ঢাকা ১০:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬, ৮ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে মধ্যপাচ্য

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৯:১১:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬
  • / ১০০০ বার পড়া হয়েছে

যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে মধ্যপাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধের শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে বজ্রগতিতে ছুটে যাওয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের দিকে। সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতও হানে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছিল মাত্র ২ বছর আগে মার্কিন বাহিনীতে যুক্ত করা অত্যন্ত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার। এবং এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হচ্ছে। যদিও দেশগুলো অস্বীকার করেছে যে, তারা মার্কিন বাহিনীকে তাদের মাটি ব্যবহার করে হামলা করতে দিচ্ছে না।

এই প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল–পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত ছাড়াও অন্যান্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে তথাকথিত এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন জানান, এসব হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ এবং বন্দরে থাকা একটি সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো ‘ইতিহাস তৈরি করেছে।’ ইরান অভিযোগ করেছে, তাদের উপকূলের বাইরে অবস্থিত তেল প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা খারগ দ্বীপে আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

এই হামলাগুলো দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধ পরিকল্পনায় পেন্টাগন ক্রমশ স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এসেছে নতুন সংস্করণের অস্ত্র, যা মোবাইল বা চলমান হিমার্স ট্রাক লঞ্চার থেকে ছোড়া যায়। এই লঞ্চার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর দ্রুত স্থান বদলাতে পারে। ফলে ড্রোন যুদ্ধের যুগে এগুলোকে ধ্বংস করা কঠিন। মূলত বিমানযুদ্ধ হিসেবে বর্ণিত এই সংঘাতে স্থলভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তনের প্রতিফলনও। ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো বিদ্রোহ দমনমূলক যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র থেকে সরে এসে এখন তারা চীনের মতো বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এটিএসিএমএস-এর পূর্ণরূপ আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম। আর হিমার্স হলো হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেমের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা মূলত একটি সেনা ট্রাক এবং এতে রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী পরিবর্তনযোগ্য পড থাকে। এই স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা ২০০ থেকে ৩০০ মাইল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যেসব দেশ ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বড় অংশ সহ্য করেছে। তবে কোনো দেশই প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি যে তারা তাদের ভূমি বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে।

যেসব উপসাগরীয় দেশ এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে সহায়তা করছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে বলছে যে তারা সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘যদি আমেরিকানরা তাদের দেখাতে পারে যে (ইরানি রেজিম) শাসনব্যবস্থাকে শেষ করার একটি পথ আছে, তাহলে তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতায় ঝুঁকি নিতে আজকের চেয়ে বেশি প্রস্তুত হবে। তবে এই ব্যাপক যুদ্ধের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে না–ও বলবে না।’

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের কয়েকগুণ বেশি গতিতে উড়ে এবং অত্যন্ত নির্ভুল। লকহিড মার্টিন নির্মিত পিআরএসএম ও এটিএসিএমএস উভয়ই স্যাটেলাইটনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, ফলে স্থির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এগুলো বিশেষভাবে কার্যকর। সমুদ্রে চলমান জাহাজসহ গতিশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম সংস্করণও তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী এমন একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যার পাল্লা ১ হাজার মাইলের বেশি এবং যা শব্দের গতির পাঁচ গুণ বেগে চলতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক দিক ও ভিন্ন গতিপথ থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধবিমানগুলোকে চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের জন্য মুক্ত রাখা যায় এবং ভারী বোমারু বিমানগুলোকে শক্তভাবে সুরক্ষিত স্থাপনায় ব্যবহারের সুযোগ মেলে, যেগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে হিমার্স লঞ্চার দিয়েছিল, যাতে স্বল্পপাল্লার রকেট ও এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়। এসব অস্ত্র রুশ সীমান্তের ভেতরে কমান্ড সেন্টার, গোলাবারুদের মজুদ এবং জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছিল।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল শনিবার অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হিমার্স ব্যবহার করে খার দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমিরাত সরকার এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আত্মরক্ষার অধিকার আছে।’ তবে তিনি সরাসরি অভিযোগের জবাব দেননি।

যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্তত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হয়েছে বাহরাইন থেকে, যা উপসাগরের ওপারে ইরান থেকে মাত্র ১২৫ মাইল দূরে একটি ছোট রাজতন্ত্র শাসিত দেশ। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের এক মুখপাত্র ক্ষেপণাস্ত্র কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

বাহরাইন সরকারও এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি যে—তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড থেকে হামলার অনুমতি দিয়েছে কি না। এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাহরাইনের সশস্ত্র বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়নি।’ এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, বাহরাইন থেকে ইরানের দিকে হিমার্স নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা উইলিয়াম ওয়েশলার বলেন, ‘কোনো দেশ অনির্দিষ্টকাল হামলা সহ্য করে যেতে পারে না। সময়ের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সামরিক জবাব দেওয়ার চাপ বাড়বে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে পারে।’

তাত্ত্বিকভাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় এসব ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে, ফলে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যভেদ করার সম্ভাবনা বেড়েছে।

পেন্টাগনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রদর্শনের আরেকটি সুবিধা আছে। এটি চীনসহ সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠায়। পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ইরানি জাহাজে আঘাত হানতে যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোই চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে ফিলিপাইনের মতো দ্বীপাঞ্চলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকে শত্রু জাহাজে আঘাত হানতে পারে। এতে চীনের জন্য তাইওয়ান প্রণালী পেরিয়ে আক্রমণকারী বাহিনী পাঠানো বা তাদের বিশাল নৌবাহিনী দিয়ে দ্বীপটি অবরোধ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা গ্রান্ট রামলি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে ‘চীনা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য নতুন একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।’(সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে মধ্যপাচ্য

আপডেট সময় : ০৯:১১:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ মার্চ ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রকে আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিচ্ছে মধ্যপাচ্য

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ

যুক্তরাষ্ট্র প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর মাটি ব্যবহার করে ইরানে হামলা চালিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

যুদ্ধের শুরুর দিকেই যুক্তরাষ্ট্র পারস্য উপসাগরের ওপর দিয়ে বজ্রগতিতে ছুটে যাওয়া ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে ইরানের দিকে। সেগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতও হানে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছিল মাত্র ২ বছর আগে মার্কিন বাহিনীতে যুক্ত করা অত্যন্ত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার। এবং এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো উপসাগরীয় দেশগুলো থেকেই এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ছোড়া হচ্ছে। যদিও দেশগুলো অস্বীকার করেছে যে, তারা মার্কিন বাহিনীকে তাদের মাটি ব্যবহার করে হামলা করতে দিচ্ছে না।

এই প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল–পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত ছাড়াও অন্যান্য আরও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে তথাকথিত এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্রও ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান ড্যান কেইন জানান, এসব হামলায় ইরানের নৌবাহিনীর জাহাজ এবং বন্দরে থাকা একটি সাবমেরিন ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি গত সপ্তাহে বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলাগুলো ‘ইতিহাস তৈরি করেছে।’ ইরান অভিযোগ করেছে, তাদের উপকূলের বাইরে অবস্থিত তেল প্রক্রিয়াকরণ স্থাপনা খারগ দ্বীপে আঘাত হানতে যুক্তরাষ্ট্র ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে।

এই হামলাগুলো দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধ পরিকল্পনায় পেন্টাগন ক্রমশ স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে এসেছে নতুন সংস্করণের অস্ত্র, যা মোবাইল বা চলমান হিমার্স ট্রাক লঞ্চার থেকে ছোড়া যায়। এই লঞ্চার ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার পর দ্রুত স্থান বদলাতে পারে। ফলে ড্রোন যুদ্ধের যুগে এগুলোকে ধ্বংস করা কঠিন। মূলত বিমানযুদ্ধ হিসেবে বর্ণিত এই সংঘাতে স্থলভিত্তিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

এটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কৌশলে বড় পরিবর্তনের প্রতিফলনও। ইরাক ও আফগানিস্তানের মতো বিদ্রোহ দমনমূলক যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অস্ত্র থেকে সরে এসে এখন তারা চীনের মতো বৃহৎ শক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এটিএসিএমএস-এর পূর্ণরূপ আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম। আর হিমার্স হলো হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেমের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা মূলত একটি সেনা ট্রাক এবং এতে রকেট বা ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী পরিবর্তনযোগ্য পড থাকে। এই স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা ২০০ থেকে ৩০০ মাইল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ড থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে, যেসব দেশ ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বড় অংশ সহ্য করেছে। তবে কোনো দেশই প্রকাশ্যে স্বীকার করেনি যে তারা তাদের ভূমি বা আকাশসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে।

যেসব উপসাগরীয় দেশ এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে, তারা একদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে সহায়তা করছে, অন্যদিকে প্রকাশ্যে বলছে যে তারা সংঘাত থেকে দূরে থাকতে চায়। ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, ‘যদি আমেরিকানরা তাদের দেখাতে পারে যে (ইরানি রেজিম) শাসনব্যবস্থাকে শেষ করার একটি পথ আছে, তাহলে তারা প্রকাশ্যে বিরোধিতায় ঝুঁকি নিতে আজকের চেয়ে বেশি প্রস্তুত হবে। তবে এই ব্যাপক যুদ্ধের মধ্যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে না–ও বলবে না।’

এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শব্দের কয়েকগুণ বেশি গতিতে উড়ে এবং অত্যন্ত নির্ভুল। লকহিড মার্টিন নির্মিত পিআরএসএম ও এটিএসিএমএস উভয়ই স্যাটেলাইটনির্ভর নির্দেশনা ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, ফলে স্থির লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এগুলো বিশেষভাবে কার্যকর। সমুদ্রে চলমান জাহাজসহ গতিশীল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম সংস্করণও তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী এমন একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যার পাল্লা ১ হাজার মাইলের বেশি এবং যা শব্দের গতির পাঁচ গুণ বেগে চলতে পারে।

বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে একাধিক দিক ও ভিন্ন গতিপথ থেকে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করা ইরানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে। এতে যুদ্ধবিমানগুলোকে চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের জন্য মুক্ত রাখা যায় এবং ভারী বোমারু বিমানগুলোকে শক্তভাবে সুরক্ষিত স্থাপনায় ব্যবহারের সুযোগ মেলে, যেগুলো ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড দিয়ে ধ্বংস করা সম্ভব নয়।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র কিয়েভকে হিমার্স লঞ্চার দিয়েছিল, যাতে স্বল্পপাল্লার রকেট ও এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়। এসব অস্ত্র রুশ সীমান্তের ভেতরে কমান্ড সেন্টার, গোলাবারুদের মজুদ এবং জ্বালানি সরবরাহ কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হেনেছিল।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি গতকাল শনিবার অভিযোগ করেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে হিমার্স ব্যবহার করে খার দ্বীপে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমিরাত সরকার এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি। দেশটির পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আত্মরক্ষার অধিকার আছে।’ তবে তিনি সরাসরি অভিযোগের জবাব দেননি।

যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্তত কিছু ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ হয়েছে বাহরাইন থেকে, যা উপসাগরের ওপারে ইরান থেকে মাত্র ১২৫ মাইল দূরে একটি ছোট রাজতন্ত্র শাসিত দেশ। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনাকারী সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকমের এক মুখপাত্র ক্ষেপণাস্ত্র কোথা থেকে নিক্ষেপ করা হয়েছে তা বলতে অস্বীকৃতি জানান।

বাহরাইন সরকারও এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি যে—তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড থেকে হামলার অনুমতি দিয়েছে কি না। এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাহরাইনের সশস্ত্র বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে কোনো হামলা চালায়নি।’ এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছিল, বাহরাইন থেকে ইরানের দিকে হিমার্স নিক্ষেপ করা হয়েছে।

ওয়াশিংটনের আটলান্টিক কাউন্সিলের মধ্যপ্রাচ্য কর্মসূচির পরিচালক ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা উইলিয়াম ওয়েশলার বলেন, ‘কোনো দেশ অনির্দিষ্টকাল হামলা সহ্য করে যেতে পারে না। সময়ের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর সামরিক জবাব দেওয়ার চাপ বাড়বে। তবে সেই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দিতে পারে।’

তাত্ত্বিকভাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে সক্ষম হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলায় এসব ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে গেছে, ফলে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লক্ষ্যভেদ করার সম্ভাবনা বেড়েছে।

পেন্টাগনের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা প্রদর্শনের আরেকটি সুবিধা আছে। এটি চীনসহ সম্ভাব্য প্রতিপক্ষদের উদ্দেশে একটি বার্তা পাঠায়। পারস্য উপসাগরের ওপার থেকে ইরানি জাহাজে আঘাত হানতে যে ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোই চীনের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রশান্ত মহাসাগরে ফিলিপাইনের মতো দ্বীপাঞ্চলে মোতায়েন করা যুক্তরাষ্ট্রের মোবাইল ক্ষেপণাস্ত্র দূর থেকে শত্রু জাহাজে আঘাত হানতে পারে। এতে চীনের জন্য তাইওয়ান প্রণালী পেরিয়ে আক্রমণকারী বাহিনী পাঠানো বা তাদের বিশাল নৌবাহিনী দিয়ে দ্বীপটি অবরোধ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সিনিয়র ফেলো ও সাবেক পেন্টাগন কর্মকর্তা গ্রান্ট রামলি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে ‘চীনা সামরিক পরিকল্পনাকারীদের জন্য নতুন একটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।’(সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল)।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ