ঢাকা ০৩:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ২১ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম:
Logo ইরানে পুলিশ ও মিলিশিয়াদের বাধার মুখে পড়েছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স Logo ত্রিশালে দুই শিশুকে নির্যাতন: প্রধান আসামি আটক Logo ইরানের প্রস্তাবে নতুন রুটে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিল ৪ জাহাজ Logo ইরানে নিউক্লিয়ার হামলা হলে রাশিয়া বা চীন নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জড়াবে? Logo জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে নারী ইউএনওর অডিও ভাইরাল Logo আ.লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরিত হচ্ছে Logo ইউনুচের চুক্তিতে টন প্রতি ৭৫ ডলার বেশিতে যুক্তরাষ্ট্রের গম ক্রয় Logo জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে কিশোর আটক Logo চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করলো সিঙ্গাপুরের ডিজেলভর্তি জাহাজ: আসছে আরও দুটি Logo রাজধানীতে সন্তানকে জবাইয়ের পর মায়ের আত্মহত্যা

ইরানে নিউক্লিয়ার হামলা হলে রাশিয়া বা চীন নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জড়াবে?

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০১:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০০৮ বার পড়া হয়েছে

ইরানে নিউক্লিয়ার হামলা হলে রাশিয়া বা চীন নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জড়াবে?

আস্থা ডেস্কঃ

আমেরিকা ইরানে নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করলে রাশিয়া , চীন বা উত্তর কোরিয়া পাল্টা নিউক্লিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হওয়ার খেলায় যারা জড়িত তারা একে অপরকে নিউক্লিয়ার হামলা করবে না। তারা ব্যালেন্স করে চলতে চায়।

এই যুদ্ধে পেছন থেকে ঠিকই রাশিয়া বা চীন সহায়তা দিচ্ছে কিন্তু তারা মুখ ফুটে তা প্রকাশ করছে না। এমনকি কড়া ভাষায় কোন বিবৃতি পর্যন্ত দিচ্ছে না। তারা পেছন থেকে ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে নিজ স্বার্থে, গায়ে কোন দাগ লাগাচ্ছে না। নিউক্লিয়ার হামলা হলেও তারা আস্তে সরে পরবে।

ইরানের জন্য তারাও নিউক্লিয়ার অস্ত্র বের করবে এমন চিন্তাই করা যায় না। নিউক্লিয়ার যুদ্ধতো দূরের কথা ৫টা সৈন্যও পাঠাবে না। তারা সর্বচ্চো আন্তর্জাতিক মহলে বিবৃতি দিয়ে একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে পরবর্তীতে।

যদিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে প্রায়ই রাশিয়া ও চীনকে শক্তির ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তব কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য।

এর পেছনে কারন হিসাবে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো, পারমাণবিক প্রতিরোধ নীতি, জোট রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ভাবে টিকে থাকা সেই সাথে মূল কারন নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হুমকীর মধ্যে না ফেলা।

আধুনিক বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার এমন এক সিদ্ধান্ত, যার অর্থ পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি কাজ করে। রাষ্ট্র কেবল তখনই পারমাণবিক প্রতিশোধ নেয়, যখন তার নিজের অস্তিত্ব সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।

ইরানে পারমানবিক হামলার ক্ষেত্রে এই শর্তগুলোর কোনোটিই রাশিয়া বা চীনের জন্য প্রযোজ্য নয়। ইরান তাদের কৌশলগত অংশীদার হলেও, সে ধরনের আনুষ্ঠানিক সামরিক দায়বদ্ধতা রাশিয়া ও চীনের নেই। যা আক্রমণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রতিশোধের কারণ সৃষ্টি করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি পারমাণবিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, যার ফলাফল কোনো পক্ষের জন্যই সুখকর নয়।

এদিকে চীনের অবস্থান আরও লজ্জাবতী গাছের মত। যদিও ইরানকে তারা বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু তারা এমন দেশ “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” টাইপের।

নিজদের বিশ্বের এক নম্বর করার লড়াইয়ে ব্যস্ত, প্রযুক্তির শীর্ষে থেকে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করার মিশনে ব্যস্ত। এমন সময় আরেক দেশের জন্য পরমাণু যুদ্ধে জড়িয়ে তা বিসর্জন দিবে না। চীনের অর্থনীতি গভীরভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ তার শিল্প উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে পারমাণবিক সংঘাতে জড়িয়ে গেলে চীন সরাসরি লাভবান হওয়ার পরিবর্তে বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতা চীনকে পারমাণবিক প্রতিশোধের মতো সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারমাণবিক যুদ্ধে জড়ানো মানে শুধু ইরানের পক্ষ থেকে বদলা নেয়া নয়, বরং বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করা। যদি রাশিয়া বা চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালায়, তাহলে সেটি আর ইরানকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা দ্রুত একটি বৃহত্তর শক্তির সংঘাতে রূপ নেবে, যেখানে অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ধরনের সংঘাতের পরিণতি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। ফলে পরের স্বার্থের জন্য রাশিয়া বা চীন এ ঝামেলায় জড়াবে না, এক্ষেত্রে কোন মুসলমান দেশের জন্যতো অবশ্যই না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া বা চীন কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাবে না। বরং তারা সম্ভবত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ সৃষ্টি, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তনের উদ্যোগ এসবই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এগুলো সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নয়, কিন্তু বাস্তব কৌশলগত প্রতিরোধের অংশ।

সবাই জানি, বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে জাড়িত আছে। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ শুধুমাত্র কিন্তু ইউক্রেনের সাথে হচ্ছে না বরং ইউক্রেনের পিছনে গোটা ইউরোপ ও ন্যাটো জড়িত। ইরান যুদ্ধে ইউরোপ ও ন্যাটো সরাসরি জড়াচ্ছে না তার একটা কারন হচ্ছে সেক্ষেত্রে পক্ষান্তরে ইরান যুদ্ধে রাশিয়াকে মধ্যপ্রচ্যে সরাসরি আমন্ত্রন জানানো হয়।

দুইদিক থেকে একসাথে যুদ্ধ ইউরোপের জন্য বিরাট লোকসানের কারন হবে। আর রাশিয়াও যদি নিজ থেকে মধ্যপ্রচ্যে আসে তাহলে ইউরোপও আসতে বাধ্য হবে। তাই উভয়পক্ষ না এসে ব্যলেন্স রাখার চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি বড় সংঘাতই কিছু রাষ্ট্রের জন্য সুযোগ তৈরি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে একধরনের প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে বিশ্বের হিলিয়াম বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছে ‘চিপ’ উৎপাদন শিল্প।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া তাদের বিশাল হিলিয়াম মজুত ব্যবহার করে চীনসহ নতুন বাজার দখল ও উচ্চমূল্যের সুবিধা নিয়ে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পথে রয়েছে। শুধু হিলিয়াম নয়, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেও রাশিয়া ব্যাপকভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি একাধিক অঞ্চলে সামরিকভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ইউরোপ বা এশিয়ার অন্যান্য কৌশলগত অঞ্চলে রাশিয়া ও চীন তুলনামূলক বেশি স্বাধীনভাবে কৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে।

চীনের ক্ষেত্রে লাভের কাঠামো আরও দীর্ঘ মেয়াদি। চীন চায় এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও শক্তি ক্ষয় করুক, কারণ বর্তমানে এই যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলেও চীনের হাতে প্রায় ১শ ৩০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা অনায়াসেই চার মাস চলতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে জড়িত থাকে, তাহলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার মনোযোগ আংশিকভাবে কমে যায়।

এই পরিস্থিতি চীনের আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিকল্প মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালেও রাশিয়া বা চীনের সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবিক অর্থে নেই। কারণ এই ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো একক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা পুরো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো একটি পদক্ষেপ। ফলে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করার পথই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ইরানের এই যুদ্ধ শুধুমাত্র ইরান ও মুসলমানদের। আর বাকি যারাই আছে তারা এ যুদ্ধ থেকে তাদের স্বার্থ হাছিলের কাজে ব্যস্ত। (লেখক-নূর জুফিকার)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

ইরানে নিউক্লিয়ার হামলা হলে রাশিয়া বা চীন নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জড়াবে?

আপডেট সময় : ০১:৪৫:৪৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬

ইরানে নিউক্লিয়ার হামলা হলে রাশিয়া বা চীন নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জড়াবে?

আস্থা ডেস্কঃ

আমেরিকা ইরানে নিউক্লিয়ার বোমা ব্যবহার করলে রাশিয়া , চীন বা উত্তর কোরিয়া পাল্টা নিউক্লিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। বর্তমান অর্থনৈতিক সুপারপাওয়ার হওয়ার খেলায় যারা জড়িত তারা একে অপরকে নিউক্লিয়ার হামলা করবে না। তারা ব্যালেন্স করে চলতে চায়।

এই যুদ্ধে পেছন থেকে ঠিকই রাশিয়া বা চীন সহায়তা দিচ্ছে কিন্তু তারা মুখ ফুটে তা প্রকাশ করছে না। এমনকি কড়া ভাষায় কোন বিবৃতি পর্যন্ত দিচ্ছে না। তারা পেছন থেকে ইরানকে সমর্থন দিচ্ছে নিজ স্বার্থে, গায়ে কোন দাগ লাগাচ্ছে না। নিউক্লিয়ার হামলা হলেও তারা আস্তে সরে পরবে।

ইরানের জন্য তারাও নিউক্লিয়ার অস্ত্র বের করবে এমন চিন্তাই করা যায় না। নিউক্লিয়ার যুদ্ধতো দূরের কথা ৫টা সৈন্যও পাঠাবে না। তারা সর্বচ্চো আন্তর্জাতিক মহলে বিবৃতি দিয়ে একটা চাপ সৃষ্টি করতে পারে পরবর্তীতে।

যদিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইরানকে প্রায়ই রাশিয়া ও চীনকে শক্তির ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু বাস্তব কৌশলগত কাঠামোর মধ্যে দাঁড়িয়ে সম্পর্কটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা শূন্য।

এর পেছনে কারন হিসাবে রয়েছে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা কাঠামো, পারমাণবিক প্রতিরোধ নীতি, জোট রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় ভাবে টিকে থাকা সেই সাথে মূল কারন নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হুমকীর মধ্যে না ফেলা।

আধুনিক বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার এমন এক সিদ্ধান্ত, যার অর্থ পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক নীতি কাজ করে। রাষ্ট্র কেবল তখনই পারমাণবিক প্রতিশোধ নেয়, যখন তার নিজের অস্তিত্ব সরাসরি হুমকির মুখে পড়ে।

ইরানে পারমানবিক হামলার ক্ষেত্রে এই শর্তগুলোর কোনোটিই রাশিয়া বা চীনের জন্য প্রযোজ্য নয়। ইরান তাদের কৌশলগত অংশীদার হলেও, সে ধরনের আনুষ্ঠানিক সামরিক দায়বদ্ধতা রাশিয়া ও চীনের নেই। যা আক্রমণের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রতিশোধের কারণ সৃষ্টি করবে না। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি পারমাণবিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া, যার ফলাফল কোনো পক্ষের জন্যই সুখকর নয়।

এদিকে চীনের অবস্থান আরও লজ্জাবতী গাছের মত। যদিও ইরানকে তারা বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করছে। কিন্তু তারা এমন দেশ “ধরি মাছ না ছুঁই পানি” টাইপের।

নিজদের বিশ্বের এক নম্বর করার লড়াইয়ে ব্যস্ত, প্রযুক্তির শীর্ষে থেকে বিশ্বকে নিয়ন্ত্রন করার মিশনে ব্যস্ত। এমন সময় আরেক দেশের জন্য পরমাণু যুদ্ধে জড়িয়ে তা বিসর্জন দিবে না। চীনের অর্থনীতি গভীরভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ তার শিল্প উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ফলে পারমাণবিক সংঘাতে জড়িয়ে গেলে চীন সরাসরি লাভবান হওয়ার পরিবর্তে বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে পড়বে। এই বাস্তবতা চীনকে পারমাণবিক প্রতিশোধের মতো সিদ্ধান্ত থেকে দূরে রাখবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পারমাণবিক যুদ্ধে জড়ানো মানে শুধু ইরানের পক্ষ থেকে বদলা নেয়া নয়, বরং বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করা। যদি রাশিয়া বা চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পারমাণবিক হামলা চালায়, তাহলে সেটি আর ইরানকে ঘিরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা দ্রুত একটি বৃহত্তর শক্তির সংঘাতে রূপ নেবে, যেখানে অন্যান্য শক্তিধর রাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়তে পারে।

এই ধরনের সংঘাতের পরিণতি যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে। ফলে পরের স্বার্থের জন্য রাশিয়া বা চীন এ ঝামেলায় জড়াবে না, এক্ষেত্রে কোন মুসলমান দেশের জন্যতো অবশ্যই না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে রাশিয়া বা চীন কোনো প্রতিক্রিয়াই দেখাবে না। বরং তারা সম্ভবত কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তার মাধ্যমে পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে চাপ সৃষ্টি, আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য পরিবর্তনের উদ্যোগ এসবই সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার অংশ হতে পারে। এগুলো সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নয়, কিন্তু বাস্তব কৌশলগত প্রতিরোধের অংশ।

সবাই জানি, বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের সাথে যুদ্ধে জাড়িত আছে। রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ শুধুমাত্র কিন্তু ইউক্রেনের সাথে হচ্ছে না বরং ইউক্রেনের পিছনে গোটা ইউরোপ ও ন্যাটো জড়িত। ইরান যুদ্ধে ইউরোপ ও ন্যাটো সরাসরি জড়াচ্ছে না তার একটা কারন হচ্ছে সেক্ষেত্রে পক্ষান্তরে ইরান যুদ্ধে রাশিয়াকে মধ্যপ্রচ্যে সরাসরি আমন্ত্রন জানানো হয়।

দুইদিক থেকে একসাথে যুদ্ধ ইউরোপের জন্য বিরাট লোকসানের কারন হবে। আর রাশিয়াও যদি নিজ থেকে মধ্যপ্রচ্যে আসে তাহলে ইউরোপও আসতে বাধ্য হবে। তাই উভয়পক্ষ না এসে ব্যলেন্স রাখার চেষ্টা করছে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রতিটি বড় সংঘাতই কিছু রাষ্ট্রের জন্য সুযোগ তৈরি করে। ইরান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে একধরনের প্রাণ সঞ্চার হয়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের ফলে বিশ্বের হিলিয়াম বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। কাতারের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকটের মুখে পড়েছে ‘চিপ’ উৎপাদন শিল্প।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া তাদের বিশাল হিলিয়াম মজুত ব্যবহার করে চীনসহ নতুন বাজার দখল ও উচ্চমূল্যের সুবিধা নিয়ে নিজেদের অর্থনীতি শক্তিশালী করার পথে রয়েছে। শুধু হিলিয়াম নয়, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের বৈশ্বিক সরবরাহে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তাতেও রাশিয়া ব্যাপকভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে।

একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র যদি একাধিক অঞ্চলে সামরিকভাবে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে ইউরোপ বা এশিয়ার অন্যান্য কৌশলগত অঞ্চলে রাশিয়া ও চীন তুলনামূলক বেশি স্বাধীনভাবে কৌশল প্রয়োগ করার সুযোগ পাচ্ছে।

চীনের ক্ষেত্রে লাভের কাঠামো আরও দীর্ঘ মেয়াদি। চীন চায় এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ ও শক্তি ক্ষয় করুক, কারণ বর্তমানে এই যুদ্ধের পেছনে আমেরিকার প্রতিদিন ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় জ্বালানি আমদানিতে সমস্যা হলেও চীনের হাতে প্রায় ১শ ৩০ কোটি ব্যারেল তেলের বিশাল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে তারা অনায়াসেই চার মাস চলতে পারবে। যুক্তরাষ্ট্র যদি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ সময় ধরে জড়িত থাকে, তাহলে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তার মনোযোগ আংশিকভাবে কমে যায়।

এই পরিস্থিতি চীনের আঞ্চলিক কৌশল বাস্তবায়নের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় বিকল্প মুদ্রা ও বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রসার ঘটানোর ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সবকিছু মিলিয়ে দেখা যায়, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক হামলা চালালেও রাশিয়া বা চীনের সরাসরি পারমাণবিক প্রতিশোধ নেওয়ার সম্ভাবনা বাস্তবিক অর্থে নেই। কারণ এই ধরনের সিদ্ধান্ত কোনো একক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়, বরং তা পুরো বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো একটি পদক্ষেপ। ফলে তারা সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে পরিস্থিতিকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করার পথই বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

ইরানের এই যুদ্ধ শুধুমাত্র ইরান ও মুসলমানদের। আর বাকি যারাই আছে তারা এ যুদ্ধ থেকে তাদের স্বার্থ হাছিলের কাজে ব্যস্ত। (লেখক-নূর জুফিকার)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ