ঢাকা ০৮:১৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল!

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০৩:২৭:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬
  • / ১০১৮ বার পড়া হয়েছে

পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল!

তুরাগ ট্র্যাজেডি: আশুলিয়া বাজার ঘাটের পন্টুন ও সংলগ্ন এলাকাতেই পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ঘটেছিল ছাত্রলীগ কর্মীদের তুরাগে লাফিয়ে পড়ার ঘটনা। এ যেন পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল। বাংলাদেশে সরকার বদলায়, কিন্তু বিরোধী মত দমন আর ঘটনা ধামাচাপার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না। তুরাগ থেকে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ উদ্ধার এবং এর পরবর্তী প্রশাসনিক দ্বিচারিতা যেন তার আরেকটি উদাহরণ।

স্টাফ রিপোর্টারঃ

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন-নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে সেই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বেশ পুরনো। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালেও পুরোনো ওই বন্দোবস্ত থেকে বেরুবার কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি, বরং এমন কিছু বিষয় সামনে আসছে, যা দেখে মনে হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা।

তুরাগে ছাত্রলীগের ঘটনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সেখানে নির্মোহ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক তর্কই প্রধান হয়ে উঠেছে। পক্ষপাতের আড়ালে তুরাগে ছাত্রলীগের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সঠিক অনুসন্ধান যেমন হচ্ছে না, তেমনি সমালোচনার আধিক্যে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে প্রাসঙ্গিক বিষয়। এরই ফাঁকে তুরাগে ডুবে মরা সুমনদের মতো ডুবতে চলেছে মানবাধিকারও।

চব্বিশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর বিচারবহির্ভূত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের নীরবতা একধরনের সম্মতি তৈরি করছে।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকর্মীদের নিশ্চুপ ভূমিকার সমান্তরালে এই সব নির্যাতন-নিপীড়নের খবর প্রকাশে সংবাদমাধ্যমের দ্বিধা দেখে মনে হচ্ছে বিগত দিনের মতো এখনও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে আছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে গেলেও বর্তমান সময়ে ফেইসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঠিকই সব জানিয়ে দেয়, যার বড় উদাহরণ সাম্প্রতিক তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা। তবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গুজব আর সত্যের পার্থক্য নির্ণয় করা বেশ দুরূহ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ও ক্ষমতাসীন বিএনপিকে অভিযুক্ত করা হলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে একে ‘গুজব ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই দাবিতে কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ও ‘নিউ মিডিয়া’ও সুর মেলায়। তবে নেটিজেনদের তীব্র সমালোচনার মুখে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করতে বাধ্য হলেও, তাদের নাটকীয় বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

তুরাগে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এজাহারে নৌকা ভ্রমণ ও অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও, প্রথমে পিকনিকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার দাবি করা হয়েছিল।

পুলিশ একে ‘সাঁতার না জানা’র কারণে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে ছাত্রলীগের মিছিলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও, পরবর্তীতে নিষিদ্ধ সংগঠনটির ৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করে। গ্রেপ্তার ও মৃত্যু নিয়ে পুলিশের এমন দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকা প্রশাসনের ওপর জনগণের অনাস্থা তৈরি করছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য বড় হুমকি।

একটু চিন্তা করলে মামলার এজাহারের বক্তব্য যে বেশ গোলমেলে, তা উপলব্ধি করা যায়। মামলার এজাহারে উল্লিখিত নদীর ঘাটে ফেরানো নৌকা থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে ডুবে মারা যাওয়ার দাবিটি একেবারেই অবিশ্বাস্য ও অবাস্তব। নদীর তীরে কেউ পানিতে পড়ে গেলে উপস্থিত অন্য কেউ তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করবে না—বাঙালি সমাজের চিরন্তন পরোপকারী স্বভাবের সঙ্গে এটি মোটেও খাপ খায় না।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল শেষে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী নৌকাযোগে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দেয়। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে আশুলিয়া বাজারঘাটে পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয় এবং প্রথম ধাপে পুলিশ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীকে আটক করে। নৌকার মাঝি নৌকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে বিএনপি কর্মীরা নৌকার রশি টেনে ধরে ভেতরে উঠে পড়ে।

এ সময় নৌকাতেই পুলিশ ও বিএনপির সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে বেশ কয়েকজন নদীতে পড়ে যায়। পুলিশ নদী থেকে সাঁতরে ওঠা কয়েকজনকেও গ্রেপ্তার করে।

মোঃ সুমন—যার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এখন তুঙ্গে রাজনৈতিক তর্ক আর তলানিতে বিপন্ন মানবাধিকার।

সংবাদমাধ্যমের কাছে নিহত সুমনের খালুর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সুমন ছাত্রলীগ করত কী না, তা তাদের জানা নেই। ২২ জুন রাতে সুমনের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর তারা জানতে পারেন যে, আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামার সময় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার মুখে অনেকে নদীতে পড়ে গিয়েছে।

ওইদিন পুলিশের আটক করা ৭ জনের মধ্যে সুমন ছিল না। ২৩ জুন রাত থেকে তুরাগ নদীতে খোঁজাখুঁজি করে বিফল হন তারা। ২৪ জুন সুমনের সঙ্গে থাকা অন্য দুইজনের লাশ পাওয়া যায়। অবশেষে ২৫ জুন পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়া ব্রিজের কাছ থেকে সুমনের লাশ উদ্ধার করেন।

পুলিশ এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। পরিবারগুলো স্থানীয় বিএনপি ও পুলিশের ভয়ভীতি এবং হয়রানির অভিযোগ তুলেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে নিহত সুমনের বাসায় ভাঙচুর, মোবাইল থেকে রাজনৈতিক ছবি-ভিডিও মুছে ফেলা এবং ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজার অভিযোগ উঠেছে।

একইভাবে, বিপ্লব ও আরিফুলের পরিবারও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি ছাড়া এবং নৌকার মাঝিও আত্মগোপনে আছেন। ভুক্তভোগীদের এভাবে আইনের আশ্রয় না নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা সমাজের ভীতিকর সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেরিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার আদৌ হবে কী না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। কেননা, পরমতঅসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে ঝুলে থাকা বাংলাদেশে এটা অনেকাংশে দুঃস্বপ্নের মতো। বিগত সময়েও বিরোধী মত দমনে গুম ও খুনের শিকার হওয়ার ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও বিচার হয়েছে, এমন নজির জানা নেই।

বিশেষত, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে যখন গণতন্ত্রে উত্তরণে যাত্রা করবে বলে আশা করা হয়েছিল, তখন থেকে উল্টো রথে চড়ে বসেছে বাংলাদেশ। পারস্পরিক রাজনৈতিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি কমতে কমতে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর তা প্রকট আকার ধারণ করে।

শুরুটা হয় আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। এরপর এসব ঘটনা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী নির্মূলের পথকেও প্রশস্ত করে তোলে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরেও একই চিত্র দেখা গিয়েছে। গুম, খুন ও টর্চার সেলের গল্প আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টাও একই দোষে দুষ্ট। ওই সরকারের দেড় বছরে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মবসহিংসতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত অশালীন ভাষা ও ভঙ্গি—যাকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বললে ভুল হবে না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বিএনপি থেকে আওয়ামী আমলজুড়েই বিরোধী মত দমনে প্রশাসনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও নতুন নয়। কিন্তু একটা দেশে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রথা কখনো চলতে পারে না, এর পরিবর্তন আবশ্যক। অন্যথায় বৃহৎ রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি পতিত দেশে উগ্রবাদীদের চূড়ান্ত উত্থান ঘটতে সময় লাগবে না। ইতোমধ্যে আইএস, আলকায়েদা ও তালেবানের পতাকা উড়ানোর মধ্য দিয়ে সেসবের আলামতও দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই নানামুখী সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হলেও, তা শুধু কথার কথা হয়ে থেকেছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে নির্মূলের পুরোনো পন্থা বিলুপ্ত হয়নি। ৫ অগাস্ট-পরবর্তী সহিংস ঘটনাবলি তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তবে এসব সহিংসতায় ছাত্রলীগ বেশি আক্রান্ত।

সরকারে থাকাকালে ছাত্রলীগের যারা ক্ষমতার হালুয়া-রুটি ভাগবাটোয়ারা করে খেয়েছে, তারা পর্দার আড়ালে চলে গেলেও দুঃসময়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া সুমনের মতো নতুন কর্মীগুলো কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই ঝরে পড়ছে। এদের লাশের ওপর দিয়ে বিতর্কিত নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ঘটছে কী না, তাও চিন্তা করে দেখার বিষয়।

তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব ও সনদপত্র বাতিল এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হতে না দেওয়ার মতো ঘটনা এখনও ঘটছে। যা দেশের শিক্ষা ও রাজনীতির সুস্থ ধারাকে যেমন ব্যাহত করছে, তেমনি দেশের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এই মাত্রাকে একধরনের বৈধতা দিয়েছে বিরোধী পক্ষের ‘নিষিদ্ধ’করণের রাজনীতি।

শুধুমাত্র রাজনৈতিক বৈপরীত্যের কারণে কোনো তরুণ কিংবা বিপরীত মতের একজন মানুষ হত্যাযোগ্য হয়ে উঠবে, তা কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না। গণতন্ত্রে বহুদল ও বিপরীত মত না থাকলে ভালো-মন্দের তফাৎ বোঝা যায় না। সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ রুদ্ধ করে এভাবে হত্যা ও নির্যাতন চললে দেশে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে। এই চরম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মানবিক বোধের খুব বেশি প্রয়োজন।

মীর রবি কবি ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: mirrabi01@gmail.com

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল!

আপডেট সময় : ০৩:২৭:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল!

তুরাগ ট্র্যাজেডি: আশুলিয়া বাজার ঘাটের পন্টুন ও সংলগ্ন এলাকাতেই পুলিশের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে ঘটেছিল ছাত্রলীগ কর্মীদের তুরাগে লাফিয়ে পড়ার ঘটনা। এ যেন পুরোনো বন্দোবস্তে নতুন চাল। বাংলাদেশে সরকার বদলায়, কিন্তু বিরোধী মত দমন আর ঘটনা ধামাচাপার রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলায় না। তুরাগ থেকে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ উদ্ধার এবং এর পরবর্তী প্রশাসনিক দ্বিচারিতা যেন তার আরেকটি উদাহরণ।

স্টাফ রিপোর্টারঃ

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, নির্যাতন-নিপীড়ন ও হত্যাকাণ্ডের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে সেই ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা বেশ পুরনো। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালেও পুরোনো ওই বন্দোবস্ত থেকে বেরুবার কোনো চেষ্টা দেখা যায়নি, বরং এমন কিছু বিষয় সামনে আসছে, যা দেখে মনে হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা থেকে আরও দূরে সরে যাচ্ছি আমরা।

তুরাগে ছাত্রলীগের ঘটনার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সেখানে নির্মোহ বিশ্লেষণের চেয়ে রাজনৈতিক তর্কই প্রধান হয়ে উঠেছে। পক্ষপাতের আড়ালে তুরাগে ছাত্রলীগের সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সঠিক অনুসন্ধান যেমন হচ্ছে না, তেমনি সমালোচনার আধিক্যে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে প্রাসঙ্গিক বিষয়। এরই ফাঁকে তুরাগে ডুবে মরা সুমনদের মতো ডুবতে চলেছে মানবাধিকারও।

চব্বিশে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর বিচারবহির্ভূত নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের নীরবতা একধরনের সম্মতি তৈরি করছে।

গণতন্ত্র ও মানবাধিকারকর্মীদের নিশ্চুপ ভূমিকার সমান্তরালে এই সব নির্যাতন-নিপীড়নের খবর প্রকাশে সংবাদমাধ্যমের দ্বিধা দেখে মনে হচ্ছে বিগত দিনের মতো এখনও অঘোষিত নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে আটকে আছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ।

তবে মূলধারার সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে গেলেও বর্তমান সময়ে ফেইসবুক ও ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ঠিকই সব জানিয়ে দেয়, যার বড় উদাহরণ সাম্প্রতিক তুরাগ নদীতে ছাত্রলীগ কর্মীর লাশ উদ্ধারের ঘটনা। তবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে গুজব আর সত্যের পার্থক্য নির্ণয় করা বেশ দুরূহ।

সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশ ও ক্ষমতাসীন বিএনপিকে অভিযুক্ত করা হলেও পুলিশ প্রাথমিকভাবে একে ‘গুজব ও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। এই দাবিতে কিছু অ্যাক্টিভিস্ট ও ‘নিউ মিডিয়া’ও সুর মেলায়। তবে নেটিজেনদের তীব্র সমালোচনার মুখে প্রশাসন শেষ পর্যন্ত ঘটনার সত্যতা আংশিক স্বীকার করতে বাধ্য হলেও, তাদের নাটকীয় বক্তব্য নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

তুরাগে ছাত্রলীগ কর্মীর মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও প্রকৃত সত্য আড়াল করার চেষ্টা আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এজাহারে নৌকা ভ্রমণ ও অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও, প্রথমে পিকনিকে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটার দাবি করা হয়েছিল।

পুলিশ একে ‘সাঁতার না জানা’র কারণে অপমৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করে ছাত্রলীগের মিছিলের বিষয়টি অস্বীকার করলেও, পরবর্তীতে নিষিদ্ধ সংগঠনটির ৭ জনকে গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করে। গ্রেপ্তার ও মৃত্যু নিয়ে পুলিশের এমন দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক ভূমিকা প্রশাসনের ওপর জনগণের অনাস্থা তৈরি করছে, যা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর জন্য বড় হুমকি।

একটু চিন্তা করলে মামলার এজাহারের বক্তব্য যে বেশ গোলমেলে, তা উপলব্ধি করা যায়। মামলার এজাহারে উল্লিখিত নদীর ঘাটে ফেরানো নৌকা থেকে অসাবধানতাবশত পড়ে ডুবে মারা যাওয়ার দাবিটি একেবারেই অবিশ্বাস্য ও অবাস্তব। নদীর তীরে কেউ পানিতে পড়ে গেলে উপস্থিত অন্য কেউ তাকে উদ্ধারের চেষ্টা করবে না—বাঙালি সমাজের চিরন্তন পরোপকারী স্বভাবের সঙ্গে এটি মোটেও খাপ খায় না।

সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিও, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল শেষে ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী নৌকাযোগে যাওয়ার সময় শেখ হাসিনার নামে স্লোগান দেয়। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে আশুলিয়া বাজারঘাটে পুলিশ ও স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা অবস্থান নেয় এবং প্রথম ধাপে পুলিশ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীকে আটক করে। নৌকার মাঝি নৌকা নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে বিএনপি কর্মীরা নৌকার রশি টেনে ধরে ভেতরে উঠে পড়ে।

এ সময় নৌকাতেই পুলিশ ও বিএনপির সঙ্গে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি শুরু হয়। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে বেশ কয়েকজন নদীতে পড়ে যায়। পুলিশ নদী থেকে সাঁতরে ওঠা কয়েকজনকেও গ্রেপ্তার করে।

মোঃ সুমন—যার লাশের ওপর দাঁড়িয়ে এখন তুঙ্গে রাজনৈতিক তর্ক আর তলানিতে বিপন্ন মানবাধিকার।

সংবাদমাধ্যমের কাছে নিহত সুমনের খালুর দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, সুমন ছাত্রলীগ করত কী না, তা তাদের জানা নেই। ২২ জুন রাতে সুমনের নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর তারা জানতে পারেন যে, আওয়ামী লীগের মিছিল শেষে আশুলিয়া ঘাটে নামার সময় পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের হামলার মুখে অনেকে নদীতে পড়ে গিয়েছে।

ওইদিন পুলিশের আটক করা ৭ জনের মধ্যে সুমন ছিল না। ২৩ জুন রাত থেকে তুরাগ নদীতে খোঁজাখুঁজি করে বিফল হন তারা। ২৪ জুন সুমনের সঙ্গে থাকা অন্য দুইজনের লাশ পাওয়া যায়। অবশেষে ২৫ জুন পুলিশের তথ্যের ভিত্তিতে আশুলিয়া ব্রিজের কাছ থেকে সুমনের লাশ উদ্ধার করেন।

পুলিশ এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্যের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। পরিবারগুলো স্থানীয় বিএনপি ও পুলিশের ভয়ভীতি এবং হয়রানির অভিযোগ তুলেছে। পুলিশের বিরুদ্ধে নিহত সুমনের বাসায় ভাঙচুর, মোবাইল থেকে রাজনৈতিক ছবি-ভিডিও মুছে ফেলা এবং ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ খোঁজার অভিযোগ উঠেছে।

একইভাবে, বিপ্লব ও আরিফুলের পরিবারও চরম নিরাপত্তাহীনতার কারণে বাড়ি ছাড়া এবং নৌকার মাঝিও আত্মগোপনে আছেন। ভুক্তভোগীদের এভাবে আইনের আশ্রয় না নিয়ে আত্মগোপনে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করা সমাজের ভীতিকর সংস্কৃতিকে ফুটিয়ে তোলে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পেরিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের আমলে এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার আদৌ হবে কী না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। কেননা, পরমতঅসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ফাঁদে ঝুলে থাকা বাংলাদেশে এটা অনেকাংশে দুঃস্বপ্নের মতো। বিগত সময়েও বিরোধী মত দমনে গুম ও খুনের শিকার হওয়ার ঘটনার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও বিচার হয়েছে, এমন নজির জানা নেই।

বিশেষত, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে যখন গণতন্ত্রে উত্তরণে যাত্রা করবে বলে আশা করা হয়েছিল, তখন থেকে উল্টো রথে চড়ে বসেছে বাংলাদেশ। পারস্পরিক রাজনৈতিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি কমতে কমতে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পর তা প্রকট আকার ধারণ করে।

শুরুটা হয় আওয়ামী লীগ ট্যাগ দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। এরপর এসব ঘটনা যেমন বাড়তে থাকে, তেমনি বিরোধী রাজনৈতিক গোষ্ঠী নির্মূলের পথকেও প্রশস্ত করে তোলে। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৭ বছরেও একই চিত্র দেখা গিয়েছে। গুম, খুন ও টর্চার সেলের গল্প আওয়ামী লীগের পতনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রকাশ্যে এসেছে।

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টাও একই দোষে দুষ্ট। ওই সরকারের দেড় বছরে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মবসহিংসতা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত অশালীন ভাষা ও ভঙ্গি—যাকে রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব বললে ভুল হবে না।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বিএনপি থেকে আওয়ামী আমলজুড়েই বিরোধী মত দমনে প্রশাসনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগও নতুন নয়। কিন্তু একটা দেশে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রথা কখনো চলতে পারে না, এর পরিবর্তন আবশ্যক। অন্যথায় বৃহৎ রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি পতিত দেশে উগ্রবাদীদের চূড়ান্ত উত্থান ঘটতে সময় লাগবে না। ইতোমধ্যে আইএস, আলকায়েদা ও তালেবানের পতাকা উড়ানোর মধ্য দিয়ে সেসবের আলামতও দেখা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকেই নানামুখী সংস্কার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলা হলেও, তা শুধু কথার কথা হয়ে থেকেছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষকে নির্মূলের পুরোনো পন্থা বিলুপ্ত হয়নি। ৫ অগাস্ট-পরবর্তী সহিংস ঘটনাবলি তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তবে এসব সহিংসতায় ছাত্রলীগ বেশি আক্রান্ত।

সরকারে থাকাকালে ছাত্রলীগের যারা ক্ষমতার হালুয়া-রুটি ভাগবাটোয়ারা করে খেয়েছে, তারা পর্দার আড়ালে চলে গেলেও দুঃসময়ে রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়া সুমনের মতো নতুন কর্মীগুলো কিছু বুঝে উঠতে না উঠতেই ঝরে পড়ছে। এদের লাশের ওপর দিয়ে বিতর্কিত নেতাকর্মীদের প্রত্যাবর্তন ঘটছে কী না, তাও চিন্তা করে দেখার বিষয়।

তাদের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত শিক্ষার্থীদের ছাত্রত্ব ও সনদপত্র বাতিল এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হতে না দেওয়ার মতো ঘটনা এখনও ঘটছে। যা দেশের শিক্ষা ও রাজনীতির সুস্থ ধারাকে যেমন ব্যাহত করছে, তেমনি দেশের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এই মাত্রাকে একধরনের বৈধতা দিয়েছে বিরোধী পক্ষের ‘নিষিদ্ধ’করণের রাজনীতি।

শুধুমাত্র রাজনৈতিক বৈপরীত্যের কারণে কোনো তরুণ কিংবা বিপরীত মতের একজন মানুষ হত্যাযোগ্য হয়ে উঠবে, তা কোনো সভ্য দেশের চিত্র হতে পারে না। গণতন্ত্রে বহুদল ও বিপরীত মত না থাকলে ভালো-মন্দের তফাৎ বোঝা যায় না। সেই গণতান্ত্রিক পরিবেশ রুদ্ধ করে এভাবে হত্যা ও নির্যাতন চললে দেশে মানবিক বিপর্যয় ঘটবে। এই চরম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মানবিক বোধের খুব বেশি প্রয়োজন।

মীর রবি কবি ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: mirrabi01@gmail.com

দৈনিক আস্থা/এমএইচ