সাইয়েদ কুতুব ইব্রাহিম হুসাইন: ইসলামী বিপ্লবের অগ্রপথিক
- আপডেট সময় : ০৩:৪৯:২৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০২৫ বার পড়া হয়েছে
সাইয়েদ কুতুব ইব্রাহিম হুসাইন: ইসলামী বিপ্লবের অগ্রপথিক
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
২৯শে আগস্ট ১৯৬৬ সালের আজকের এই দিনে তৎকালীন মিসরীয় সরকার কর্তৃক মৃত্যুদন্ড কার্যকরের মাধ্যমে শাহাদাত বরণ করেন, ইসলামি পুনর্জাগরণের অগ্রপথিক ও বৈশ্বিক ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের তাত্ত্বিক রাহবার সাইয়েদ কুতুব ইব্রাহিম হুসাইন। বিশ্বব্যাপী ইসলামি আন্দোলন ও রাজনীতির বিশ্লেষণে সাইয়্যেদ কুতুবের নাম এখনও সমৃদ্ধ।
ঊনিশ শতকের (১৯০৬ সালে) শুরুর দিকে জন্ম নেয়া সাইয়েদ কুতুব একজন কুরআনের হাফেজ ছিলেন। উচ্চতর পড়াশোনা করেন কায়রো দারুল উলুম ও আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে।
আমেরিকা থাকাকালীন তিনি পাশ্চাত্যের ভোগবাদী ও বস্তুবাদী শিক্ষার অসারতা ও নীচুতা অনুধাবন করেন। তখন তার দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে একমাত্র ইসলামই সত্যিকার অর্থে মানবসমাজকে কল্যাণের পথে নিয়ে যেতে পারে। এই অনুপ্রেরণা থেকেই তিনি পরে কলম ধরেন এবং হাসান আল বান্নার প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ব্রাদার হুডে যোগ দেয়ার মাধ্যমে ইসলামি রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তখন সংগঠনটি রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রবল চাপের মুখে ছিল। তবুও তার নিযুক্তির পর সংগঠনটিতে অভাবনীয় পরিবর্তন আসে। ওই সময় মিসরের মানুষ দলে দলে তাতে যোগ দিতে শুরু করে। তাদের বিশ্বাস, তাঁর কারণেই আবার এই সংগঠন বিপ্লবী রূপ ফিরে পায়। যার ফলে একসময় তিনি ব্রাদার হুডের একনিষ্ঠ ও নিষ্ঠাবান রাহবার হয়ে ওঠেন।
সাইয়েদ কুতুব একজন উঁচুমানের সাহিত্যিক হওয়ায় একসময় ব্রাদার হুড-পরিচালিত সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পান। দায়িত্ব পাওয়ার ছয় মাস পরেই ব্রিটেনের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সমালোচনা করায় মিসর সরকার জামাল আবদুন নাসের পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। তখন তাকেসহ হাজার হাজার ব্রাদার হুড সমর্থককে আটক করা হয় এবং তাকে ১৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়।
কারাবন্দি জীবনে তিনি সীমাহীন জুলুম নির্যাতনের শিকার হন। জেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই জেল কর্মচারীরা তাকে মারপিট করতে শুরু করে এবং দু’ঘণ্টা পর্যন্ত এ নির্যাতন চলতে থাকে। তারপর একটি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর তার ওপর লেলিয়ে দেয়া হয়। কুকুর তার পা কামড়ে ধরে জেলের আঙ্গিনায় টেনে নিয়ে বেড়ায়।
এরপর টানা ৭ ঘণ্টা তাকে জেরা করা হয়। তার স্বাস্থ্য এসব নির্যাতন সহ্য করার অবস্থা ছিল না। কিন্তু তার সুদৃঢ় ঈমানের বলে পাষাণ থেকে উচ্চারিত হতে থাকে: আল্লাহু আকবার ওয়া লিল্লাহিল হামদ।
এক বছর কারাভোগের পর নাসের সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হয় যে, তিনি সংবাদপত্রের মাধ্যমে ক্ষমার আবেদন করলে তাকে মুক্তি দেয়া যেতে পারে। এ প্রস্তাবের যে জবাবে বলেন, আমি এ প্রস্তাব শুনে অত্যন্ত আশ্চর্যান্বিত হচ্ছি যে, মজলুমকে জালিমের নিকট ক্ষমার আবেদন জানাতে বলা হচ্ছে। আল্লাহর কসম! যদি ক্ষমা প্রার্থনার কয়েকটি শব্দ আমাকে ফাঁসি থেকেও রেহাই দিতে পারে, তবু আমি এরূপ শব্দ উচ্চারণ করতে রাজি নই। আমি আল্লাহর দরবারে এমন অবস্থায় হাজির হতে চাই যে, আমি তাঁর প্রতি এবং তিনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট।
পরবর্তীকালে তাকে যতবার ক্ষমা প্রার্থনার পরামর্শ দেয়া হয়েছে ততবারই তিনি বলেন, ‘যদি আমাকে যথার্থই অপরাধের জন্য কারারুদ্ধ করা হয়ে থাকে, তাহলে আমি এতে সন্তুষ্ট আছি। আর যদি বাতিল শক্তি আমাকে অন্যায়ভাবে বন্দি করে থাকে, তাহলে আমি কিছুতেই বাতিলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করব না।
অবশেষে দীর্ঘ ১০ বছর কারাভোগের পর তিনি ইরাকের প্রেসিডেন্টের সুপারিশে মুক্তি লাভ করেন। এরপর ৮ মাসের মাথায় সরকার পতনের চক্রান্তে জড়িত থাকার মামলা দিয়ে তাকে আবার ১৯৬৫ সালের ২১ আগস্ট আটক করে সামরিক ট্রাইবুনালের পক্ষ থেকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। কার্যকর করা হয় ৮ দিন পর ২৯ আগস্ট ভোরে।
মৃত্যুদণ্ডের আগে সাইয়েদ কুতুবকে কালিমা পড়াতে একজন সরকারি মৌলভিকে জেলখানায় পাঠানো হয়। তিনি এই মৌলভিকে লক্ষ্য করে বলেন, ‘তোমার কালিমা তোমার রুটি যোগায় আর আমার কালিমা আমাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলায়।
তার কারাগারের দিনকাল সম্বন্ধে ঐতিহাসিক ইউসুফ আজম লিখেছেন, সাইয়েদ কুতুবের ওপর বর্ণনাতীত নির্যাতন চালানো হয়। আগুনে শরীর ঝলসে দেয়া হয়। পুলিশের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর লেলিয়ে দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থান রক্তাক্ত করা হয়। মাথার ওপর কখনো টগবগে গরম পানি ঢালা হয়। পরক্ষণে আবার খুবই শীতল পানি ঢেলে শরীর বরফের মতো ঠান্ডা করা হয়। পুলিশ লাথি, ঘুষি মেরে একদিক থেকে অন্য দিকে নিয়ে যেত।’
যেদিন তাকে ফাঁসি দেয়া হয়, সেদিন মিসরের পথে পথে তার রচিত তাফসির ‘ফি যিলালিল কুরআন’- এর প্রায় ৬৪ হাজার ভলিয়ম পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল। রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষণা করা হয়, যার কাছে সাইয়েদ কুতুবের গ্রন্থ পাওয়া যাবে তাকে ১০ বছর জেল হাজতে হবে।
আস্থা/এমএইচ























