যুদ্ধে বাজিতমাত করছে ইরান!
- আপডেট সময় : ০৩:৫৬:৩১ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৩ মার্চ ২০২৬
- / ১০০১ বার পড়া হয়েছে
যুদ্ধে বাজিতমাত করছে ইরান!
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাতে ইরান চীনের স্যাটেলাইটভিত্তিক ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা ব্যবহার করছে বলে ধারণা করছেন গোয়েন্দা বিশেষজ্ঞরা। এ নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আল জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের সাবেক বৈদেশিক গোয়েন্দা পরিচালক আলাইন জুইলেট চলতি সপ্তাহে ফ্রান্সের স্বাধীন পডকাস্ট টোকসিনকে বলেন, ‘গেল বছর জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা অনেক বেশি নির্ভুল হয়ে উঠেছে। সম্ভবত চীন ইরানকে ‘বেইডু’ স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার প্রবেশাধিকার দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিস্ময়ের একটি হলো- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আট মাস আগের যুদ্ধের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল। এতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা ব্যবস্থাকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠছে।’
২০০২ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের বৈদেশিক নিরাপত্তা মহাপরিচালকের গোয়েন্দা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জুইলেট। সাবেক এ ফ্রান্সের বৈদেশিক নিরাপত্তা মহাপরিচালকের গোয়েন্দা প্রধান বলেন, ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা বাড়ার পেছনে চীনের ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার ব্যবহার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে।
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানের শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়ার পর ইরান ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোর দিকে শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলো এসব ক্ষেপণাস্ত্রের অনেকগুলো প্রতিহত করতে পারলেও কিছু প্রতিরক্ষা ভেদ করে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনা ঘটিয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে তাদের মালিকানাধীন গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম বা জিপিএসের প্রবেশাধিকার বন্ধ করতে পারে বা সংকেত বিঘ্নিত করতে পারে, যেটির ওপর আগে ইরানের সামরিক বাহিনী নির্ভর করত। তবে যদি ইরান চীনের ‘বেইডু’ ব্যবহার করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে সেই সংকেত বাধাগ্রস্ত করা কঠিন। যদিও ইরান এখনও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
বেইডু ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ব্যবস্থা কী
চীন ২০২০ সালে তাদের সর্বশেষ স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা চালু করে, যা জিপিএসের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হয়। একই বছরের জুলাই মাসে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে এক অনুষ্ঠানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আনুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যবস্থা উদ্বোধন করেন।
১৯৯৬ সালের তাইওয়ান সংকটের পর চীন নিজস্ব ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেয়। কারণ বেইজিং আশঙ্কা করেছিল, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন জিপিএস ব্যবহারের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে পারে। চীনের সরকারি বেইডু ওয়েবসাইটের ভাষায়, এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো বিশ্বকে সেবা দেয়া এবং মানবজাতির উপকার করা।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার তুলনায় বেইডু অনেক বেশি স্যাটেলাইট ব্যবহার করে। আল জাজিরার তথ্য বিশ্লেষণ ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জিপিএস ব্যবস্থায় ২৪টি স্যাটেলাইট রয়েছে, আর চীনের ব্যবস্থায় রয়েছে ৪৫টি।
বিশ্বের অন্য দুটি বড় ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা হলো রাশিয়ার গ্লোনাস এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও, যেগুলোতেও ২৪টি করে স্যাটেলাইট রয়েছে। বেইডু ব্যবস্থায় তিনটি প্রধান অংশ রয়েছে- মহাকাশ অংশ, স্থল অংশ এবং ব্যবহারকারী অংশ।
চীনের বেইডু ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, স্থল অংশে বিভিন্ন ধরনের গ্রাউন্ড স্টেশন রয়েছে, যেমন- প্রধান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র, সময় সমন্বয় ও আপলিংক স্টেশন, পর্যবেক্ষণ স্টেশন এবং আন্তঃস্যাটেলাইট সংযোগ পরিচালনার জন্য বিভিন্ন অপারেশনাল সুবিধা।
ব্যবহারকারী অংশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বেইডু পণ্য, সিস্টেম ও সেবা, যেমন- চিপ, মডিউল, অ্যান্টেনা, টার্মিনাল, অ্যাপ্লিকেশন সিস্টেম এবং অন্যান্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রযুক্তি।
অন্যান্য স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার মতো বেইডুও স্যাটেলাইট থেকে সময় সংকেত পাঠায়, যা মাটিতে বা যানবাহনে থাকা রিসিভার গ্রহণ করে। একাধিক স্যাটেলাইট থেকে সংকেত পৌঁছাতে কত সময় লাগছে তা মেপে রিসিভার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নির্ণয় করে।
বেইডু ব্যবহার কীভাবে লক্ষ্যে নিঁখুত আঘাত করে
বেইডু ব্যবস্থার সাহায্যে ইরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রকে আগের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালনা করতে পারে। এতদিন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রধানত জড়গত ন্যাভিগেশন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত। এই ব্যবস্থায় জাইরোস্কোপ ও অ্যাক্সেলরোমিটারের মতো সেন্সরের মাধ্যমে গতি ও ত্বরণ পরিমাপ করে অস্ত্রের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এতে বাইরের সংকেতের ওপর নির্ভরতা কম থাকে।
তবে এই ব্যবস্থার একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে—ছোট ছোট পরিমাপগত ত্রুটি সময়ের সঙ্গে জমা হতে থাকে এবং দীর্ঘ দূরত্বে নির্ভুলতা কমে যায়। স্যাটেলাইট ন্যাভিগেশন সেই সমস্যার সমাধান করতে পারে।
ব্রাসেলস-ভিত্তিক সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এলিজা ম্যাগনিয়ার বলেন, ‘সাধারণত ক্ষেপণাস্ত্র জড়গত ন্যাভিগেশন দিয়ে প্রধান পথ ধরে রাখে, আর স্যাটেলাইট সংকেত ব্যবহার করে পথ সংশোধন করে এবং লক্ষ্যভেদ আরও নির্ভুল করে। এতে নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একাধিক ন্যাভিগেশন ব্যবস্থা একসঙ্গে ব্যবহার করলে সংকেত বিঘ্ন বা জ্যামিংয়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ে।’
তিনি আরও জানান, যদি একটি স্যাটেলাইট ব্যবস্থার সংকেত বন্ধ হয়ে যায়, অন্য ব্যবস্থা তখনও কাজ করতে পারে। তাছাড়া বেশি স্যাটেলাইট থেকে সংকেত পাওয়া গেলে অবস্থান নির্ণয়ের নির্ভুলতাও বাড়ে। বেইডু ব্যবস্থার ত্রুটির সীমা এক মিটারেরও কম হতে পারে। এটি লক্ষ্যবস্তু নড়াচড়া করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পথ সংশোধনও করতে পারে।
নেনসিনি বলেন, এটি বেসামরিক জিপিএস সংকেতের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল, কারণ যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক এনক্রিপ্টেড সংকেত প্রতিপক্ষদের দেয় না। এছাড়া গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল যে পশ্চিমা জ্যামিং প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল, বেইডু সেই বাধাও অনেকাংশে এড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫ সালে জিপিএস সংকেত ব্যবহারকারী ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রকে ভুল স্থানাঙ্ক দেখিয়ে পথভ্রষ্ট করা হয়েছিল।
সামরিক বিশ্লেষক প্যাট্রিসিয়া মারিন্স বলেন, ‘বেইডু–৩ ব্যবস্থার সামরিক সংকেত কার্যত জ্যাম করা যায় না। এতে জটিল ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তন প্রযুক্তি এবং ন্যাভিগেশন বার্তা যাচাইকরণ ব্যবস্থার ব্যবহার রয়েছে, যা ভুয়া সংকেত বা প্রতারণামূলক স্থানাঙ্ক প্রতিরোধ করে।’
বেইডু ব্যবস্থায় একটি স্বল্প বার্তা যোগাযোগ সুবিধাও রয়েছে, যার মাধ্যমে ২ হাজার কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা যায়। এর ফলে প্রয়োজনে উৎক্ষেপণের পরও লক্ষ্যবস্তু পরিবর্তন করা সম্ভব।ৎ
ইরান কি সত্যিই বেইডু ব্যবহার করছে
ইরান এখনও বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। তাছাড়া গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের পর এত অল্প সময়ে সামরিক অভিযান সম্পূর্ণভাবে অন্য ন্যাভিগেশন ব্যবস্থায় স্থানান্তর করা সম্ভব কি না, সেটিও পরিষ্কার নয়। তবে ওই যুদ্ধের পর ইরানের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল যে দেশটি বিশ্বের সব বিদ্যমান সক্ষমতা ব্যবহার করে এবং কোনো একক প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না।
জুইলেট মনে করেন, চীনের বেইডু ব্যবস্থায় স্থানান্তরই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা বৃদ্ধির বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা হতে পারে। তিনি বলেন, ‘জিপিএসের পরিবর্তে চীনা ব্যবস্থা ব্যবহারের কথা শোনা যাচ্ছে, যা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা ব্যাখ্যা করে।’
তবে কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ইরান গত আট মাস নয়, বরং আরও অনেক আগে থেকেই চীনের ন্যাভিগেশন ব্যবস্থাকে সামরিক ব্যবস্থায় যুক্ত করার কাজ শুরু করেছিল। চীন–ইরান সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ এবং চায়নামেড প্রকল্পের গবেষক থিও নেনসিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘২০১৫ সালে ইরান বেইডু–২ ব্যবস্থাকে তাদের সামরিক অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার জন্য একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিল। এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল জিপিএসের বেসামরিক সংকেতের তুলনায় অনেক বেশি নির্ভুল সংকেত ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের নির্দেশনা উন্নত করা ‘
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল, কিন্তু ২০২১ সালের মার্চে চীন-ইরান সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পর এটি দ্রুততর হয়। নেনসিনি বলেন, ‘ওই সময় চীন ইরানকে বেইডুর এনক্রিপ্টেড সামরিক সংকেত ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। এরপর থেকে ইরানের সামরিক বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নির্দেশনায় এবং কিছু নিরাপদ যোগাযোগ নেটওয়ার্কে বেইডু ব্যবহার শুরু করে।’
কিছু বিশ্লেষক আগেই ধারণা দিয়েছিলেন যে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ইসরায়েলের ওপর ইরানের প্রথম ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেইডু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ সেই হামলার লক্ষ্যভেদ ক্ষমতা ছিল অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। ধারণা করা হয়, ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান পুরোপুরি বেইডু ব্যবস্থায় রূপান্তর সম্পন্ন করে। সেই সময় জিপিএস সংকেত বিঘ্নিত হওয়ার কারণে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, এমনকি বেসামরিক বিমান ও জাহাজ চলাচলেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল।
নেনসিনি বলেন, ‘ইরানের বেইদৌ ব্যবস্থার দিকে ঝোঁক দীর্ঘদিনের উদ্বেগের প্রতিফলন, যা ভবিষ্যৎ যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাদের সচেতনতার প্রমাণ।
আস্থা/এমএইচ




















