নিজেকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা, ইউনূসের গেজেট নিয়ে প্রশ্ন
- আপডেট সময় : ১২:২৫:৪৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ মার্চ ২০২৬
- / ১০৪১ বার পড়া হয়েছে
নিজেকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা, ইউনূসের গেজেট নিয়ে প্রশ্ন
মোফাজ্জল হোসেন ইলিয়াছঃ
বাংলাদেশের সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতা ছাড়ার আগে নিজেই নিজেকে ‘ভিভিআইপি’ অর্থাৎ অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করে গেছেন। ফলে দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ থেকে পরবর্তী এক বছরের জন্য তিনি বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর (এসএসএফ) কঠোর নিরাপত্তায় থাকবেন।
তবে সাধারণত বিদায়ী সরকার প্রধান এ ধরনের সুবিধা পাওয়ার রেওয়াজ দেশে না থাকলেও তিনি এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করেন। কিন্তু সেটি বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় এর ওয়েবসাইটে না থাকায় এ বিষয়ে উঠেছে নানান প্রশ্ন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র দুদিন আগে (১০ ফেব্রুয়ারি) এ সংক্রান্ত গেজেট জারি করা হলেও সেটি এখন বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস) এর ওয়েবসাইটে নেই। সাধারণত সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সব গেজেট এই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। পুরনো সব গেজেটও এই ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে বিজি প্রেসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেছেন, ‘এ বিষয়ে সরকারি নির্দেশনাই অনুসরণ করেছেন তারা।
তবে সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ওই গেজেট অনুযায়ী ড. ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার পর এক বছর পর্যন্ত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ সুবিধা পাবেন।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই, বিশেষ নিরাপত্তা আইন (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) ২০২১ এর ১২ ধারায় দেওয়া ক্ষমতাবলে গত ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫ এ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫ এর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল।
অধ্যাপক ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ের প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে লিখেছেন, এসএসএফ সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান উপদেষ্টা কোনো আইন লঙ্ঘন করেননি। এ বিষয়ে যে আদেশ জারি করা হয়েছে, তা এসএসএফের একটি প্রক্রিয়াগত বাধ্যবাধকতা।
আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া এসএসএফ কোনো সাবেক সরকার প্রধানকে নিরাপত্তা দেয় না। সুতরাং এটি অস্বাভাবিক বা নজিরবিহীন কোনো বিষয় নয়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ২০০১ সালে বিচারপতি লতিফুর রহমানও দায়িত্ব ছাড়ার আগে এ ধরনের একটি আদেশ হয়েছিল।
গেজেট প্রকাশ
প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ করা গেজেটে বলা হয়েছে, সরকার বিশেষ নিরাপত্তা আইন ২০২১ এর ধারা ২ (ক) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে তাহার দায়িত্ব হস্তান্তরের তারিখ হইতে ১ (এক) বৎসরের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করিল।
ফলে আবার অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েই করা রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫ অনুযায়ী ড. ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে এক বছর এসএসএফ সুবিধা পাবেন।
তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সচিব মোঃ সাইফুল্লা পান্না এ প্রজ্ঞাপনে সই করেছিলেন। তিনি এখন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত।
এদিকে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার শপথ গ্রহণ করায় ওইদিনই ড. ইউনূসের সরকারের মেয়াদ শেষ হয়। তবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে তার সরকার অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করে যে গেজেট করেছে সেটি এখন সরকারি মুদ্রণালয়ের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, অনেক সময় কোনো সংস্থা গেজেট করলে গেজেটের আদেশের কপি ওয়েবসাইটে না দেওয়ার নির্দেশনা দেয়। তখন আমরা সে অনুযায়ী কাজ করছি। এ ক্ষেত্রেও সরকারি নির্দেশনার কারণেই এটি ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়নি।
ওদিকে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তার সরকারি বাসভবন ছেড়ে গেছেন। তিনি ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার শপথ নিয়েছিলেন। এখন এক বছরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে ঘোষণা করায় তিনি এসএসএফ নিরাপত্তা সুবিধা পাবেন।
এর আগে ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধিমালা ২০২৫’-এর গেজেট জারির পর সরকারি বার্তা সংস্থার (বাসস) খবরে বলা হয়েছিল ‘রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কার্যালয় এবং স্থায়ী ও অস্থায়ী বাসভবনের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব মহাপরিচালকের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং ওই স্থাপনাগুলোতে দুর্যোগ বা দুর্ঘটনা (যেমন:-অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্প ইত্যাদি) হতে নিরাপদ রাখার জন্য মহাপরিচালক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থাসমূহের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন ও তদারকি করবেন।
গেজেটে আরও বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের বিভিন্ন বেষ্টনীতে মোতায়েনের মাধ্যমে মহাপরিচালক, এই বিধিমালা ও তদধীন প্রণীত নির্দেশাবলী অনুসরণে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করবেন, এবং প্রয়োজনবোধে মহাপরিচালক এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সামরিক সচিবের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারবেন।
গেজেট অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী বা প্রধান উপদেষ্টা ও অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কার্যালয়, বাসভবন ও অনুষ্ঠানস্থলে আগত দর্শনার্থী, যানবাহন বা যে কোনো বস্তুর প্রবেশ বা বাহির বাহিনীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে এবং বাহিনী এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করবে।
গেজেটে অনুষ্ঠানস্থলে অস্ত্র বহনে বিধি-নিষেধ আরোপ করে বলা হয়েছে, বাহিনীর কর্মকর্তা ছাড়া সাদা পোশাক পরিহিত অন্য কেউ অনুষ্ঠানস্থলে কোনো প্রকার অস্ত্র বহন করতে পারবে না এবং অনুষ্ঠানস্থলে নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ইউনিফর্ম পরিহিত ব্যক্তিরা দৃশ্যমান অবস্থা ব্যতিরেকে অন্য কোনোভাবে অস্ত্র বহন করতে পারবেন না।
এ সুবিধা পেয়েছেন যারঃ-
২০০১ সালে নির্দলীয় সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকেও এক বছরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে সাধারণত বিদায়ী সরকার প্রধান এসএসএফ সুবিধা পাওয়ার রেওয়াজ বাংলাদেশে নেই। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীত্ব ছেড়ে বিরোধী দলে যাওয়ার পর এসএসএফ সুবিধা তারা পাননি।
সম্প্রতি বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ঘোষণা করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ওই ঘোষণার পর তার নিরাপত্তা এসএসএফ মোতায়েন করা হয়েছিল।
তখন বলা হয়েছিল, আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থানরত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে খালেদা জিয়াকে এসএসএফ দৈহিক নিরাপত্তা প্রদান করবে। তার নিরাপত্তার বিঘ্ন ঘটাতে পারে, এমন বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। (সূত্রঃ-বিবিসি বাংলা)।












