শিশু হত্যা: ইউনূস-নূরজাহানের বিচার চায় জনগণ
- আপডেট সময় : ০৬:৫৮:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
- / ১০০০ বার পড়া হয়েছে
শিশু হত্যা: ইউনূস-নূরজাহানের বিচার চায় জনগণ
অদিতি করিমঃ
আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অবহেলায় কারও মৃত্যু হলে সেটা হত্যাকাণ্ড। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আদালত এ সম্পর্কে কিছু ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের এ বিষয়ে আদেশ আছে।
১৯৯৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় একটি ডে কেয়ার সেন্টারে কেয়ার গিভারের অবহেলায় আগুন লাগে। সেখানে পাঁচ শিশু ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। শিশুদের অভিভাবকরা এটাকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে অভিহিত করে হত্যা মামলা করেন। আদালত দীর্ঘ শুনানির পর রায় দেন। তাতে বলা হয়, এটা অবহেলা নয়, হত্যাকাণ্ড।
লং আইল্যান্ডের গ্রেট নেক-এর ফরেস্ট রো-র লুম/২০ সালের ২ নভেম্বর অপরাধমূলকভাবে অবহেলাজনিত মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করে। দুটি কাউন্ট এবং কুইন্স সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি কেনেথ হোল্ডারের সামনে তৃতীয় ডিগ্রিতে একটি নিয়ন্ত্রিত পদার্থের ফৌজদারি বিক্রির অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন।
যুক্তরাজ্যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় শিশুর মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে ১৯৬৮ সাল থেকে। সেই সময় এক রায়ে বলা হয়, চিকিৎসার গাফিলতিকে অবহেলা বলা যায় না, এটা সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ।
এই রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে, ২০২০ সালের ১৫ জুন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগ এক ঐতিহাসিক রায় দেন। চিকিৎসায় অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হলে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে বলে জানান হাই কোর্ট। সে ক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন আদালত।
হাই কোর্টের বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন ভার্চুয়াল বেঞ্চ এই আদেশ দেন। করোনাকালীন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপনের আলোকে দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিক থেকে সাধারণ রোগীদের (নন-কভিড) ফিরিয়ে না দিয়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা চেয়ে করা রির্টের শুনানি শেষে হাই কোর্ট এ আদেশ দেন।
বাংলাদেশের আইনে অবহেলায় মৃত্যু তখন হত্যাকাণ্ড (Negligent Homicide) হিসেবে গণ্য হয়, যখন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের গুরুতর গাফিলতি, বেপরোয়া আচরণ বা দায়িত্বহীনতার ফলে কারও মৃত্যু ঘটে, যদিও তার সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না। বাংলাদেশে দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারা অনুযায়ী, বেপরোয়া বা অবহেলামূলক কাজের জন্য মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়। যেসব ক্ষেত্রে অবহেলায় মৃত্যু হত্যাকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয় :
চিকিৎসায় গাফিলতি (Medical Negligence) : চিকিৎসক বা হাসপাতালের দায়িত্বহীনতায় রোগীর মৃত্যু।
কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা : নির্মাণাধীন ভবন বা কারখানায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকায় শ্রমিক বা সাধারণের মৃত্যু।
বেপরোয়া যান চলাচল : দ্রুতগতি বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যা।
দায়িত্বে চরম অবহেলা (Gross Negligence) : যখন কোনো পেশাদার ব্যক্তি তার কাজের ক্ষেত্রে চরম দায়িত্বহীনতা প্রদর্শন করেন।
মূলত যে কাজটি মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে জেনেও তা করা হয়েছে বা নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কাজ চালানো হয়েছে, এমন মৃত্যুগুলোই আইনের চোখে অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ড।
হাম নিয়ে সৃষ্ট ভয়াবহ স্বাস্থ্য বিপর্যয়ের কারণ অনুসন্ধান করলে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের ইচ্ছাকৃত অবহেলা ও দায়িত্বহীন আচরণের কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি। চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দুই দশকে সর্বোচ্চ। এই সময়ে পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন। দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
ইপিআই কর্মসূচির শুরুতে ৬টি সংক্রামক রোগ-যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও ও হামের টিকা দেওয়া হতো। পরে হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, রুবেলা এবং নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া টিকাও যুক্ত করা হয় এ কর্মসূচিতে। ইপিআই শুরুর ৬ বছর পর ১৯৮৫ সালে দেশের মাত্র ২ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। ইপিআই কভারেজ ইভাল্যুয়েশন সার্ভে ২০১৯-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই হার এখন ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
চলতি বছর হাম বৃদ্ধির পেছনে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারকেই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেখান থেকে পিছিয়ে গেল দেশ।’
বাংলাদেশ প্রতিদিনের ৭ এপ্রিলের সংবাদের শিরোনাম ছিল ‘ইউনূসের অবহেলায় ১৩৮ শিশুর মৃত্যু’ প্রতিবেদনটিকে বলা হয়, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৩৮ শিশুর। প্রতিদিন হামের লক্ষণ নিয়ে সারা দেশের হাসপাতালে ভর্তি রোগী হাজার ছাড়িয়েছে। হাম আক্রান্ত রোগীদের সামাল দিতে হিমশিম অবস্থায় পড়েছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।’
ইউনিসেফসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে এই সংখ্যা আরও বেশি। প্রতিটি শিশুর মৃত্যুই দুঃখজনক। একটি সভ্য সমাজে এ ধরনের মৃত্যু কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। যে মা তার আদরের সন্তানকে হারিয়েছেন, তার কান্না কে থামাবে? যে পিতা তার কোলের শিশুকে কবরে শুইয়ে দিয়েছেন তার বুকফাটা আর্তনাদ কী আমরা শুনতে পাই। কোনো কিছুর বিনিময়েই তাদের ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়। তাদের শোকের একটাই সান্ত্বনা হতে পারে, তা হলো দায়ী ব্যক্তিদের বিচার। এই বেদনাদায়ক মৃত্যুর মিছিলের জন্য দায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম।
তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে ইপিআই কার্যক্রম অর্থাৎ টিকা কার্যক্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেন। এটা ভুল না অপরাধ। এটা অবহেলা নয় পরিকল্পিত হত্যা। এই হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারেন না সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। কোনো রকম যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শুধু তাঁর একান্ত ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে ইউনূস নুরজাহান বেগমকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা করেছিলেন। শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে অদক্ষতা, অযোগ্যতা এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বিভিন্ন মহল থেকে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার দাবি জানানো হয়। কিন্তু ড. ইউনুস তাঁকে সরানোর প্রয়োজনবোধ করেননি। তাই এই হত্যাকাণ্ডের দায় ইউনূসেরও। আইনের দৃষ্টিতে এই দুজন শিশু হত্যার দায়ে অভিযুক্ত।
ইতোমধ্যে ইউনূসের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন এক আইনজীবী। কিন্তু আইনি নোটিস যথেষ্ট নয়। মানবাধিকার ও আইনি অধিকার রক্ষায় কাজ করা সংগঠনগুলোর এখন দায়িত্ব শিশু হত্যার বিচারের দাবিতে সোচ্চার হওয়া। যেসব শিশু হাম উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তাদের পরিবারকে আইনি সহায়তা দেওয়া। প্রতিটি পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা এখন সময়ের দাবি। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এর কোনো বিকল্প নেই। শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় এটা আমাদের কর্তব্য। আইনের ভাষায় বলতে হয়, ইউনূস ও নুরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। এখনই তাঁদের গ্রেপ্তার করা উচিত।
লেখক: লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল: auditekarim@gmail.com














