আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ
- আপডেট সময় : ১২:৫৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
- / ১০০০ বার পড়া হয়েছে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ন্যায়বিচারের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে এইচআরডব্লিউ
স্টাফ রিপোর্টারঃ
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক আইনি মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসৃত হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটির ভাষ্য, এ ধরনের ঘাটতি ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ন করতে পারে, আইনের শাসন দুর্বল করতে পারে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি বা কারাবন্দী করার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
আজ বুধবার (২৯ জুলাই) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, গত ২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগ দাখিল করেছেন।
অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং সাংবাদিক। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় তারা জড়িত ছিলেন। ২০২৪ সালের গণবিক্ষোভের মুখে ১৫ বছরের বেশি সময়ের ওই সরকারের পতন ঘটে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে সংঘটিত বহু নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা জরুরি।
তবে তাঁর মতে, অনেক মামলায় বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড পূরণ করছে না। ‘বাংলাদেশের জরুরিভাবে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা সংস্কার করা প্রয়োজন। ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত ও ইচ্ছামতো আনা অভিযোগের মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের সুযোগ যেন না থাকে, তা নতুন সরকারের নিশ্চিত করা উচিত।’
ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে হওয়া আন্দোলনে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নের বিভিন্ন মামলা চলছে। ওই অভিযানে ৮০০ জনের বেশি নিহত এবং হাজারো মানুষ গুরুতর আহত হন। পাশাপাশি শেখ হাসিনার শাসনামলে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুমসহ অন্যান্য অভিযোগও শুনানি পর্যায়ে রয়েছে।
এক ডজনের বেশি মামলা পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে এইচআরডব্লিউ বলছে, যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সংস্থাটির দাবি, একাধিক ঘটনায় প্রসিকিউটররা ব্যক্তিদের আটক ও অভিযুক্ত করার ক্ষেত্রে এমন সাক্ষ্যবিবরণীর ওপর নির্ভর করছেন, যেগুলোর একাধিক অংশ হুবহু মিল পাওয়া যায়। তাদের মতে, এতে সাক্ষ্যপ্রমাণের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এইচআরডব্লিউর তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনাল ছয়টি বিচার শেষ করেছে। এতে মানবতাবিরোধী অপরাধে ৬২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৪২ জনের বিচার হয়েছে অনুপস্থিতিতে, যার মধ্যে শেখ হাসিনাও আছেন। ১৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালটি প্রথম গঠিত হয় ২০১০ সালের মার্চে, শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। উদ্দেশ্য ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচার করা। সে সময় ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।
তবে ওই বিচারপ্রক্রিয়া তথ্যপ্রমাণের ঘাটতি, রাজনৈতিক পক্ষপাত, প্রসিকিউটর ও বিচারকদের মধ্যে যোগসাজশ এবং ন্যূনতম আইনি সুরক্ষার অভাবের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছিল।
২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী প্রশাসন ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট আইন সংশোধন করে। এতে এখতিয়ারভুক্ত অপরাধের সংজ্ঞা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু এইচআরডব্লিউর মতে, সংশোধন সত্ত্বেও বিচারিক প্রক্রিয়া ও সুরক্ষার দিক থেকে এটি আন্তর্জাতিক আদালতগুলোর মানে পৌঁছায়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ আইনে আর কোনো সংশোধন আনা হয়নি।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বিদ্যমান আইনে এখনো প্রসিকিউটরদের এমন ক্ষমতা রয়েছে যাতে নির্দিষ্ট প্রমাণের ন্যূনতম মান পূরণ না করেও গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া যায়। আটক ব্যক্তিকে লিখিতভাবে কারণ না জানিয়েই দীর্ঘ সময় হেফাজতে রাখা সম্ভব। পৃথক আদালতে অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগও নেই।
প্রসিকিউশন তাদের প্রমাণ উপস্থাপনের তিন সপ্তাহের মধ্যেই বিচার শুরু হতে পারে, যা আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রস্তুতির জন্য খুবই অল্প সময়। অনুপস্থিতিতে বিচার হলেও অভিযুক্তের পছন্দমতো আইনজীবী নিয়োগের পর্যাপ্ত সুরক্ষা নেই। প্রতিরক্ষা আইনজীবীদের সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগও সীমিত।
গত ১৪ মে ২০১৩ সালের মে মাসে হেফাজতে ইসলামের বিক্ষোভ নিয়ে সংবাদ প্রচারের ঘটনায় দুই সাংবাদিককে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। তাঁরা হলেন একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু এবং উপস্থাপক ফারজানা রূপা।
যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সে সময় অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে কয়েকজন বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার কথা বলেছিল, প্রসিকিউটরদের অভিযোগ—এই দুই সাংবাদিক ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে সরকারকে হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দিতে সহায়তা করেছেন।
এই দুই সাংবাদিকের আইনজীবীরা এইচআরডব্লিউকে জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারের ভিত্তি সম্পর্কে তাঁদের মক্কেলদের কোনো লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সংস্থাটি বলছে, এটি নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনেও লিখিত কারণ জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
২৭ জুলাই ট্রাইব্যুনালে যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে, সেখানে এই দুই সাংবাদিককেও মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি গণহত্যার অভিযোগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এইচআরডব্লিউ মনে করিয়ে দিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা বলতে কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে পুরোপুরি বা আংশিক ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত নির্দিষ্ট ধরনের অপরাধকে বোঝায়।
সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে এইচআরডব্লিউ ‘ডা. মুহাম্মদ হাসান মাহমুদ চৌধুরী ও অন্যান্য’ মামলার কথা উল্লেখ করেছে। ২০২৪ সালের ১৬ ও ১৮ জুলাই এবং ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের কেন্দ্রস্থলে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আওয়ামী লীগের ২২ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ৫৫টি সাক্ষ্যবিবরণী জনসমক্ষে এসেছে।
এইচআরডব্লিউর দাবি, ১৪টি পৃথক জবানবন্দিতে ছয় লাইনের একটি অনুচ্ছেদ প্রায় শব্দে শব্দে এক। সেখানে বলা হয়েছে, নাম উল্লেখ করা সাতজন রাজনীতিবিদ তাঁদের ‘পরিকল্পনা, অর্থায়ন, উসকানি ও নির্দেশের’ মাধ্যমে ‘আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীদের’ ব্যবহার করে ছয়জনকে হত্যা করেছেন।
আরও নয়টি জবানবন্দিতে আরেকটি বড় অনুচ্ছেদ প্রায় অভিন্নভাবে পাওয়া গেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ছয়জন অভিযুক্ত বারবার ‘উসকানিমূলক বক্তব্য’ দিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের ‘জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও সাম্প্রদায়িক উসকানিদাতা’ বলেছেন এবং বাকি ১৬ জনকে আন্দোলন দমন করতে ‘সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ’ ও ‘নিরীহ, নিরস্ত্র, শান্তিপূর্ণ ছাত্র-জনতাকে হত্যা ও নির্যাতনের’ নির্দেশ দিয়েছেন।
একই মামলায় আটক থাকা জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবীরা সাংবাদিকদের কাছে এমন কিছু অডিও রেকর্ডিং দেন, যাতে ট্রাইব্যুনালের এক প্রসিকিউটর এ বছরের শুরুতে এক কোটি টাকার বিনিময়ে ফজলে করিমের জামিনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ওই প্রসিকিউটর পদত্যাগ করেন। তবে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় এখনো তদন্ত শেষ করেনি। এর মধ্যেই অভিযোগ গঠনের কাজ এগিয়েছে এবং আগামী ৬ আগস্ট বিচার শুরুর কথা রয়েছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে নিশানা বানিয়েছিল, সেই অপব্যবহারের পুনরাবৃত্তি করা যাবে না—এটি বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে।’
তাঁর ভাষায়, একই ধরনের অনুলিপিকৃত সাক্ষ্যবিবরণীর ভিত্তিতে অভিযোগ আনা একটি বিশ্বাসযোগ্য বিচারপ্রক্রিয়ার অভাবকেই সামনে আনে, যা আবারও ভুক্তভোগী, তাঁদের পরিবার এবং দেশের মানুষকে হতাশ করবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ আদালত হলেও এটি আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় গুরুতর অপরাধের বিচার করে। অতীতেও এই ট্রাইব্যুনালের বিচার নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রমাণের মান ও ন্যায্য বিচারের প্রশ্ন উঠেছিল। নতুন করে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর সেই পুরোনো উদ্বেগ আবার সামনে আনল এইচআরডব্লিউ।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















