ঢাকা ১১:৫৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইরান যুদ্ধে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে বিশ্ব!

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬
  • / ৯৯৯ বার পড়া হয়েছে

ইরান যুদ্ধে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে বিশ্ব!

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

ইরানে চলমান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর একটি সমান্তরাল সংকট আসন্ন। খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য সারের আসন্ন ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার প্রতি সৃষ্টি হয়েছে এক বিরাট হুমকি।

বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য সারের বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। ফলে এই পথে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক কৃষি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় সারের কারখানাগুলো উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, কারণ সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।

এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য দেশেও। কাতারের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত তার তিনটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন কমিয়েছে। বাংলাদেশও পাঁচটির মধ্যে ৪টি সার কারখানা বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই সময়ে সারের সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ ঘাটতিতে রয়েছে।

সংকট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে দামের উল্লম্ফন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়া রপ্তানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন ৫০০ ডলারের নিচ থেকে ৭০০ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

শিপিং সেবা প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সার এবং ৪৬ শতাংশ ইউরিয়া উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া সরবরাহকারী কাতার ফার্টিলাইজার কম্পানি (কিউএএফসিও) একাই বিশ্বের ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে।

ডেটা প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক সারের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।

২০২৪ সালের হিসেবে এশিয়ার দেশগুলো উপসাগরীয় সার রপ্তানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল—ইউরিয়ার ৩৫ শতাংশ, সালফারের ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ৬৪ শতাংশ এ অঞ্চলে যায়।

ভারত, ব্রাজিল ও চীন—এই ৩টি বড় কৃষিভিত্তিক দেশ বিশেষভাবে নির্ভরশীল। এছাড়া মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি হয়।

ভারত তার ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আমদানিনির্ভর, যার প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।

এই সংকটের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উত্তর গোলার্ধে বপন মৌসুমের মাঝামাঝি—যা সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত চলে। বাণিজ্যিক কৃষিতে প্রায় সব ফসলের ভালো ফলনের জন্য সার অপরিহার্য। কিন্তু সারের অভাবে অনেক কৃষক তা ব্যবহার কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন।

এর আগে থেকেই বিশ্ব ইউরিয়া সংকটে ছিল, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ সস্তা রুশ গ্যাসের সরবরাহ হারিয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেয়। একই সময়ে চীনও নিজস্ব কৃষকদের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সার রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

ভারত বিশ্বে চাল, গম, ডাল ও ফলের বড় উৎপাদক। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক চাল রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতের ছিল। ব্রাজিল বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ সয়াবিন রপ্তানি করে, পাশাপাশি চিনি ও ভুট্টাও রপ্তানি করে। চীন চা, রসুন, মাশরুমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বড় উৎপাদক।

ফলে দীর্ঘমেয়াদি সার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য করতে পারে, যার ফলে চাল, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে, বাড়তে পারে খাদ্যের দাম এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে স্থানীয়ভাবে খাদ্যসংকটও দেখা দিতে পারে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

ইরান যুদ্ধে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে বিশ্ব!

আপডেট সময় : ১১:২৪:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধে ভয়াবহ খাদ্য সংকটের ঝুঁকিতে বিশ্ব!

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

ইরানে চলমান যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার কারণে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। যার ফলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারেরও বেশি হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর একটি সমান্তরাল সংকট আসন্ন। খাদ্য উৎপাদনের জন্য অপরিহার্য সারের আসন্ন ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তার প্রতি সৃষ্টি হয়েছে এক বিরাট হুমকি।

বিশ্বে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত ইউরিয়ার প্রায় অর্ধেক এবং অন্যান্য সারের বড় অংশ উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। ফলে এই পথে কোনো বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক কৃষি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ ও জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় উপসাগরীয় অঞ্চলসহ বিভিন্ন জায়গায় সারের কারখানাগুলো উৎপাদন বন্ধ বা কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, কারণ সার উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহৃত হয়।

কাতারের এলএনজি স্থাপনায় হামলার পর দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাতারএনার্জি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া উৎপাদন কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ করে দেয়।

এর প্রভাব পড়ে অন্যান্য দেশেও। কাতারের গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় ভারত তার তিনটি ইউরিয়া কারখানার উৎপাদন কমিয়েছে। বাংলাদেশও পাঁচটির মধ্যে ৪টি সার কারখানা বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রেও এই সময়ে সারের সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ ঘাটতিতে রয়েছে।

সংকট আরো বাড়িয়ে দিয়েছে দামের উল্লম্ফন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরিয়া রপ্তানির দাম প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে প্রতি মেট্রিক টন ৫০০ ডলারের নিচ থেকে ৭০০ ডলারের ওপরে পৌঁছেছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

শিপিং সেবা প্রতিষ্ঠান সিগন্যাল গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সার এবং ৪৬ শতাংশ ইউরিয়া উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইউরিয়া সরবরাহকারী কাতার ফার্টিলাইজার কম্পানি (কিউএএফসিও) একাই বিশ্বের ১৪ শতাংশ ইউরিয়া সরবরাহ করে।

ডেটা প্রতিষ্ঠান কেপলারের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক সারের এক-তৃতীয়াংশ বাণিজ্য ব্যাহত হতে পারে।

২০২৪ সালের হিসেবে এশিয়ার দেশগুলো উপসাগরীয় সার রপ্তানির ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল—ইউরিয়ার ৩৫ শতাংশ, সালফারের ৫৩ শতাংশ এবং অ্যামোনিয়ার ৬৪ শতাংশ এ অঞ্চলে যায়।

ভারত, ব্রাজিল ও চীন—এই ৩টি বড় কৃষিভিত্তিক দেশ বিশেষভাবে নির্ভরশীল। এছাড়া মরক্কো, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রপ্তানি হয়।

ভারত তার ইউরিয়া ও ফসফেট সারের ৪০ শতাংশের বেশি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। অন্যদিকে ব্রাজিল প্রায় সম্পূর্ণভাবেই আমদানিনির্ভর, যার প্রায় অর্ধেক হরমুজ প্রণালি দিয়ে আসে।

এই সংকটের সময়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি উত্তর গোলার্ধে বপন মৌসুমের মাঝামাঝি—যা সাধারণত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে মে মাসের শুরু পর্যন্ত চলে। বাণিজ্যিক কৃষিতে প্রায় সব ফসলের ভালো ফলনের জন্য সার অপরিহার্য। কিন্তু সারের অভাবে অনেক কৃষক তা ব্যবহার কমাতে বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারেন।

এর আগে থেকেই বিশ্ব ইউরিয়া সংকটে ছিল, যখন ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপ সস্তা রুশ গ্যাসের সরবরাহ হারিয়ে উৎপাদন কমিয়ে দেয়। একই সময়ে চীনও নিজস্ব কৃষকদের জন্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সার রপ্তানিতে সীমাবদ্ধতা আরোপ করে।

ভারত বিশ্বে চাল, গম, ডাল ও ফলের বড় উৎপাদক। ২০২৪ সালে বৈশ্বিক চাল রপ্তানির প্রায় এক-চতুর্থাংশই ভারতের ছিল। ব্রাজিল বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ সয়াবিন রপ্তানি করে, পাশাপাশি চিনি ও ভুট্টাও রপ্তানি করে। চীন চা, রসুন, মাশরুমসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যের বড় উৎপাদক।

ফলে দীর্ঘমেয়াদি সার সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের উৎপাদন কমাতে বাধ্য করতে পারে, যার ফলে চাল, গম, ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাবে। এর প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহে, বাড়তে পারে খাদ্যের দাম এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে স্থানীয়ভাবে খাদ্যসংকটও দেখা দিতে পারে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ