ব্রাহ্মণবাড়িয়া আ.লীগের কার্যালয়ের ফ্লোর বিক্রি!
- আপডেট সময় : ০৫:২৮:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৫ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০০১ বার পড়া হয়েছে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া আ.লীগের কার্যালয়ের ফ্লোর বিক্রি!
আস্থা ডেস্কঃ
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর থেকেই নীরব ব্রাহ্মণবাড়িয়া আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কেউ পলাতক, কেউবা জেলে। এবার সামনে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য– ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের অফিসের জন্য কেনা ফ্লোর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে!
মামলা/মোকদ্দমাসহ নানাভাবে বিপাকে থাকা দলের নেতাকর্মীদের সহায়তা দেওয়ার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের অফিস বিক্রি করা হয়েছে। তবে নেতাকর্মীদের কেউ এ সহায়তা পেয়েছে বলা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
গত ২০ মাসে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে আওয়ামী লীগের কর্মী সমর্থকদের ঝটিকা মিছিলসহ ছোটখাট কর্মসূচিতে সক্রিয় হওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এখানে আওয়ামী লীগের নামে শব্দও হয়নি।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর যখন অনেক জায়গায় আওয়ামী লীগের অফিস খোলার চেষ্টা করা হলেও, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গোপনে দলের অফিসের জন্য কেনা ফ্লোর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনা বেশ কয়েক মাস আগের হলেও দলের নেতাকর্মীদের ম্যাসেঞ্জার-হোয়াটসআপ গ্রুপে তা চাপা ছিল। বর্তমানে তারপ প্রকাশ্যে এসেছে।
মামলা/মোকদ্দমার খরচ মেটাতে, অসহায় এবং জেলে থাকা নেতা/কর্মীদের সহায়তা দিতে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ কয়েকজন নেতা অফিস বিক্রি করার উদ্যোগ নেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ওই নেতারা অফিস বিক্রি করার কথা সরাসরি স্বীকার করছেন না।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই আত্মগোপনে চলে যান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় দলটির সব পর্যায়ের পদধারী নেতারা। দলের সংসদ সদস্য, জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আসামি করে একের পর এক মামলা হয়েছে।
এরপর ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হলে অনেকটাই চাপা পড়ে দলের নামধাম। ৫ আগস্টের পর জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা একে–অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। কেউ কারও খোঁজখবরও করেননি।
জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক, সাবেক মন্ত্রী ক্যাপ্টেন (অব.) এ বি তাজুল ইসলাম, দলের সংসদ সদস্য ফয়জুর রহমান বাদল, উম্মে ফাতেমা নাজমা বেগম (শিউলী আজাদ), জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ডা. আবু সায়ীদসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের আরও অনেক নেতা আটক হয়ে কারান্তরীণ হন।
এ অবস্থায় গত ৮/১০ মাস আগে শহরের মৌলভীপাড়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের নতুন ভবন ও কমার্শিয়াল কাম শপিং কমপ্লেক্স মার্কেটে, যা সমবায় মার্কেট হিসেবে পরিচিত সেখানে থাকা ৩টি দোকান বিক্রি করে দেওয়া হয়। এসব দোকানের ফ্লোর আওয়ামী লীগের কার্যালয় করার জন্য কেনা হয়েছিল।
ব্যাংক সুত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ২৪ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের সঙ্গে মার্কেটের প্রথম তলার ২২৪, ২২৫ ও ২২৬ নং দোকান বরাদ্দের চুক্তি স্বাক্ষর হয়। একেকটি দোকানের জন্য ১১ লাখ ৮৩ হাজার ৩শ ৫০ টাকা পরিশোধ করা হয়।
চুক্তিপত্রে ব্যাংকের পক্ষে স্বাক্ষর করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের সভাপতি শেফালী বেগম ও প্রিন্সিপাল কর্মকর্তা মোঃ সোহরাব উদ্দিন।
দলীয় সূত্র জানায়, জেলা আওয়ামী লীগের নিজস্ব কোনো কার্যালয় না থাকায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে ওই মার্কেটে দলের স্থায়ী কার্যালয় করার জন্য ওই ৩টি দোকান দলীয় সিদ্ধান্তে কেনা হয়। অবশ্য আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগ পর্যন্ত শহরের হলদারপাড়ায় সংসদ সদস্যের দলীয় কার্যালয় থেকেই দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল।
সরজমিনে দেখা গেছে, সমবায় মার্কেটের প্রথম তলার পশ্চিম দিকের সারিতে ৩টি দোকানের একটিতে স্টুডেন্ট গার্মেন্টস, অপর একটিতে বিশাল সুটিং সেন্টার ও অন্যটিতে স্টার টেইলার্স প্রাইভেট লিমিটেড নামে কাপড় সেলাইয়ের ৩টি দোকান রয়েছে।
স্টার টেইলার্সের স্বত্বাধিকারী সালাম চৌধুরী বলেন, দোকান ৩টির মালিক এখন তিনি। ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর মৃত্যুবরণকারী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারের কাছ থেকে ৫ বছর আগে এগুলো কিনেছি।
তবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কয়েক মাস আগে শহরের খৈয়াসার এলাকার ব্যবসায়ী কামরুল ইসলামের মধ্যস্থতায় দোকান ৩টি ৬৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়।
ব্যবসায়ী বলেন, সদর উপজেলার সুলতানপুর গ্রামের তার এক আত্মীয় দোকানগুলো নিয়েছেন। তার মাধ্যমেই লেনদেন হয়েছে। ৬৫ লাখ টাকায় দোকান ৩টি কেনা হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়েছে।
কামরুল ইসলাম বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি একটি রেজুলেশন করে তাতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হেলাল ভাই ও সাধারণ সম্পাদক মন্টু ভাই স্বাক্ষর করে দেন। তবে দোকানের দখল এখনো বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। এর আগে, দোকান বিক্রির বিষয়ে ঢাকার উত্তরায় আমার ভাইয়ের বাসায় আওয়ীমী লীগ নেতাদের আলোচনা হয়।
তবে জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল নেতারা দোকান বিক্রি আলাপ-আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন বলেন, দোকানগুলো সেল করার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, ঢাকায় একটা মিটিং করে দোকানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেজুলেশন করা হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সমবায় ব্যাংক লিমিটেডের নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, পার্টির নামেই দোকানগুলো বরাদ্দ নেওয়া। মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে বলে আমার জানা নেই। মালিকানা পরিবর্তন হতে হলে আমার স্বাক্ষর লাগবে। ম্যানেজিং কমিটির স্বাক্ষর লাগবে। ব্যাংকের উপদেষ্টা হিসেবে ইউএনও সাহেবের স্বাক্ষর লাগবে।
তিনি আরও বলেন, সহকারী কমিশনার-ভূমি হচ্ছেন ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কমিটির অন্তবর্তীকালীন সভাপতি। মালিকনা হস্তান্তর করতে হলে নির্ধারিত ফি আছে তা জমা দিয়ে আবেদন করে অনুমতি নিতে হয়। বর্তমানে ইউএনও স্যার এডহক কমিটির সভাপতি হওয়ার পর থেকে হস্তান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। আমি যেহেতু সিগন্যাচার করেনি এটা বৈধ কিছু নয়।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ

















