রণকৌশল পরিবর্তন করলো ইরান
- আপডেট সময় : ১২:৪৩:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬
- / ১০৩০ বার পড়া হয়েছে
রণকৌশল পরিবর্তন করলো ইরান
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
আমেরিকা-ইসরায়েল কতৃক ইরানের উপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ১১তম দিনে রণকৌশলে পরিবর্তন এনেছে তেহরান। গত রোববার ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজিদ মুসাভি জানিয়েছেন, এখন থেকে ইরান শুধু সেসব মিসাইল নিক্ষেপ করবে, যেগুলোর পেলোড বা গোলাবারুদ বহন ক্ষমতা এক হাজার কেজি (১ টন) বা তার বেশি।
সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘোষণাটি যুদ্ধের ময়দানে একটি বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান এখন ‘সংখ্যা’ কমিয়ে ‘বিধ্বংসী ক্ষমতা’ বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরানের কৌশল ছিল সস্তা কিন্তু কার্যকর শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের মাধ্যমে ইসরায়েল ও আমেরিকার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে (প্যাট্রিয়ট বা অ্যারো-৩ ইন্টারসেপ্টর) ব্যস্ত রাখা। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ‘স্যাচুরেশন অ্যাটাক’, অর্থাৎ একসঙ্গে এত বেশি ড্রোন ও সস্তা মিসাইল ছোড়া যাতে শত্রুপক্ষ তাদের দামি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল খরচ করে ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
কিন্তু এখন ইরান সরাসরি খোররামশাহর-৪ বা খাইবারের মতো ভারী ব্যালিস্টিক মিসাইলের ওপর জোর দিচ্ছে। এগুলো এক হাজার কেজি বা তার বেশি ওজনের বিস্ফোরক বহন করে, যা ড্রোনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে সক্ষম। এটি কেবল লক্ষ্যবস্তুই ধ্বংস করবে না, বরং এর ‘ব্লাস্ট রেডিয়াস’ বা বিস্ফোরণের এলাকাও হবে অনেক বড়।
জেনারেল মুসাভি জানিয়েছেন, এই মিসাইলগুলো ম্যাক-৮-এর বেশি গতিতে চলে এবং এর ট্র্যাজেক্টরি বা গতিপথ পরিবর্তন করা যায়, যা ইসরায়েলের ‘অ্যারো-৩’-এর মতো উন্নত ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
ড্রোনের ক্ষেত্রে আমেরিকা-ইসরায়েলকে অর্থ খরচ করিয়ে ক্লান্ত করা যেত, কিন্তু ভারী মিসাইলের ক্ষেত্রে ‘ব্যর্থতার মূল্য’ আকাশচুম্বী। একটি এক টনের মিসাইল যদি একবার লক্ষ্যভেদে সফল হয়, তবে তা একটি পুরো বিমানঘাঁটি বা আন্ডারগ্রাউন্ড কমান্ড সেন্টারকে অচল করে দিতে পারে।
লেবানিজ সংবাদমাধ্যম ‘আল মায়াদিন’-এর বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, দুবাইয়ের বিমানবন্দর এবং সৌদি আরবের বিখ্যাত রাস তানুরাজ তৈল শোধনাগারের মতো আঞ্চলিক পরিকাঠামোগুলো এখন ইরানের প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সংকটের আশঙ্কা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বর্তমানে ইরানের অস্ত্রাগারে ১ হাজার কেজির বেশি বিস্ফোরক বহনে সক্ষম বেশ কিছু শক্তিশালী মিসাইল রয়েছে। খোররামশাহ ১ হাজার ৮শ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক নিয়ে ২ হাজার কিলোমিটার দূরে আঘাত হানতে পারে।
এটি মূলত উত্তর কোরিয়ার হাসং-১০ প্রযুক্তির উন্নত সংস্করণ। সলিড ফুয়েলচালিত মাঝারি পাল্লার সেজিল মিসাইল দুই হাজার কিলোমিটার দূরে হামলা চালাতে সক্ষম। তিন হাজার কিলোমিটার পাল্লার ক্রুজ মিসাইল সুমার পারমাণবিক অস্ত্র বহনেও সক্ষম বলে ধারণা করা হয়।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শানাকা আনসেলম পেরেরার মতে, ইরান এখন যুদ্ধের ‘ইন্টারসেপ্ট ম্যাথ’ বা গাণিতিক সমীকরণ বদলে দিচ্ছে। এর আগে একটি ড্রোন ধ্বংস করতে চার মিলিয়ন ডলারের প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যবহার করা হতো—যা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিকর ছিল।
কিন্তু এখন এক টনের একটি মিসাইল আটকাতে যদি রক্ষাকারী বাহিনী একটি ইন্টারসেপ্টর মিসাইল মিস করে, তবে তার পরিণতি হবে কয়েক শ ড্রোনের চেয়েও ভয়াবহ। রক্ষাকারীদের এখন প্রতিটি ইনকামিং মিসাইল আটকাতে আরও বেশিসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর মোতায়েন করতে হবে, যা তাদের মজুতকে আরও দ্রুত শূন্য করে ফেলবে।
মোজতবা খামেনির নেতৃত্বে ইরানের নতুন সামরিক প্রশাসন এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে উঠেছে। ১ হাজার কেজি বিস্ফোরকের হুমকি কেবল কোনো মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ নয়, বরং এটি যুদ্ধের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়ার একটি স্পষ্ট সংকেত। আমেরিকার ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জবাবে তেহরানের এই ‘হেভি পেলোড’ নীতি মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘস্থায়ী ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
আস্থা/এমএইচ



















