধ্যে দেখা গেছে।
মঞ্জুরে খোদা লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের সমন্বয়ক।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ


















