ঢাকা ০২:০২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আটকের পর সামনে আসছে আয়াসের অপরাধ

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০১:০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
  • / ১০০৯ বার পড়া হয়েছে

আটকের পর সামনে আসছে আয়াসের অপরাধ

আস্থা ডেস্কঃ

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময়ে আলোচনায় না থাকলেও, হঠাৎ করে নিজেকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ রূপে পরিচয় এবং এই পরিচয়ের সূত্র ধরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে নানা সময় পার পেয়ে যাওয়া আ ন ম আয়াস এবার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন।

গত শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপনের ঘটনায় তাকে আটক করে পুলিশ। এর পর দেওয়া হয় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। এর আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়িতে মূত্রত্যাগ, নারী রাজনীতিক শান্তা ফারজানাকে মারধর এবং পরে নিজেও মার খাওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন স্বঘোষিত জুলাই যুদ্ধা আ ন ম আয়াস।

৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। সেখানে কেবল রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লেপন করা হয়।

জানা যায়, আয়াস এক সময় ময়মনসিংহ থাকতেন। পরে তিনি ঢাকায় এসে প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটা সংঘাতে জড়িয়ে। ওই দিন নতুন ধারা বাংলাদেশ (এনডিবি) এবং রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আয়াস নিজেও মারধরের শিকার হন।

এর আগে আয়াস জুলাই আন্দলন ও শহিদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে নতুন ধারা বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জেরে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে সংঘর্ষ হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শান্তা ফারজানাসহ কয়েকজনকে আয়াসের ওপর চড়াও হতে দেখা যায়। একপর্যায়ে আয়াস মাটিতে পড়ে গেলে তাকে পাইপ দিয়ে আঘাত করার দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা যায়।

অন্য একটি ভিডিওতে আয়াসকেও পাল্টা আঘাত করতেও দেখা যায়। পরে আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এ ঘটনার শুরু করলেও আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়। কিন্তু আয়াস পার পেয়ে যান।

এরপর আয়াস আবার আলোচনায় আসেন ১৫ আগস্ট। ওই দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে দেওয়া বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নেন। সেদিন সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ ও শিঙাড়া বিতরণের অভিযোগ তুলে তিন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়।

সেদিন দেখা যায়, আয়াসের নেতৃত্বে অবস্থান নেওয়া ওই ব্যক্তিরা তিনজনকে মারধর করেন। একপর্যায়ে এক রিকশাচালকের মুঠোফোন পরীক্ষা করে ভিডিওটি যুবলীগের একজনের কাছে পাঠানোর অভিযোগ তোলেন আয়াস। এরপর তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ওই রিকশাচালককে মারধর করেন।

ওই সময় আয়াস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারেন, সে জন্য তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। কাউকে পেলে পুলিশের কাছে তুলে দিচ্ছেন। সেখানে ‘মব’ সৃষ্টি করে লোকজনকে মারধরের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আয়াস দাবি করেছিলেন, তারা কোনো মব সৃষ্টি করছেন না। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছেন।

এর আগে গত বছরের ২৬ মে ময়মনসিংহে হামলার শিকার হয়েছিলেন আয়াস। ওই দিন নগরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় একদল ব্যক্তি আয়াসকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করেন। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আয়াস তখন জানিয়েছিলেন, পাঁচ থেকে ছয়জন যুবক তাকে ছুরি ঠেকিয়ে সড়কের নিচের দিকে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। পালানোর চেষ্টা করলে হাতে ও পায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।

গত ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায় আবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আয়াস বলেন, সংগঠনের কাজে সেখানে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ২০ জন নেতা-কর্মী তার ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর আয়াস নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় গিয়ে হামলার মৌখিক অভিযোগ করেন।

থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আয়াস প্রায় ১০ মিনিট থানায় অবস্থান করেন। তাকে পুলিশি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা নেননি।

জুলাই আন্দোলন ও শহিদদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে গত ৩ জুলাই অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও নতুন ধারা বাংলাদেশের শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আয়াসসহ তার সংগঠনের তিন ব্যক্তি। সংগঠনটির অভিযোগ ছিল, ওই তিন নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড করেছেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির সামনে আয়াসের একটি কর্মকাণ্ড নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়। তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে সাকিবের বাড়ির ফটকের সামনে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন আয়াস। ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় আয়াশসহ একদল লোক মাদারীপুরে এক প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে মব সৃষ্টি করেন। এই ঘটনায় বাড়ির লোকজন ঘরে তালা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

এদিকে, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটকের পর আয়াসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে আয়াসকে প্রতারক দাবি করে রাশেদ খাঁন বলেন, আটককৃত আয়াসের প্রকৃত নাম উজ্জ্বল এবং তার বাড়ি ময়মনসিংহে। ঢাকায় এসে নিজের নাম, চুলের স্টাইল ও চেহারা পরিবর্তন করে সে নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা আয়াস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তিনি আরও বলেন, আয়াস ওরফে উজ্জ্বল এর আগেও প্রতারণার একাধিক মামলায় জেল খেটেছে এবং সেই মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আয়াসদের ভাষা ব্যবহার খারাপ কেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, এই তাদের ভাষা খারাপ বলেই তারা এখনও টিকে রয়েছেন।

রবীন্দ্র-গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ৪ জনের বিরুদ্ধে করা মামলায় দণ্ডবিধির ১২০ (খ), ১৫৩ (ক) ও ২৯৫ (ক) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ধারাগুলোতে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার কথা রয়েছে।

পুলিশ আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডের জন্য যে আবেদন করেছে তাতে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়িয়ে ধর্মীয় অনুভূতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ১২০খ ধারা হলো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। কোনো অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে এ ধারায় মামলা হতে পারে। ষড়যন্ত্রের ধরন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তির ওপর দণ্ড নির্ভর করে। গুরুতর অপরাধের ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধে সহায়তার মতো শাস্তি হতে পারে।

অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধির ১৫৩ ক ধারা হলো বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানো। কথা, লেখা, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণা ছড়ানো কিংবা তা ছড়ানোর চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ২৯৫ ক ধারা হলো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। কোনো শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে কথা, লেখা বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে তাদের ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা কিংবা অপমানের চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে আইন অনুযায়ী, এসব ধারায় মামলা হওয়া মানেই আসামিরা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন।

আয়াসসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘তাদের এই কার্যক্রম সরকারের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করা। তারা বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমাদের যে সম্প্রীতির সংস্কৃতি, তারা তা বিনষ্ট করছেন। মবের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন।’ ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, তাদের কাজ হচ্ছে উন্নয়নে বাধা দেওয়া, ভাইরাল হওয়া। এ জন্য তারা গালাগাল করেন। ধর্মীয় উসকানি দিতে চেষ্টা করেন। তাদের পেছনে একটা চক্র আছে, সেটি জানা দরকার।

আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

আটকের পর সামনে আসছে আয়াসের অপরাধ

আপডেট সময় : ০১:০৯:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬

আটকের পর সামনে আসছে আয়াসের অপরাধ

আস্থা ডেস্কঃ

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের সময়ে আলোচনায় না থাকলেও, হঠাৎ করে নিজেকে ‘জুলাইযোদ্ধা’ রূপে পরিচয় এবং এই পরিচয়ের সূত্র ধরে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে নানা সময় পার পেয়ে যাওয়া আ ন ম আয়াস এবার রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযুক্ত হয়েছেন।

গত শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতিতে কালি লেপনের ঘটনায় তাকে আটক করে পুলিশ। এর পর দেওয়া হয় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা। এর আগে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঘটনা, ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়িতে মূত্রত্যাগ, নারী রাজনীতিক শান্তা ফারজানাকে মারধর এবং পরে নিজেও মার খাওয়া, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং নিজে হামলার শিকার হওয়াসহ নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনায় এসেছেন স্বঘোষিত জুলাই যুদ্ধা আ ন ম আয়াস।

৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচায় শিল্পকলা একাডেমির সামনের ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের প্রতিকৃতি আঁকা হয়। সেখানে কেবল রবীন্দ্রনাথের গ্রাফিতিতে কালি লেপন করা হয়।

জানা যায়, আয়াস এক সময় ময়মনসিংহ থাকতেন। পরে তিনি ঢাকায় এসে প্রথম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় আসেন ৪ আগস্ট জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে একটা সংঘাতে জড়িয়ে। ওই দিন নতুন ধারা বাংলাদেশ (এনডিবি) এবং রাষ্ট্র সংলাপ ফোরামের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় আয়াস নিজেও মারধরের শিকার হন।

এর আগে আয়াস জুলাই আন্দলন ও শহিদদের নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ তুলে নতুন ধারা বাংলাদেশ নামের একটি সংগঠনের ভাইস চেয়ারম্যান শান্তা ফারজানাকে চড় মেরেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনার জেরে দুই সংগঠনের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলাকালে সংঘর্ষ হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে শান্তা ফারজানাসহ কয়েকজনকে আয়াসের ওপর চড়াও হতে দেখা যায়। একপর্যায়ে আয়াস মাটিতে পড়ে গেলে তাকে পাইপ দিয়ে আঘাত করার দৃশ্যও ভিডিওতে দেখা যায়।

অন্য একটি ভিডিওতে আয়াসকেও পাল্টা আঘাত করতেও দেখা যায়। পরে আহত ব্যক্তিরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে সেখানেও দুই পক্ষের মধ্যে মারামারি হয়। এ ঘটনার শুরু করলেও আয়াসের ওপর হামলার অভিযোগে করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় নতুন ধারা বাংলাদেশের কয়েকজন নেতাকে আসামি করা হয়। কিন্তু আয়াস পার পেয়ে যান।

এরপর আয়াস আবার আলোচনায় আসেন ১৫ আগস্ট। ওই দিন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে দেওয়া বাড়ির সামনে আয়াসের নেতৃত্বে একদল লোক অবস্থান নেন। সেদিন সেখানে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়া, মুঠোফোনে ভিডিও ধারণ ও শিঙাড়া বিতরণের অভিযোগ তুলে তিন ব্যক্তিকে মারধর করা হয়।

সেদিন দেখা যায়, আয়াসের নেতৃত্বে অবস্থান নেওয়া ওই ব্যক্তিরা তিনজনকে মারধর করেন। একপর্যায়ে এক রিকশাচালকের মুঠোফোন পরীক্ষা করে ভিডিওটি যুবলীগের একজনের কাছে পাঠানোর অভিযোগ তোলেন আয়াস। এরপর তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ওই রিকশাচালককে মারধর করেন।

ওই সময় আয়াস সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীরা যাতে কোনো ধরনের অপতৎপরতা চালাতে না পারেন, সে জন্য তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছেন। কাউকে পেলে পুলিশের কাছে তুলে দিচ্ছেন। সেখানে ‘মব’ সৃষ্টি করে লোকজনকে মারধরের বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে আয়াস দাবি করেছিলেন, তারা কোনো মব সৃষ্টি করছেন না। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ধরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করছেন।

এর আগে গত বছরের ২৬ মে ময়মনসিংহে হামলার শিকার হয়েছিলেন আয়াস। ওই দিন নগরের পাটগুদাম ব্রিজ মোড় এলাকায় একদল ব্যক্তি আয়াসকে মারধর ও ছুরিকাঘাত করেন। পরে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

আয়াস তখন জানিয়েছিলেন, পাঁচ থেকে ছয়জন যুবক তাকে ছুরি ঠেকিয়ে সড়কের নিচের দিকে নিয়ে যান। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল ভাঙচুরের প্রসঙ্গ তুলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। পালানোর চেষ্টা করলে হাতে ও পায়ে ছুরিকাঘাত করা হয়।

গত ১৬ আগস্ট ময়মনসিংহের ভালুকায় আবার হামলার শিকার হওয়ার অভিযোগ করে আয়াস বলেন, সংগঠনের কাজে সেখানে গেলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ১৫ থেকে ২০ জন নেতা-কর্মী তার ওপর হামলা চালান। একপর্যায়ে তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনার পর আয়াস নিখোঁজ হয়েছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। তবে ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি নিজেই ভালুকা মডেল থানায় গিয়ে হামলার মৌখিক অভিযোগ করেন।

থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আয়াস প্রায় ১০ মিনিট থানায় অবস্থান করেন। তাকে পুলিশি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি তা নেননি।

জুলাই আন্দোলন ও শহিদদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে গত ৩ জুলাই অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি ও নতুন ধারা বাংলাদেশের শান্তা ফারজানার বিরুদ্ধে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন আয়াসসহ তার সংগঠনের তিন ব্যক্তি। সংগঠনটির অভিযোগ ছিল, ওই তিন নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলন নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য ও কর্মকাণ্ড করেছেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর মাগুরায় ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের বাড়ির সামনে আয়াসের একটি কর্মকাণ্ড নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা হয়। তখন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়, মাগুরা শহরের কেশব মোড়ে সাকিবের বাড়ির ফটকের সামনে প্রস্রাব করার একটি ভিডিও নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন আয়াস। ওই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়।

ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরি হক বাঁধনের ওপর হামলার প্রতিক্রিয়ায় আয়াশসহ একদল লোক মাদারীপুরে এক প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে মব সৃষ্টি করেন। এই ঘটনায় বাড়ির লোকজন ঘরে তালা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যায়।

এদিকে, রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় আটকের পর আয়াসের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক তথ্য দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মুহাম্মদ রাশেদ খাঁন। সোমবার (১২ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে আয়াসকে প্রতারক দাবি করে রাশেদ খাঁন বলেন, আটককৃত আয়াসের প্রকৃত নাম উজ্জ্বল এবং তার বাড়ি ময়মনসিংহে। ঢাকায় এসে নিজের নাম, চুলের স্টাইল ও চেহারা পরিবর্তন করে সে নিজেকে ‘জুলাই যোদ্ধা আয়াস’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তিনি আরও বলেন, আয়াস ওরফে উজ্জ্বল এর আগেও প্রতারণার একাধিক মামলায় জেল খেটেছে এবং সেই মামলাগুলো বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আয়াসদের ভাষা ব্যবহার খারাপ কেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, এই তাদের ভাষা খারাপ বলেই তারা এখনও টিকে রয়েছেন।

রবীন্দ্র-গ্রাফিতিতে কালি দেওয়ার ঘটনায় ৪ জনের বিরুদ্ধে করা মামলায় দণ্ডবিধির ১২০ (খ), ১৫৩ (ক) ও ২৯৫ (ক) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। ধারাগুলোতে অপরাধ প্রমাণিত হলে বিভিন্ন মেয়াদে সাজার কথা রয়েছে।

পুলিশ আয়াসসহ ৪ জনকে রিমান্ডের জন্য যে আবেদন করেছে তাতে আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষ ছড়িয়ে ধর্মীয় অনুভূতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টির চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য উসকানির অভিযোগ আনা হয়েছে।

আইনবিশেষজ্ঞরা বলছেন, দণ্ডবিধির ১২০খ ধারা হলো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র। কোনো অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকার অভিযোগে এ ধারায় মামলা হতে পারে। ষড়যন্ত্রের ধরন ও সংশ্লিষ্ট অপরাধের শাস্তির ওপর দণ্ড নির্ভর করে। গুরুতর অপরাধের ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অপরাধে সহায়তার মতো শাস্তি হতে পারে।

অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।দণ্ডবিধির ১৫৩ ক ধারা হলো বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে শত্রুতা ছড়ানো। কথা, লেখা, চিহ্ন বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণা ছড়ানো কিংবা তা ছড়ানোর চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ২৯৫ ক ধারা হলো ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত। কোনো শ্রেণির মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত ও বিদ্বেষপূর্ণভাবে কথা, লেখা বা দৃশ্যমান উপস্থাপনার মাধ্যমে তাদের ধর্ম বা ধর্মীয় বিশ্বাসকে অপমান করা কিংবা অপমানের চেষ্টা এ ধারার অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

তবে আইন অনুযায়ী, এসব ধারায় মামলা হওয়া মানেই আসামিরা অপরাধী সাব্যস্ত হয়েছেন, এমন নয়। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আদালত আইন অনুযায়ী শাস্তি নির্ধারণ করবেন।

আয়াসসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘তাদের এই কার্যক্রম সরকারের বিরুদ্ধে একপ্রকার যুদ্ধ ঘোষণা করা। তারা বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। আমাদের যে সম্প্রীতির সংস্কৃতি, তারা তা বিনষ্ট করছেন। মবের মাধ্যমে দেশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন।’ ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, তাদের কাজ হচ্ছে উন্নয়নে বাধা দেওয়া, ভাইরাল হওয়া। এ জন্য তারা গালাগাল করেন। ধর্মীয় উসকানি দিতে চেষ্টা করেন। তাদের পেছনে একটা চক্র আছে, সেটি জানা দরকার।

আস্থা/এমএইচ