ঢাকা ১০:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ০১ জুন ২০২৬, ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন

১ টাকায় ১টি গালি: যেভাবে ‘বট সার্ভিস’ কেনাবেচা হচ্ছে অনলাইনে

Doinik Astha
Doinik Astha
  • আপডেট সময় : ১০:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬
  • / ৯৯৯ বার পড়া হয়েছে

ছবি সংগৃহীত

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন আব্দুল কাদের।

ওই সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা আব্দুল কাদেরের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালান।

জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ৭ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ৫৮ মিনিটে আব্দুল কাদেরের, অর্থাৎ ব্যালট নম্বর ২-এর পক্ষে ভোট চেয়ে একটি  পোস্ট শেয়ার করেন। পোস্টটিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ রিঅ্যাক্ট করেন এবং ১০ হাজারের বেশি মন্তব্য করেন।

তবে পোস্টটি প্রকাশের দুই মিনিট পর, অর্থাৎ রাত ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে শত শত অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের মন্তব্য আসতে থাকে—“Sorry bro. It’s Only 22”।

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ হয়ে ভিপি পদে নির্বাচন করেছিলেন ছাত্রশিবির নেতা মো. আবু সাদিক কায়েম। তার ব্যালট নম্বর ছিল ২২।

অর্থাৎ, কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত ফেসবুক ব্যবহারকারী একই বাক্য লিখে শিবির নেতা সাদিক কায়েমের পক্ষে মন্তব্য করতে থাকেন।

দ্য ডিসেন্ট দৈবচয়নের ভিত্তিতে এমন ৫০টি অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, “Sorry bro. It’s Only 22” মন্তব্য করা ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ছাড়া কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন।

তবে সংঘবদ্ধ আচরণ করা অ্যাকাউন্টগুলো বিভিন্ন নামে থাকলেও সেগুলো অটোমেটেড বট নয়। যাচাই করে দেখা গেছে, এসব মন্তব্য করা বেশিরভাগ অ্যাকাউন্টই জামায়াত-শিবিরের পক্ষে নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে থাকে।

অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যে শত শত ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট শব্দগুচ্ছ মন্তব্য করে সেটিকে ট্রেন্ডে পরিণত করেন।

কমেন্ট বক্সে নির্দিষ্ট দল, মত বা ব্যক্তির পক্ষে সংঘবদ্ধ প্রচারণার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে কারও পোস্ট অপছন্দ হলে ‘বট অ্যাকাউন্ট’ দিয়ে ‘হা হা ইমোজি’ আক্রমণ করা হয়।

গত ২৩ এপ্রিল ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভুয়া স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই ঘটনার সংবাদ কাভার করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অন্তত ১০ জন সাংবাদিক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সমকালের সাংবাদিক রাজীব আহাম্মদ ২৩ এপ্রিল এক ফেসবুক পোস্টে প্রচারিত স্ক্রিনশটটি গুজব, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘাত এবং এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগের উসকানিসহ কয়েকটি বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।

 পোস্টটি দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই সেখানে আড়াই হাজারের বেশি ‘হা হা’ রিঅ্যাকশন পড়ে।

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, সেখানে ‘হা হা’ দেওয়া এক হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট বাস্তব ব্যবহারকারীর নয়। ‘ওয়ার্ড মারান্ডে’, ‘গালেগোস ডাকোটা’, ‘হুবার লুসিনা’, ‘ডিয়া টাং বাং’, ‘আলেক্স মাকিনা’, ‘ফিয়াং ডেং খাই’সহ ভিয়েতনামি নামের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এসব রিঅ্যাকশন দেওয়া হয়েছে।

এসব অ্যাকাউন্ট যাচাই করে দেখা যায়, বেশিরভাগই প্রোফাইল লক করা। এগুলোর ফলোয়ার ও পোস্ট সংখ্যা শূন্য। এমনকি অনেক অ্যাকাউন্টে কোনো প্রোফাইল ছবিও নেই।

ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা ‘হা হা’ রিঅ্যাকশন দেওয়ার বাইরে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনেও বট ও পেইড কমেন্ট সার্ভিস ব্যবহৃত হচ্ছে।

দ্য ডিসেন্ট সম্প্রতি ৫০টি ফেসবুক পেজে গত এক মাসে ৫৯০টি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে, যেখানে মিজানুর রহমান আজহারির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অননুমোদিত যৌনশক্তিবর্ধক পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

এসব বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কৃত্রিম ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া, পণ্য রিভিউ ও মন্তব্য তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।

দ্য ডিসেন্ট এমন একাধিক পোস্ট খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। একই অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক পোস্টে একই মন্তব্য করতেও দেখা গেছে।

এসব মন্তব্যকারী অ্যাকাউন্টের অন্তত ২০টি যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর প্রোফাইল লক করা, অথবা প্রোফাইলে শনাক্তযোগ্য তথ্য বা ছবি নেই।

তবে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই সময়ে একই মন্তব্য করা হলেও প্রোফাইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলো অটোমেটেড বট নয়। বরং এগুলো বাস্তব ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট, যারা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে বা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পোস্টে মন্তব্য করেন।

বট কী?

সামাজিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বট অ্যাকাউন্টের ব্যবহার বাড়ছে। কোনো মতামতকে জনপ্রিয় দেখানো, ভুয়া প্রচারণা চালানো বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমন্বিতভাবে অসংখ্য বট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করা হয়।

এতে অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীরা ভুল তথ্যকে সত্য বা সঠিক তথ্যকে অসত্য বলে ধরে নিয়ে বিভ্রান্ত হন।

বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ থেকে তারকা কিংবা ইনফ্লুয়েন্সার—অনেকেই দাবি করেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট বা বটবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু বট কী? বট কীভাবে কাজ করে?

‘বট’ শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ থেকে। বট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টগুলো দেখতে সাধারণ ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টের মতো হলেও এর পেছনে থাকে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম, যা নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।

এসব অ্যাকাউন্ট মানুষের আচরণ অনুকরণ করে অনলাইনে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বট অ্যাকাউন্টের সক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে এসব বট অ্যাকাউন্টে এআই যুক্ত করে নির্দিষ্ট কমান্ড সেট করে দিলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেন্ট তৈরি ও পোস্ট করতে পারে।

শুধু পোস্ট নয়, ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের জন্য যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এসব বট অ্যাকাউন্ট।

বট অ্যাকাউন্ট মূলত অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড, হ্যাশট্যাগ বা ট্রেন্ড অনুসরণ করে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা স্বাভাবিক ব্যবহারকারীর পক্ষে সম্ভব নয়।

যদিও বাংলাদেশের অনলাইন পরিসরে অনেকে সত্যিকারের সংঘবদ্ধ অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক থেকে চালানো সংঘবদ্ধ আচরণকে ‘বট’ এর কার্যক্রম বলে ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে এত অ্যাকাউন্ট কীভাবে চলে?

একাধিক বট অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে পরিচালনার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার, স্ক্রিপ্ট ও অটোমেশন টুল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সিস্টেম বা সার্ভারের মাধ্যমে শত শত, এমনকি হাজারো অ্যাকাউন্ট একযোগে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

এসব সিস্টেমে আগে থেকেই নির্দিষ্ট নির্দেশনা, সময়সূচি ও কনটেন্ট সেট করে দেওয়া থাকে।

এ ক্ষেত্রে ‘ফোন ফার্মিং’ নামের একটি পদ্ধতিও ব্যবহৃত হয়। এতে একটি স্থানে অনেকগুলো স্মার্টফোন একসঙ্গে স্থাপন করে প্রতিটি ফোনে আলাদা অ্যাকাউন্ট চালানো হয়। বিশেষ সফটওয়্যার বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ফোন একসঙ্গে পরিচালিত হয়।

ফোন ফার্মিংয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে বহু মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কার্যক্রম চালানো যায়। এসব ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, কনটেন্টে লাইক-কমেন্ট-শেয়ার বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট পোস্ট বা পেজের এনগেজমেন্ট কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর কাজ করা হয়।

পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দেখা বা ক্লিক করার মাধ্যমে আয় দেখানোর চেষ্টা, অ্যাপ ডাউনলোড ও ব্যবহার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান কৃত্রিমভাবে তৈরি করা, এমনকি ভুয়া ট্রাফিক জেনারেট করার মতো কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।

এর ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাস্তব ব্যবহারকারীর আচরণকে বিকৃত করে কৃত্রিম জনপ্রিয়তা বা প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়।

এ ছাড়া আইপি ঠিকানা গোপন রাখতে ভিপিএন বা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করা হয়, যাতে একাধিক অ্যাকাউন্ট একই উৎস থেকে পরিচালিত হচ্ছে—এটি সহজে শনাক্ত করা না যায়।

এসব সমন্বিত ব্যবস্থার কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয়ে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা বা প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর শুভাশীষ দীপ দ্য ডিসেন্টকে জানান, “ফেসবুক খুব বেশি পপুলিস্ট (জনতুষ্টিবাদী) হয়ে গেছে। যখন ফেসবুকের কোনো পোস্টে অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে একসঙ্গে কোনো একটি বিষয়ে কমেন্ট করা হয়, তখন অ্যালগরিদম ধরে নেয়, এই পোস্টের ক্যাপাসিটি রয়েছে এবং পোস্টটিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এই ব্যবস্থাকেই অনেকে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ম্যানিপুলেট করে। মেটার অ্যালগরিদম যদি জেনুইন ট্র্যাকশন এবং অটোমেটেড ট্র্যাকশন শনাক্ত করতে পারত, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হতো। ফেসবুক বর্তমানে অটোমেটেড বট অ্যাকাউন্ট ডিটেকশনে (স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণে) ভালো কাজ করে। অটোমেটেড বট অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হলেও, সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক দিনের মধ্যেই ফেসবুক শনাক্ত করে বন্ধ করে দেয়। যদি মেটা অটোমেটেড (স্বয়ংক্রিয়) বা কো-অর্ডিনেটেড কমেন্ট (সমন্বিত মন্তব্য) শনাক্তকরণের ব্যবস্থা নিয়ে আসে, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।”

বট অ্যাকাউন্ট ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট

বট অ্যাকাউন্ট ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট—দুটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে এদের প্রকৃতি এক নয়।

বট অ্যাকাউন্ট হলো স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্ট, যা নির্দিষ্ট কমান্ড অনুযায়ী নিজে থেকেই পোস্ট করা, লাইক-কমেন্ট করা বা কনটেন্ট শেয়ার করার মতো কাজ করে। এসব অ্যাকাউন্টে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ খুব সীমিত বা অনেক সময় থাকে না।

অন্যদিকে, ভুয়া অ্যাকাউন্ট সাধারণত বাস্তব মানুষই তৈরি ও পরিচালনা করেন। তবে সেখানে ভুয়া নাম, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এটি স্বয়ংক্রিয় নয়; বরং উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচয় গোপন বা ভিন্ন পরিচয়ে অনলাইনে সক্রিয় থাকার একটি মাধ্যম।

ফলে বট অ্যাকাউন্টের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়তা। আর ভুয়া বা ফেক অ্যাকাউন্টের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে মানব-নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম চালানো।

কারা দিচ্ছে এই ‘বট সার্ভিস’?

দ্য ডিসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ২৫টি পেজ শনাক্ত  করেছে, যারা টাকার বিনিময়ে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ফলোয়ার ও রিভিউ দিয়ে থাকে।

নেতিবাচক কমেন্টগুলোতে দ্য ডিসেন্টকে লক্ষ্য করে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষণে গালি দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১০টির মধ্যে ৮টি অ্যাকাউন্টই বিভিন্ন ব্যক্তির নামে। তবে সবগুলো প্রোফাইল লক করা অবস্থায় দেখা যায়।

অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ১ টাকায় একটি মন্তব্য বিক্রি করে। তবে তাদের কাছে নেতিবাচক মন্তব্য (গালিগালাজা) কিনতে চাইলে তারা প্রতিটি মন্তব্যের জন্য ৫ টাকা দাবি করেন।

Solutions Point নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও একই পোস্টে ১০ টাকার বিনিময়ে ১০টি নেতিবাচক মন্তব্য (গালিগালাজ) কেনে দ্য ডিসেন্ট।

কমেন্ট করা প্রোফাইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রোফাইলগুলো বাংলাদেশি নামে হলেও সবগুলো প্রোফাইল লক করা এবং তাদের ফলোয়ার সংখ্যা শূন্য।

‘দুই রাজনৈতিক দলকে সার্ভিস দেওয়ার’ দাবি

রাজনৈতিক বট কমেন্ট কেনার কথা বলে দ্য ডিসেন্ট Solutions Point-এর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে।

বট কমেন্টে তারা কতটা সক্ষম—এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা মুশফিক নামের একজন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারা দুটি রাজনৈতিক দলকে বট সার্ভিস দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই বট অ্যাটাকগুলোকে আরও সুসংগঠিতভাবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় বা বড় কোনো রাজনৈতিক ইস্যু চলাকালীন নির্দিষ্ট কোনো হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং করাতে বা বিরোধী পক্ষের কোনো পোস্ট গণ-রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে নামিয়ে দিতে এই বট নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহৃত হয়।”

তবে নির্বাচনের সময় কোন দুটি রাজনৈতিক দলের হয়ে তারা কাজ করেছেন, তা তিনি প্রকাশ করেননি। দুটি রাজনৈতিক দলের হয়ে বট আক্রমণ করার প্রমাণ চাওয়া হলেও তারা তা দিতে অস্বীকার করেন।

মুশফিক জানান, রাজনৈতিক ইস্যুতে কথা বলতে বাংলাদেশি মানুষের নামে তৈরি করা বট ব্যবহার করা হয়।

তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশি ফলোয়ার’ বা ‘বিডি কমেন্ট’ সার্ভিস ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে মনে হয় দেশের সাধারণ মানুষই এসব মন্তব্য করছে।

অনেক ক্ষেত্রে এই বটগুলো ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে গুজব বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কমেন্ট ও রিভিউ কেনা যায়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হিডেন ডেটা’ বা প্রোফাইল লক করা অ্যাকাউন্টগুলো দেখলে সহজে বোঝা যায় যে এগুলো বট অ্যাটাক। তবে বর্তমানে বাংলাদেশি প্রোফাইল থেকেও কমেন্ট, রিভিউ বা প্রতিক্রিয়া কেনা যায়, যা সহজে শনাক্ত করা যায় না।

প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১০ লাখ কমেন্ট কিনতে চাইলে তারা ৩৮ হাজার টাকা দাবি করে। তাদের মাসিক আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানায়, গড়ে ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। তবে কোনো ইভেন্ট থাকলে আয় বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বট নেটওয়ার্ক

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই বাংলাদেশে ‘বট’ শব্দটির সঙ্গে অনেকের পরিচয় ঘটে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তথ্য ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করা ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাই ও গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বছরের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সমর্থনে ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক প্রোফাইল নিয়ে একটি বড় বট নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই নেটওয়ার্ক ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য পোস্ট করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন এবং বিএনপির সমালোচনা করে।

এই অনুসন্ধান থেকে বাংলাদেশের বট আইডিগুলোর একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়—একই মন্তব্য শতাধিক প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা বট আইডিগুলোর ৭৭ শতাংশ প্রোফাইল নারীদের নামে তৈরি। অধিকাংশ বট আইডির প্রোফাইলেই একই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ডিসমিসল্যাবের গবেষণা বলছে, বট নেটওয়ার্কের বিস্তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্ভুল তথ্যব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ধরনের নেটওয়ার্ক অন্য মতামতকে দমন করতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করে জনপরিসরের আলোচনাকে বিকৃত করতে পারে। এই কারসাজি জনমতকে মেরুকরণ করতে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে।

ট্যাগস :

ডিজিটাল ইনভেস্টিগেশন

১ টাকায় ১টি গালি: যেভাবে ‘বট সার্ভিস’ কেনাবেচা হচ্ছে অনলাইনে

আপডেট সময় : ১০:৩৭:৫৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১ জুন ২০২৬

২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ডাকসু নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ প্যানেল থেকে ভিপি পদে প্রার্থী হয়েছিলেন আব্দুল কাদের।

ওই সময় জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতা আব্দুল কাদেরের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা চালান।

জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ৭ সেপ্টেম্বর রাত ৯টা ৫৮ মিনিটে আব্দুল কাদেরের, অর্থাৎ ব্যালট নম্বর ২-এর পক্ষে ভোট চেয়ে একটি  পোস্ট শেয়ার করেন। পোস্টটিতে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ রিঅ্যাক্ট করেন এবং ১০ হাজারের বেশি মন্তব্য করেন।

তবে পোস্টটি প্রকাশের দুই মিনিট পর, অর্থাৎ রাত ১০টা থেকে ১০টা ১৫ মিনিটের মধ্যে শত শত অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের মন্তব্য আসতে থাকে—“Sorry bro. It’s Only 22”।

ডাকসু নির্বাচনে ইসলামী ছাত্রশিবির-সমর্থিত ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের’ হয়ে ভিপি পদে নির্বাচন করেছিলেন ছাত্রশিবির নেতা মো. আবু সাদিক কায়েম। তার ব্যালট নম্বর ছিল ২২।

অর্থাৎ, কয়েক মিনিটের মধ্যে শত শত ফেসবুক ব্যবহারকারী একই বাক্য লিখে শিবির নেতা সাদিক কায়েমের পক্ষে মন্তব্য করতে থাকেন।

দ্য ডিসেন্ট দৈবচয়নের ভিত্তিতে এমন ৫০টি অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে দেখেছে, “Sorry bro. It’s Only 22” মন্তব্য করা ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন ছাড়া কেউ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নন।

তবে সংঘবদ্ধ আচরণ করা অ্যাকাউন্টগুলো বিভিন্ন নামে থাকলেও সেগুলো অটোমেটেড বট নয়। যাচাই করে দেখা গেছে, এসব মন্তব্য করা বেশিরভাগ অ্যাকাউন্টই জামায়াত-শিবিরের পক্ষে নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে থাকে।

অর্থাৎ, অল্প সময়ের মধ্যে শত শত ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট শব্দগুচ্ছ মন্তব্য করে সেটিকে ট্রেন্ডে পরিণত করেন।

কমেন্ট বক্সে নির্দিষ্ট দল, মত বা ব্যক্তির পক্ষে সংঘবদ্ধ প্রচারণার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে কারও পোস্ট অপছন্দ হলে ‘বট অ্যাকাউন্ট’ দিয়ে ‘হা হা ইমোজি’ আক্রমণ করা হয়।

গত ২৩ এপ্রিল ফেসবুকে ছড়ানো একটি ভুয়া স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। ওই ঘটনার সংবাদ কাভার করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত অন্তত ১০ জন সাংবাদিক ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন।

এর পরিপ্রেক্ষিতে সমকালের সাংবাদিক রাজীব আহাম্মদ ২৩ এপ্রিল এক ফেসবুক পোস্টে প্রচারিত স্ক্রিনশটটি গুজব, ছাত্রদল-ছাত্রশিবিরের সংঘাত এবং এর নেপথ্যে আওয়ামী লীগের উসকানিসহ কয়েকটি বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।

 পোস্টটি দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই সেখানে আড়াই হাজারের বেশি ‘হা হা’ রিঅ্যাকশন পড়ে।

দ্য ডিসেন্ট যাচাই করে দেখেছে, সেখানে ‘হা হা’ দেওয়া এক হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট বাস্তব ব্যবহারকারীর নয়। ‘ওয়ার্ড মারান্ডে’, ‘গালেগোস ডাকোটা’, ‘হুবার লুসিনা’, ‘ডিয়া টাং বাং’, ‘আলেক্স মাকিনা’, ‘ফিয়াং ডেং খাই’সহ ভিয়েতনামি নামের বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে এসব রিঅ্যাকশন দেওয়া হয়েছে।

এসব অ্যাকাউন্ট যাচাই করে দেখা যায়, বেশিরভাগই প্রোফাইল লক করা। এগুলোর ফলোয়ার ও পোস্ট সংখ্যা শূন্য। এমনকি অনেক অ্যাকাউন্টে কোনো প্রোফাইল ছবিও নেই।

ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বা ‘হা হা’ রিঅ্যাকশন দেওয়ার বাইরে অনলাইন মার্কেটপ্লেসে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনেও বট ও পেইড কমেন্ট সার্ভিস ব্যবহৃত হচ্ছে।

দ্য ডিসেন্ট সম্প্রতি ৫০টি ফেসবুক পেজে গত এক মাসে ৫৯০টি বিজ্ঞাপন শনাক্ত করেছে, যেখানে মিজানুর রহমান আজহারির নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন অননুমোদিত যৌনশক্তিবর্ধক পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।

এসব বিজ্ঞাপনকে বিশ্বাসযোগ্য দেখাতে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে কৃত্রিম ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া, পণ্য রিভিউ ও মন্তব্য তৈরি করে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চলছে।

দ্য ডিসেন্ট এমন একাধিক পোস্ট খুঁজে পেয়েছে, যেখানে একই সময়ে কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক মন্তব্য করা হয়েছে। একই অ্যাকাউন্ট থেকে একাধিক পোস্টে একই মন্তব্য করতেও দেখা গেছে।

এসব মন্তব্যকারী অ্যাকাউন্টের অন্তত ২০টি যাচাই করে দেখা গেছে, সেগুলোর প্রোফাইল লক করা, অথবা প্রোফাইলে শনাক্তযোগ্য তথ্য বা ছবি নেই।

তবে একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই সময়ে একই মন্তব্য করা হলেও প্রোফাইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেগুলো অটোমেটেড বট নয়। বরং এগুলো বাস্তব ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্ট, যারা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সাধনে বা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন পোস্টে মন্তব্য করেন।

বট কী?

সামাজিক, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে বট অ্যাকাউন্টের ব্যবহার বাড়ছে। কোনো মতামতকে জনপ্রিয় দেখানো, ভুয়া প্রচারণা চালানো বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সমন্বিতভাবে অসংখ্য বট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় করা হয়।

এতে অনেক সময় সাধারণ ব্যবহারকারীরা ভুল তথ্যকে সত্য বা সঠিক তথ্যকে অসত্য বলে ধরে নিয়ে বিভ্রান্ত হন।

বাংলাদেশে রাজনীতিবিদ থেকে তারকা কিংবা ইনফ্লুয়েন্সার—অনেকেই দাবি করেছেন, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট বা বটবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

কিন্তু বট কী? বট কীভাবে কাজ করে?

‘বট’ শব্দটি এসেছে ‘রোবট’ থেকে। বট দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্টগুলো দেখতে সাধারণ ব্যবহারকারীর অ্যাকাউন্টের মতো হলেও এর পেছনে থাকে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা প্রোগ্রাম, যা নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করে।

এসব অ্যাকাউন্ট মানুষের আচরণ অনুকরণ করে অনলাইনে বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে পারে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বট অ্যাকাউন্টের সক্ষমতাও বেড়েছে। বর্তমানে এসব বট অ্যাকাউন্টে এআই যুক্ত করে নির্দিষ্ট কমান্ড সেট করে দিলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কনটেন্ট তৈরি ও পোস্ট করতে পারে।

শুধু পোস্ট নয়, ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করা থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যমে নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের জন্য যেভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়, সেভাবেই কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে এসব বট অ্যাকাউন্ট।

বট অ্যাকাউন্ট মূলত অ্যালগরিদম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কীওয়ার্ড, হ্যাশট্যাগ বা ট্রেন্ড অনুসরণ করে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা স্বাভাবিক ব্যবহারকারীর পক্ষে সম্ভব নয়।

যদিও বাংলাদেশের অনলাইন পরিসরে অনেকে সত্যিকারের সংঘবদ্ধ অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক থেকে চালানো সংঘবদ্ধ আচরণকে ‘বট’ এর কার্যক্রম বলে ভুল করে থাকেন।

একসঙ্গে এত অ্যাকাউন্ট কীভাবে চলে?

একাধিক বট অ্যাকাউন্ট একসঙ্গে পরিচালনার জন্য বিশেষ সফটওয়্যার, স্ক্রিপ্ট ও অটোমেশন টুল ব্যবহার করা হয়। সাধারণত একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল সিস্টেম বা সার্ভারের মাধ্যমে শত শত, এমনকি হাজারো অ্যাকাউন্ট একযোগে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

এসব সিস্টেমে আগে থেকেই নির্দিষ্ট নির্দেশনা, সময়সূচি ও কনটেন্ট সেট করে দেওয়া থাকে।

এ ক্ষেত্রে ‘ফোন ফার্মিং’ নামের একটি পদ্ধতিও ব্যবহৃত হয়। এতে একটি স্থানে অনেকগুলো স্মার্টফোন একসঙ্গে স্থাপন করে প্রতিটি ফোনে আলাদা অ্যাকাউন্ট চালানো হয়। বিশেষ সফটওয়্যার বা রিমোট কন্ট্রোল ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব ফোন একসঙ্গে পরিচালিত হয়।

ফোন ফার্মিংয়ের মাধ্যমে একসঙ্গে বহু মোবাইল ডিভাইস ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কার্যক্রম চালানো যায়। এসব ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয়ভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, কনটেন্টে লাইক-কমেন্ট-শেয়ার বৃদ্ধি এবং নির্দিষ্ট পোস্ট বা পেজের এনগেজমেন্ট কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর কাজ করা হয়।

পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন দেখা বা ক্লিক করার মাধ্যমে আয় দেখানোর চেষ্টা, অ্যাপ ডাউনলোড ও ব্যবহার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান কৃত্রিমভাবে তৈরি করা, এমনকি ভুয়া ট্রাফিক জেনারেট করার মতো কার্যক্রমও পরিচালিত হয়।

এর ফলে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাস্তব ব্যবহারকারীর আচরণকে বিকৃত করে কৃত্রিম জনপ্রিয়তা বা প্রভাব তৈরি করা সম্ভব হয়।

এ ছাড়া আইপি ঠিকানা গোপন রাখতে ভিপিএন বা প্রক্সি সার্ভার ব্যবহার করা হয়, যাতে একাধিক অ্যাকাউন্ট একই উৎস থেকে পরিচালিত হচ্ছে—এটি সহজে শনাক্ত করা না যায়।

এসব সমন্বিত ব্যবস্থার কারণেই অল্প সময়ের মধ্যে বিপুলসংখ্যক বট অ্যাকাউন্ট সক্রিয় হয়ে কোনো নির্দিষ্ট বার্তা বা প্রচারণা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে।

তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টওয়াচের অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর শুভাশীষ দীপ দ্য ডিসেন্টকে জানান, “ফেসবুক খুব বেশি পপুলিস্ট (জনতুষ্টিবাদী) হয়ে গেছে। যখন ফেসবুকের কোনো পোস্টে অনেক অ্যাকাউন্ট থেকে একসঙ্গে কোনো একটি বিষয়ে কমেন্ট করা হয়, তখন অ্যালগরিদম ধরে নেয়, এই পোস্টের ক্যাপাসিটি রয়েছে এবং পোস্টটিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। এই ব্যবস্থাকেই অনেকে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ম্যানিপুলেট করে। মেটার অ্যালগরিদম যদি জেনুইন ট্র্যাকশন এবং অটোমেটেড ট্র্যাকশন শনাক্ত করতে পারত, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হতো। ফেসবুক বর্তমানে অটোমেটেড বট অ্যাকাউন্ট ডিটেকশনে (স্বয়ংক্রিয় বট অ্যাকাউন্ট শনাক্তকরণে) ভালো কাজ করে। অটোমেটেড বট অ্যাকাউন্ট তৈরি করা হলেও, সেটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক দিনের মধ্যেই ফেসবুক শনাক্ত করে বন্ধ করে দেয়। যদি মেটা অটোমেটেড (স্বয়ংক্রিয়) বা কো-অর্ডিনেটেড কমেন্ট (সমন্বিত মন্তব্য) শনাক্তকরণের ব্যবস্থা নিয়ে আসে, তাহলে এই সমস্যার সমাধান হতে পারে।”

বট অ্যাকাউন্ট ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট

বট অ্যাকাউন্ট ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট—দুটিই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। তবে এদের প্রকৃতি এক নয়।

বট অ্যাকাউন্ট হলো স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অ্যাকাউন্ট, যা নির্দিষ্ট কমান্ড অনুযায়ী নিজে থেকেই পোস্ট করা, লাইক-কমেন্ট করা বা কনটেন্ট শেয়ার করার মতো কাজ করে। এসব অ্যাকাউন্টে মানুষের সরাসরি অংশগ্রহণ খুব সীমিত বা অনেক সময় থাকে না।

অন্যদিকে, ভুয়া অ্যাকাউন্ট সাধারণত বাস্তব মানুষই তৈরি ও পরিচালনা করেন। তবে সেখানে ভুয়া নাম, ছবি বা পরিচয় ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ এটি স্বয়ংক্রিয় নয়; বরং উদ্দেশ্যমূলকভাবে পরিচয় গোপন বা ভিন্ন পরিচয়ে অনলাইনে সক্রিয় থাকার একটি মাধ্যম।

ফলে বট অ্যাকাউন্টের মূল বৈশিষ্ট্য হলো অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়তা। আর ভুয়া বা ফেক অ্যাকাউন্টের মূল বৈশিষ্ট্য হলো ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে মানব-নিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম চালানো।

কারা দিচ্ছে এই ‘বট সার্ভিস’?

দ্য ডিসেন্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তত ২৫টি পেজ শনাক্ত  করেছে, যারা টাকার বিনিময়ে লাইক, কমেন্ট, শেয়ার, ফলোয়ার ও রিভিউ দিয়ে থাকে।

নেতিবাচক কমেন্টগুলোতে দ্য ডিসেন্টকে লক্ষ্য করে ভিন্ন ভিন্ন বিশেষণে গালি দেওয়া হয়েছে। অ্যাকাউন্টগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১০টির মধ্যে ৮টি অ্যাকাউন্টই বিভিন্ন ব্যক্তির নামে। তবে সবগুলো প্রোফাইল লক করা অবস্থায় দেখা যায়।

অন্য একটি প্রতিষ্ঠান ১ টাকায় একটি মন্তব্য বিক্রি করে। তবে তাদের কাছে নেতিবাচক মন্তব্য (গালিগালাজা) কিনতে চাইলে তারা প্রতিটি মন্তব্যের জন্য ৫ টাকা দাবি করেন।

Solutions Point নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকেও একই পোস্টে ১০ টাকার বিনিময়ে ১০টি নেতিবাচক মন্তব্য (গালিগালাজ) কেনে দ্য ডিসেন্ট।

কমেন্ট করা প্রোফাইলগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রোফাইলগুলো বাংলাদেশি নামে হলেও সবগুলো প্রোফাইল লক করা এবং তাদের ফলোয়ার সংখ্যা শূন্য।

‘দুই রাজনৈতিক দলকে সার্ভিস দেওয়ার’ দাবি

রাজনৈতিক বট কমেন্ট কেনার কথা বলে দ্য ডিসেন্ট Solutions Point-এর সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে।

বট কমেন্টে তারা কতটা সক্ষম—এমন প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটিতে কাজ করা মুশফিক নামের একজন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় তারা দুটি রাজনৈতিক দলকে বট সার্ভিস দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই বট অ্যাটাকগুলোকে আরও সুসংগঠিতভাবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় বা বড় কোনো রাজনৈতিক ইস্যু চলাকালীন নির্দিষ্ট কোনো হ্যাশট্যাগ ট্রেন্ডিং করাতে বা বিরোধী পক্ষের কোনো পোস্ট গণ-রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে নামিয়ে দিতে এই বট নেটওয়ার্কগুলো ব্যবহৃত হয়।”

তবে নির্বাচনের সময় কোন দুটি রাজনৈতিক দলের হয়ে তারা কাজ করেছেন, তা তিনি প্রকাশ করেননি। দুটি রাজনৈতিক দলের হয়ে বট আক্রমণ করার প্রমাণ চাওয়া হলেও তারা তা দিতে অস্বীকার করেন।

মুশফিক জানান, রাজনৈতিক ইস্যুতে কথা বলতে বাংলাদেশি মানুষের নামে তৈরি করা বট ব্যবহার করা হয়।

তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশি ফলোয়ার’ বা ‘বিডি কমেন্ট’ সার্ভিস ব্যবহার করে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে মনে হয় দেশের সাধারণ মানুষই এসব মন্তব্য করছে।

অনেক ক্ষেত্রে এই বটগুলো ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে গুজব বা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

ওই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কমেন্ট ও রিভিউ কেনা যায়।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হিডেন ডেটা’ বা প্রোফাইল লক করা অ্যাকাউন্টগুলো দেখলে সহজে বোঝা যায় যে এগুলো বট অ্যাটাক। তবে বর্তমানে বাংলাদেশি প্রোফাইল থেকেও কমেন্ট, রিভিউ বা প্রতিক্রিয়া কেনা যায়, যা সহজে শনাক্ত করা যায় না।

প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে ১০ লাখ কমেন্ট কিনতে চাইলে তারা ৩৮ হাজার টাকা দাবি করে। তাদের মাসিক আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে তারা জানায়, গড়ে ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয়। তবে কোনো ইভেন্ট থাকলে আয় বেড়ে যায়।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক বট নেটওয়ার্ক

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই বাংলাদেশে ‘বট’ শব্দটির সঙ্গে অনেকের পরিচয় ঘটে।

২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তথ্য ব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে কাজ করা ডিজিটালি রাইটের তথ্য যাচাই ও গবেষণা প্ল্যাটফর্ম ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বছরের জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগের সমর্থনে ১ হাজার ৩৬৯টি ফেসবুক প্রোফাইল নিয়ে একটি বড় বট নেটওয়ার্ক সক্রিয় ছিল।

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ওই নেটওয়ার্ক ২১ হাজারের বেশি মন্তব্য পোস্ট করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন এবং বিএনপির সমালোচনা করে।

এই অনুসন্ধান থেকে বাংলাদেশের বট আইডিগুলোর একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়—একই মন্তব্য শতাধিক প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা।

ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, তাদের অনুসন্ধানে উঠে আসা বট আইডিগুলোর ৭৭ শতাংশ প্রোফাইল নারীদের নামে তৈরি। অধিকাংশ বট আইডির প্রোফাইলেই একই ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল।

ডিসমিসল্যাবের গবেষণা বলছে, বট নেটওয়ার্কের বিস্তার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও নির্ভুল তথ্যব্যবস্থার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

এ ধরনের নেটওয়ার্ক অন্য মতামতকে দমন করতে পারে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রচার করে জনপরিসরের আলোচনাকে বিকৃত করতে পারে। এই কারসাজি জনমতকে মেরুকরণ করতে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা নষ্ট করতে পারে।