কর্মকর্তাদের জামায়াত-বিএনপি কিংবা অন্য দলের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে
- আপডেট সময় : ০৯:৩২:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ১০৮৯ বার পড়া হয়েছে
কর্মকর্তাদের জামায়াত-বিএনপি কিংবা অন্য দলের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে
স্টাফ রিপোর্টারঃ
ভোটের রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন। অতীতের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর দায় নিতে হয়েছে তৎকালীন ডিসিদের। ফলে এবারের নির্বাচন ডিসিদের জন্য অগ্নিপরীক্ষার মতো। আর পুলিশের নিয়ন্ত্রক হিসেবে জেলার এসপির ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে তারাও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ভোট হওয়া-না হওয়ার পেছনে দায়ী থাকেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ অধিদপ্তর থেকে পুলিশকে বারবার এ বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এতে বাড়তি সতর্কতার পাশাপাশি বাড়তি চাপেও রয়েছে পুলিশ।
একজন ডিসি বলেন, ‘আমি জীবনে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। কিন্তু এখন ভোটের দায়িত্ব পালন করতে আমাকে রাজনৈতিক কর্মী তকমা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। শুধু আমি নই, অন্য কর্মকর্তাদেরও জামায়াত-বিএনপি কিংবা অন্য দলের আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এটা আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য রাজনৈতিক তকমা পাওয়ার ভয়েও আছেন অনেক কর্মকর্তা।’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোঃ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা, সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা, নির্বাচন কমিশন, জেলা ও উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, কোস্টগার্ডসহ বিচারিক ও ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ সব স্তরের বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সমন্বয়, তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ টহলসহ সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের গ্যাপ, বিচ্যুতি, ত্রুটি, বৈষম্য, অবহেলা, দ্বন্দ্ব বরদাশত করা হবে না।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দীনের ভাষ্য, ‘আমরা ছেলেবেলায় পড়েছি, জেলা প্রশাসকরা হলো সরকারের চোখ, হাত ও মুখ। এই ডিসিদের চোখ দিয়ে সরকার দেখে, মুখ দিয়ে সরকার বলে ও হাত দিয়ে সরকার কাজ করে। কিন্তু এই চোখ, মুখ ও হাত আজ নষ্ট হয়ে গেছে। সুতরাং মাঠপর্যায়ে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দিতে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করতে হবে। কোনো ব্লেমিং গেম শোনা হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘যখন জাতীয় নির্বাচন হয়, জেলা প্রশাসকরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পুরো প্রসেসে (প্রক্রিয়া) আইনের প্রয়োগ থেকে শুরু হয়ে সবকিছুতে তাদের সম্পৃক্ততা থাকে। আমরা তাদের বলেছি, এই যে সামনে নির্বাচনটা আসছে, নিজ উদ্যোগে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবেন। আমরা নির্বাচন কমিশন থেকে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করব। আপনাদের যে ক্ষমতা আইন দিয়েছে এর সর্বোচ্চ প্রয়োগ করবেন।’
ডিসিদের প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘আমাদের ডিসিরা কিছু অসুবিধার কথা বলেছেন। পার্টিকুলারলি স্টোরেজ প্রবলেমের কথা বলেছেন। আর এনআইডি নিয়ে মানুষের হয়রানির কিছু কথা বলেছেন। আমরা এটা ক্লারিফাই করেছি। আমরা এগুলো অ্যাড্রেস করার জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি।’
পুলিশের আইজিপি বাহরুল আলম বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশ পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ রাখবে। বাংলাদেশ পুলিশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারে নিরলস কাজ করা হচ্ছে।’
রোষানলে ইউএনওরা: গত ১৭ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা তার নির্বাচনী এলাকার ইউএনওকে আক্রমণাত্মকভাবে বারবার বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন ও আঙুল উঁচিয়ে বিভিন্নরকম হুমকি-ধমকি দেন।
তিনি বলেন, ‘দিজ ইজ দ্যা লাস্ট টাইম আই ওয়ার্নিং ইউ, আই উইল নট লিসেন টু দিজ। আপনি পারলে থামাই দেন, আজ ভদ্রতা দেখাচ্ছি, নেক্সট টাইম কিন্তু এই ভদ্রতা করব না। আপনাদের এরকম দেখায় (আক্রমণাত্মকভাবে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখান), খোঁজ নেন, প্রশাসনে বইসা আছেন খোঁজ নেন।’
পরে অবশ্য রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। দেশের অন্যান্য এলাকায়ও স্থানীয় কর্মকর্তা, বিশেষ করে ইউএনও ও এসিল্যান্ডদের ওপর নানা অভিযোগ চাপিয়ে দিচ্ছেন প্রার্থীরা। গত কয়েকদিন আগে দেশের বেশ কয়েকটি উপজেলার ইউএনওকে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। পরে আবার সেই বদলি আদেশ স্থগিত করা হয়। প্রার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতেই তাদের বদলি করা হয়েছিল। পরে আবার অন্য প্রার্থীদের অনুরোধে ওই আট ইউএনওর বদলি আদেশ স্থগিত করা হয় বলে জানা গেছে। এ নিয়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারাও দুই ভাগে বিভক্ত হন বলে গুঞ্জন রয়েছে।
শুধু ইসিতে নয়, সাংবাদিকদের কাছে কর্মকর্তাদের নামে অভিযোগ দিচ্ছেন প্রার্থীরা। এই প্রতিবেদকের কাছে অনেক কর্মকর্তার নামে অভিযোগ এসেছে। তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের অনুরোধও করেছেন কোনো কোনো প্রার্থী।সংবাদ
একাধিক ইউএনও জানান, প্রার্থীরা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের কাছে অভিযোগ দিচ্ছেন। এসব অভিযোগ সমাধান করতে হচ্ছে। আসলে ভোটের মাঠে কাউকে সন্তুষ্ট রাখা খুবই কঠিন কাজ। সন্তুষ্ট না হলে তাদের কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনে অভিযোগ দিচ্ছেন। এটা কর্মকর্তাদের জন্য চিন্তার কারণ।
তারা আরও বলেন, প্রভাবশালী প্রার্থীদের নেতাকর্মীদের তোপের মুখেও অনেক সময় পড়তে হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা আইন অনুযায়ী সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেও জানান।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ (এপিডি) অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব মিঞা মুহাম্মদ আশরাফ রেজা ফরিদী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত ১০ থেকে ১২ জন ইউএনও-এসিল্যান্ডের নামে অভিযোগ এসেছে। ইসি থেকে আমাদের কাছে এসেছে। আমরা এগুলো বিভাগীয় কমিশনারদের মাধ্যমে তদন্ত করে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেব।’
কর্মকর্তাদের অভয় দিয়ে তিনি বলেন, ‘ঢালাও কেউ অভিযোগ দিলেই কোনো অফিসারকে বদলি কিংবা ওএসডি করার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত কারও তদবিরে অন্যায়ভাবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে না। এবারের ভোট যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকে আমরা সেই পথে হাঁটছি। সুতরাং কর্মকর্তারা চিন্তিত হওয়ার কারণ নেই বলেও মনে করেন আশরাফ রেজা ফরিদী।


















