ঢাকা ০৪:৪০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬, ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য: চলছে নতুন নিরাপত্তা আলোচনা

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৩:০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
  • / ১০২৫ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য: চলছে নতুন নিরাপত্তা আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং যুদ্ধের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরানকে মোকাবিলায় তারা এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে এখন প্রতিদিনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মধ্যে বসবাস করতে হবে। যুদ্ধের সময় তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধের শিকারে পরিণত হয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ দিয়ে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরান শর্ত দিয়েছে, যুদ্ধের সময় দখল করা এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তারা ছাড়বে না। এটি তেহরানকে যখন খুশি উপসাগরীয় দেশগুলোর টুঁটি চেপে ধরার ক্ষমতা দেবে। ধরাণা করা হচ্ছে, শনিবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় এই বিষয়টি হবে সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা।

এদিকে ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। অন্যদিকে কিছু দেশ তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে শান্তি চায়।

গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরব ও ইরান যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আলোচনা করেছেন।

অপর দিকে আমিরাত থেকে ইরানের লাভান দ্বীপের তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদর মুসা আল-সাইফ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত তুরস্কের মতো উদীয়মান শক্তির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো।

যুদ্ধ বিরতির পরও হরমুজে অনিশ্চয়তা—উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ যুদ্ধ বিরতির পরও হরমুজে অনিশ্চয়তা—উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

ইতিমধ্যে এই দিকে কিছু অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।

এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে গত মার্চে একটি নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। অনেকে এই জোটকে মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাদের প্রধান শত্রু ইরান নাকি ইসরায়েল, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্যও এই নতুন নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইতিমধ্যে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আমিরাতের অধ্যাপক আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ বলেন, ইরান যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে এবং আমিরাতের মতো অন্য দেশগুলোও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কারণ, গত ৪০ দিনে ইরান এখন এই দেশগুলোর কাছে ‘এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির লোহিত সাগরে বন্দর ও তেলের পাইপলাইন থাকায় এবং জ্বালানি অবকাঠামো খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে বিশাল পুনর্গঠন ব্যয় দেশটির ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ইরান তাদের লক্ষ্য করে ২ হাজার ২৫৬টি ড্রোন এবং ৫৬৩টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যদিও তারা এর ৯০ শতাংশই আকাশপথে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত মার্কিন সুরক্ষা পুরোপুরি ছাড়বে না, তবে তারা এর ওপর আরও কয়েক স্তরের অংশীদারত্ব (বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে) যুক্ত করবে।

তারা এখন বন্দর রক্ষা, ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট (লোনাপানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট) এবং বিকল্প রপ্তানি রুট তৈরিতে বেশি বিনিয়োগ করবে। তাঁর মতে, মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন আর ঢাল নয়, বরং এগুলো এখন বিপদের আগামসংকেত বা ট্রিপওয়ায়ার হিসেবে কাজ করছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য: চলছে নতুন নিরাপত্তা আলোচনা

আপডেট সময় : ০৩:০৪:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া থেকে বেরোতে চায় মধ্যপ্রাচ্য: চলছে নতুন নিরাপত্তা আলোচনা

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে। বিধ্বস্ত অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং যুদ্ধের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইরানকে মোকাবিলায় তারা এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে নতুন নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।

বিশ্লেষকদের মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোকে এখন প্রতিদিনই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকির মধ্যে বসবাস করতে হবে। যুদ্ধের সময় তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের পাল্টা হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল। এর ফলে এই দেশগুলো সরাসরি যুদ্ধের শিকারে পরিণত হয়।

সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হরমুজ প্রণালি। এই জলপথ দিয়ে অধিকাংশ উপসাগরীয় দেশের বাণিজ্য পরিচালিত হয়। যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ইরান শর্ত দিয়েছে, যুদ্ধের সময় দখল করা এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তারা ছাড়বে না। এটি তেহরানকে যখন খুশি উপসাগরীয় দেশগুলোর টুঁটি চেপে ধরার ক্ষমতা দেবে। ধরাণা করা হচ্ছে, শনিবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় এই বিষয়টি হবে সবচেয়ে বড় বিরোধের জায়গা।

এদিকে ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পক্ষে। অন্যদিকে কিছু দেশ তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের মাধ্যমে শান্তি চায়।

গত বৃহস্পতিবার সৌদি আরব ও ইরান যুদ্ধের পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আলোচনা করেছেন।

অপর দিকে আমিরাত থেকে ইরানের লাভান দ্বীপের তেল স্থাপনায় হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা আঘাত হেনেছে।

কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বদর মুসা আল-সাইফ বলেন, এমন পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোর উচিত তুরস্কের মতো উদীয়মান শক্তির সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানো।

যুদ্ধ বিরতির পরও হরমুজে অনিশ্চয়তা—উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ যুদ্ধ বিরতির পরও হরমুজে অনিশ্চয়তা—উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’।

ইতিমধ্যে এই দিকে কিছু অগ্রগতিও দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি আরব ও পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত ভারতের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারত্বের ঘোষণা দিয়েছে। ইরানি ড্রোন মোকাবিলায় সৌদি আরব, আমিরাত ও কাতার ইউক্রেনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।

এ ছাড়া সৌদি আরব, তুরস্ক, মিসর ও পাকিস্তানকে নিয়ে গত মার্চে একটি নতুন বলয় তৈরি হয়েছে। অনেকে এই জোটকে মুসলিম বিশ্বের ন্যাটো বলে অভিহিত করেছেন। তবে তাদের প্রধান শত্রু ইরান নাকি ইসরায়েল, তা নিয়ে অস্পষ্টতা রয়ে গেছে।

জানা গেছে, যুক্তরাজ্যও এই নতুন নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হতে পারে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ইতিমধ্যে সৌদি যুবরাজের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আমিরাতের অধ্যাপক আব্দুল খালেক আব্দুল্লাহ বলেন, ইরান যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরও গভীর করতে পারে এবং আমিরাতের মতো অন্য দেশগুলোও ইসরায়েলের সঙ্গে সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। কারণ, গত ৪০ দিনে ইরান এখন এই দেশগুলোর কাছে ‘এক নম্বর শত্রু’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সৌদি আরব বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। দেশটির লোহিত সাগরে বন্দর ও তেলের পাইপলাইন থাকায় এবং জ্বালানি অবকাঠামো খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত না হওয়ায় তারা দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে বিশাল পুনর্গঠন ব্যয় দেশটির ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকল্পে প্রভাব ফেলতে পারে।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটি জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় ইরান তাদের লক্ষ্য করে ২ হাজার ২৫৬টি ড্রোন এবং ৫৬৩টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। যদিও তারা এর ৯০ শতাংশই আকাশপথে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে।

কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো সম্ভবত মার্কিন সুরক্ষা পুরোপুরি ছাড়বে না, তবে তারা এর ওপর আরও কয়েক স্তরের অংশীদারত্ব (বিশেষ করে ইউরোপের সঙ্গে) যুক্ত করবে।

তারা এখন বন্দর রক্ষা, ওয়াটার ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট (লোনাপানি বিশুদ্ধকরণ প্ল্যান্ট) এবং বিকল্প রপ্তানি রুট তৈরিতে বেশি বিনিয়োগ করবে। তাঁর মতে, মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন আর ঢাল নয়, বরং এগুলো এখন বিপদের আগামসংকেত বা ট্রিপওয়ায়ার হিসেবে কাজ করছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ