ঢাকা ০৫:২৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬, ১৬ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সামনে আসলো ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের বিতর্কে ইউনূস সরকার

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১২:৩৪:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬
  • / ১০১০ বার পড়া হয়েছে

সামনে আসলো ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের বিতর্কে ইউনূস সরকার

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের ক্ষমতায় আসীন বিতর্কিত ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে ১ মাস ১১ দিন আগে। কিন্তু বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না ইউনূস সরকারের। দেড় বছরের ইউনূস সরকার যতটা সমালোচিত হচ্ছে, এত সমালোচনা অতীতে কোনো সরকার হয়েছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন উপদেষ্টা কার চেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছেন তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। একমাত্র বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ছাড়া সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা ১শ ৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে। এসব অধ্যাদেশের কয়টি জনস্বার্থে আর কয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে বিশেষ সংসদীয় কমিটি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে অযাচিতভাবে। সংসদই এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত করবে। অধ্যাদেশ জারি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সততা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি নিয়েও চলছে চাপা উত্তেজনা এবং বিতর্ক।

বিশেষ করে বিদায়ের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি যে দেশের স্বার্থবিরোধী তা এখন প্রকাশ্যে বলছেন ইউনূস ঘনিষ্ঠ সুশীলরা। টিআইবি, সিপিডির মতো থিঙ্কট্যাংকগুলো এখন এ চুক্তির সমালোচনায় মুখর। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে এ চুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য।

এসব বিতর্কে যখন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের ইমেজ তলানিতে ঠিক তখনই ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিতর্ক উসকে দিলেন ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সাবেক এই উপদেষ্টা শব্দবোমা ফাটিয়ে ইউনূস সরকারের শেষ ইমেজটুকুও ধ্বংস করে দিলেন।

‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির উৎপত্তি আধুনিক অর্থে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কে। সেখানে ‘ডেরিন ডেভলেট’ বা ‘গভীর রাষ্ট্র’ ধারণাটি ব্যবহৃত হতো এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক বোঝাতে, যেখানে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যুরোক্রেসি এলিট এবং কখনো কখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অংশ যুক্ত ছিল।

অভিযোগ ছিল, নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও এই নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখত, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডিপ স্টেট প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেই ডিপ স্টেট ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই প্রায় অর্ধশত নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প।

এর মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতার বলিষ্ঠ প্রয়োগে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যাতে অভিবাসন, পরিবেশ ও বৈচিত্র্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান নীতিগুলো বদলে দেওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়। ট্রাম্পের একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারির লক্ষ্য ছিল বিদায়ি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পথ থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনি প্রচারের সময় ট্রাম্প ও তাঁর সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’ বলে যে ব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন, সেটা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম পদক্ষেপে। এর ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইউএসএইডের সহায়তায় পরিচালিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তবে পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনে ডিপ স্টেটের কোনো ভূমিকা ছিল না।

ট্রাম্প যাই বলুন না কেন, ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বেড়ে যায়। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও আইএমএফের মতো ডিপ স্টেট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও প্রভাব বেড়েছে। তাই ইউনূস সরকারের ওপর যে ডিপ স্টেটের কর্তৃত্ব ও প্রভাব ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন-চার মাসের মধ্যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আলোচনা হয়েছিল। তখনই সরকার এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বলেও আসিফ মাহমুদ দাবি করেন। কিন্তু তার এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম ১০ মাস অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নির্বাচনবিমুখ। নির্বাচনের কথা শুনলে অনেক উপদেষ্টা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল, আগে সংস্কার, তারপর নির্বাচন।

প্রধান উপদেষ্টা নিজেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অভিলাষ প্রকাশ করেছিলেন পরোক্ষভাবে। তিনি বলেছিলেন, জনগণ চায় আমরা আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকি। তাঁর কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।

বিতর্কিত উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়নি। রাজনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনের জন্য এত তাড়াহুড়ো কেন?

আরেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, সংস্কারের আগে নির্বাচন হলে দেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০ মাসের কার্যক্রম ছিল নির্বাচনের বিরুদ্ধে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন নিয়ে এই অনীহার কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি। নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করার ঘোষণা দেয় দেশের সবচেয়ে এ দলটি। এরকম একটি পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আশা থেকে সরে আসে অন্তর্বর্তী সরকার।

গত ২০২৫ সালের ১৩ জুন প্রধান উপদেষ্টা লন্ডনে বিএনপি চেয়ারম্যানের (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরই সরকারের একাংশ নির্বাচনমুখী হতে শুরু করে। সরকারের এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস প্রথম ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর ক্রমাগত তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। মব সন্ত্রাসের লাগামহীন বিস্তার, সীমাহীন চাঁদাবাজি, ভুল নীতির কারণে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। জনজীবন যখন বিপর্যস্ত তখন অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য বাড়তে থাকে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

কিন্তু সরকার ছিল নির্বিকার। এরকম পরিস্থিতিতে সমাজের সব স্তরের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। দেশের সার্বিক অবস্থা এমন হয়েছিল যে, সরকারের সামনে নির্বাচন ছাড়া আর কোনো সম্মানজনক প্রস্থান পথ খোলা ছিল না।

কিন্তু তারপরও সরকারের ভিতরে একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করেছিল বলে এখন অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে এবং নির্বাচন অনিশ্চিত করতে খোদ সরকারের ভিতরেই সক্রিয় ছিল একটি শক্তিশালী চক্র।

জানা গেছে, তিন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান এবং ফাওজুল কবির খান নির্বাচন বিলম্বিত করার নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন। তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘মব সন্ত্রাস’ বা গণ-উন্মাদনাকে উসকে দেওয়া বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একটি প্রভাবশালী দৈনিকে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও কেউ তার প্রতিবাদ করেনি। তাই ডিপ স্টেটের প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকার নাকচ করে দিয়েছিল বলে আসিফ মাহমুদ যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের স্বার্থের চেয়ে তারা ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন।

যেমন:-

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি।

২. চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি।

৩. সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা।

৪. সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনা না করে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের নামে সংকট সৃষ্টি।

৫. মামলা, হয়রানির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে নীরবে হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন।

৬. আরাকান আর্মির জন্য মানবিক করিডর দেওয়ার তোড়জোড়।

কেন প্রধান উপদেষ্টা ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন সে ব্যাপারে গভীর গবেষণা করলেই বোঝা যাবে, ডিপ স্টেটের এজেন্ডা কী ছিল এবং এখনো আছে কি না। দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সত্য খুঁজে বের করা জরুরি।

ডিপ স্টেটের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আনুগত্যের প্রমাণ। তাই আসিফ মাহমুদের এ বক্তব্যের সূত্র ধরে আমাদের সত্য খুঁজে বের করতে হবে।

দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টারা কোথায় অবৈধ অর্থ পাচার করেছেন তা অনুসন্ধান করলে ডিপ স্টেটের সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে আসবে। কারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চেয়েছিল, তাদের তদন্তের মুখোমুখি দাঁড় করালেই ডিপ স্টেট রহস্যের জট খুলবে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

সামনে আসলো ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের বিতর্কে ইউনূস সরকার

আপডেট সময় : ১২:৩৪:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২৬

সামনে আসলো ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের বিতর্কে ইউনূস সরকার

মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ

ডিপ স্টেটের আর্শীবাদের ক্ষমতায় আসীন বিতর্কিত ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার বিদায় নিয়েছে ১ মাস ১১ দিন আগে। কিন্তু বিতর্ক যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না ইউনূস সরকারের। দেড় বছরের ইউনূস সরকার যতটা সমালোচিত হচ্ছে, এত সমালোচনা অতীতে কোনো সরকার হয়েছে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে সীমাহীন দুর্নীতির অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে কোন উপদেষ্টা কার চেয়ে বেশি দুর্নীতি করেছেন তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। একমাত্র বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ছাড়া সবার বিরুদ্ধে দুর্নীতির তালিকা প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা ১শ ৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে। এসব অধ্যাদেশের কয়টি জনস্বার্থে আর কয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে বিশেষ সংসদীয় কমিটি।

সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশ কিছু অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে অযাচিতভাবে। সংসদই এসব অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ চূড়ান্ত করবে। অধ্যাদেশ জারি নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সততা আজ প্রশ্নবিদ্ধ।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গোপন ও প্রকাশ্য চুক্তি নিয়েও চলছে চাপা উত্তেজনা এবং বিতর্ক।

বিশেষ করে বিদায়ের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তি যে দেশের স্বার্থবিরোধী তা এখন প্রকাশ্যে বলছেন ইউনূস ঘনিষ্ঠ সুশীলরা। টিআইবি, সিপিডির মতো থিঙ্কট্যাংকগুলো এখন এ চুক্তির সমালোচনায় মুখর। বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠছে এ চুক্তি জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য।

এসব বিতর্কে যখন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের ইমেজ তলানিতে ঠিক তখনই ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বিতর্ক উসকে দিলেন ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবসে সাবেক এই উপদেষ্টা শব্দবোমা ফাটিয়ে ইউনূস সরকারের শেষ ইমেজটুকুও ধ্বংস করে দিলেন।

‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির উৎপত্তি আধুনিক অর্থে ২০শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে তুরস্কে। সেখানে ‘ডেরিন ডেভলেট’ বা ‘গভীর রাষ্ট্র’ ধারণাটি ব্যবহৃত হতো এমন এক গোপন নেটওয়ার্ক বোঝাতে, যেখানে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, ব্যুরোক্রেসি এলিট এবং কখনো কখনো আন্ডারওয়ার্ল্ডের অংশ যুক্ত ছিল।

অভিযোগ ছিল, নির্বাচিত সরকারের বাইরে থেকেও এই নেটওয়ার্ক রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব রাখত, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ক্ষেত্রে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ডিপ স্টেট প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণ করেই ডিপ স্টেট ভেঙে দেওয়ার উদ্যোগ নেন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়েই প্রায় অর্ধশত নির্বাহী আদেশ জারি করেন ট্রাম্প।

এর মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতার বলিষ্ঠ প্রয়োগে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যাতে অভিবাসন, পরিবেশ ও বৈচিত্র্য বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান নীতিগুলো বদলে দেওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়। ট্রাম্পের একের পর এক নির্বাহী আদেশ জারির লক্ষ্য ছিল বিদায়ি প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পথ থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনা।

নির্বাচনি প্রচারের সময় ট্রাম্প ও তাঁর সহকর্মীরা যুক্তরাষ্ট্রের ‘ডিপ স্টেট’ বলে যে ব্যবস্থাকে বুঝিয়েছেন, সেটা ভেঙে দেওয়ার প্রচেষ্টা স্পষ্ট হয়েছিল ট্রাম্পের প্রথম পদক্ষেপে। এর ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে ইউএসএইডের সহায়তায় পরিচালিত কার্যক্রম বন্ধ করে দেন। তবে পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশে ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পট পরিবর্তনে ডিপ স্টেটের কোনো ভূমিকা ছিল না।

ট্রাম্প যাই বলুন না কেন, ইউনূস সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব বেড়ে যায়। রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা ও আইএমএফের মতো ডিপ স্টেট সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও প্রভাব বেড়েছে। তাই ইউনূস সরকারের ওপর যে ডিপ স্টেটের কর্তৃত্ব ও প্রভাব ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে আসিফ মাহমুদের বক্তব্যে দাবি করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম তিন-চার মাসের মধ্যে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার আলোচনা হয়েছিল। তখনই সরকার এ প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি বলেও আসিফ মাহমুদ দাবি করেন। কিন্তু তার এ দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

ইউনূস সরকারের দেড় বছরের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রথম ১০ মাস অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নির্বাচনবিমুখ। নির্বাচনের কথা শুনলে অনেক উপদেষ্টা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতেন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল, আগে সংস্কার, তারপর নির্বাচন।

প্রধান উপদেষ্টা নিজেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অভিলাষ প্রকাশ করেছিলেন পরোক্ষভাবে। তিনি বলেছিলেন, জনগণ চায় আমরা আরও ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকি। তাঁর কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাও দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছিলেন।

বিতর্কিত উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন, শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়নি। রাজনীতিবিদদের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচনের জন্য এত তাড়াহুড়ো কেন?

আরেক উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, সংস্কারের আগে নির্বাচন হলে দেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম ১০ মাসের কার্যক্রম ছিল নির্বাচনের বিরুদ্ধে।

অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন নিয়ে এই অনীহার কঠোর সমালোচনা করে বিএনপি। নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করার ঘোষণা দেয় দেশের সবচেয়ে এ দলটি। এরকম একটি পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার আশা থেকে সরে আসে অন্তর্বর্তী সরকার।

গত ২০২৫ সালের ১৩ জুন প্রধান উপদেষ্টা লন্ডনে বিএনপি চেয়ারম্যানের (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান) সঙ্গে বৈঠক করেন। এর পরই সরকারের একাংশ নির্বাচনমুখী হতে শুরু করে। সরকারের এক বছর পূর্তিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস প্রথম ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেন।

অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যকাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর ক্রমাগত তাদের জনপ্রিয়তা কমতে থাকে। মব সন্ত্রাসের লাগামহীন বিস্তার, সীমাহীন চাঁদাবাজি, ভুল নীতির কারণে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়। জনজীবন যখন বিপর্যস্ত তখন অন্তর্বর্তী সরকার ছিল নিজস্ব এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেকারত্ব এবং দারিদ্র্য বাড়তে থাকে। মুদ্রাস্ফীতির কারণে জিনিসপত্রের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যায়।

কিন্তু সরকার ছিল নির্বিকার। এরকম পরিস্থিতিতে সমাজের সব স্তরের মানুষ একটি নির্বাচিত সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয়। দেশের সার্বিক অবস্থা এমন হয়েছিল যে, সরকারের সামনে নির্বাচন ছাড়া আর কোনো সম্মানজনক প্রস্থান পথ খোলা ছিল না।

কিন্তু তারপরও সরকারের ভিতরে একটি অংশ শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করেছিল বলে এখন অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে এবং নির্বাচন অনিশ্চিত করতে খোদ সরকারের ভিতরেই সক্রিয় ছিল একটি শক্তিশালী চক্র।

জানা গেছে, তিন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, আদিলুর রহমান খান এবং ফাওজুল কবির খান নির্বাচন বিলম্বিত করার নানামুখী কৌশলে লিপ্ত ছিলেন। তাদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘মব সন্ত্রাস’ বা গণ-উন্মাদনাকে উসকে দেওয়া বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একটি প্রভাবশালী দৈনিকে এ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পরও কেউ তার প্রতিবাদ করেনি। তাই ডিপ স্টেটের প্রস্তাব অন্তর্বর্তী সরকার নাকচ করে দিয়েছিল বলে আসিফ মাহমুদ যে দাবি করেছেন, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের স্বার্থের চেয়ে তারা ডিপ স্টেটের এজেন্ডা বাস্তবায়নের দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন।

যেমন:-

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি।

২. চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়ার জন্য তড়িঘড়ি।

৩. সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা।

৪. সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ বিবেচনা না করে আইএমএফের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের নামে সংকট সৃষ্টি।

৫. মামলা, হয়রানির মাধ্যমে বেসরকারি খাতকে নীরবে হত্যার নীলনকশা বাস্তবায়ন।

৬. আরাকান আর্মির জন্য মানবিক করিডর দেওয়ার তোড়জোড়।

কেন প্রধান উপদেষ্টা ৫০ বছর ক্ষমতায় থাকার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন সে ব্যাপারে গভীর গবেষণা করলেই বোঝা যাবে, ডিপ স্টেটের এজেন্ডা কী ছিল এবং এখনো আছে কি না। দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য সত্য খুঁজে বের করা জরুরি।

ডিপ স্টেটের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আনুগত্যের প্রমাণ। তাই আসিফ মাহমুদের এ বক্তব্যের সূত্র ধরে আমাদের সত্য খুঁজে বের করতে হবে।

দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টারা কোথায় অবৈধ অর্থ পাচার করেছেন তা অনুসন্ধান করলে ডিপ স্টেটের সংশ্লিষ্টতার তথ্য বেরিয়ে আসবে। কারা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইঞ্জিনিয়ারিং করতে চেয়েছিল, তাদের তদন্তের মুখোমুখি দাঁড় করালেই ডিপ স্টেট রহস্যের জট খুলবে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ