দেশে গত ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ১৬৪ শিশু
- আপডেট সময় : ০৪:১১:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬
- / ১০২৯ বার পড়া হয়েছে
দেশে গত ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার ১৬৪ শিশু
স্টাফ রিপোর্টারঃ
সারা দেশে গত ছয় মাসে অন্তত ১৬৪ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ২৪টি ঘটনায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। সবচেয়ে বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম জেলায় ৩৭টি। বিভাগের হিসাবে সবেচেয়ে বেশি ঢাকায় ৪৯টি। ১৬৪ জনের মধ্যে ১১৭ জনের বয়স ১০ বছরের নিচে। অন্যদিকে ৭৬টি ৪৪ শতাংশ ঘটনায় পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিতজনেরা জড়িত এবং ৮৮ জন ক্ষেত্রে জড়িত অপরিচিতরা।
মোট ১৫৬টি ঘটনায় ধর্ষণের শিকার হয়েছে এই ১৬৪ শিশু। কোনো কেনো ঘটনার ভুক্তভোগী একাধিক শিশু।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অবক্ষয় এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মিলিয়ে দেশে শিশু ধর্ষণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। শুধু পরিচিতজনই নয়, শিক্ষক, ইমাম, এমনকি নিকটাত্মীয়রাও এই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
অভিযুক্তদের পরিচয় বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৭৬টি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় পরিবার, আত্মীয় বা পরিচিতরা জড়িত। অর্থাৎ ৪৪ শতাংশ ঘটনা ঘটিয়েছেন পরিচিতজনেরা। অন্যদিকে ৮৮ জন অভিযুক্ত ভুক্তভোগী শিশু বা তার পরিবারের কাছে আগে থেকে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। এই হার মোট অভিযুক্তের ৫৬ শতাংশ। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ঘটনায় সম্পূর্ণ অজানা ব্যক্তির হাতে শিশুরা নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
পরিচিত পরিবেশও যে নিরাপদ নয়, তা-ও স্পষ্ট। মোট ঘটনার ৪৪ শতাংশেই অভিযুক্ত ছিলেন শিশুর পরিচিত কেউ। এর মধ্যে নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীর নাম এসেছে ৩৬টি ঘটনায়, যা মোট ঘটনার ২৩ শতাংশ। স্কুল-মাদ্রাসার শিক্ষক ও ইমামদের নাম এসেছে ৩২টি ঘটনায়, যা ২১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান বলছে, রাস্তাঘাট বা অজানা পরিবেশের পাশাপাশি ঘর, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোনোটিই আর শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
১৬৪টি ঘটনার মধ্যে ২৪টিতে ধর্ষণের পর শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। প্রতি সাতটি ঘটনার একটিতে শিশুকে জীবন দিতে হয়েছে। হত্যার শিকার এই ২৪ শিশুর বেশির ভাগই ছিল ৯ বছরের কম বয়সি। সবচেয়ে কম বয়সি তিন শিশুর বয়স ছিল মাত্র চার বছর।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোর দুই-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ১৬টিতে অভিযুক্ত ব্যক্তি শিশু বা তার পরিবারের কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল। বাকি আটটি ঘটনায় সৎবাবা, দুলাভাই বা পরিবারের অন্য সদস্যরা অভিযুক্ত। অর্থাৎ পরিবারের ভেতরেও শিশু সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
১৬৪ জন ভুক্তভোগীর মধ্যে ১১৭ জনই ১০ বছরের কম বয়সি। এই হার ৭১ শতাংশ বা প্রতি চারজনে তিনজন।
পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরাও এই নৃশংসতা থেকে রেহাই পায়নি। এই বয়সের ২২ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যা মোট ভুক্তভোগীর ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সি ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৩৭ জন, যা প্রতি চারজনে একজন।
লিঙ্গ ভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, ৮৭ জন কন্যা শিশু এবং ৪৩ জন ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। মোট ভুক্তভোগীর ৫৩ শতাংশ কন্যা শিশু এবং ২৬ শতাংশ ছেলে শিশু। বাকি ৩৪ জনের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে লিঙ্গপরিচয় উল্লেখ ছিল না।
ছয় মাসে মোট ৪৩টি বলাৎকারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টিতেই অভিযুক্ত ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম। অর্থাৎ ৬০ শৃৃতাংশ বলাৎকারের ঘটনায় ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা উপাসনালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অভিযুক্ত।
পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে পাঁচটি ঘটনায়। বাকি ১২টিতে অভিযুক্ত ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি।
ধর্মীয় শিক্ষার জন্য যেসব শিশুকে মাদ্রাসা বা মসজিদে পাঠানো হচ্ছে, তাদের একটি অংশ সেখানেই যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এটি সমাজের গভীরে বিদ্যমান বিশ্বাস ও আস্থার সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, ‘বর্তমানে যে বলাৎকার বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তা অত্যন্ত গর্হিত ও জঘন্য অন্যায়। যারা এই কাজ করে তারা মানসিকভাবে অসুস্থ ও বিকৃত রুচির অধিকারী। এর শিকার হয়ে অনেক শিশু শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে মারাও যাচ্ছে। মানসিকভাবে এই শিশুরা চরম ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। তাদের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্য মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়। কাউকে দেখলেই তাদের মনে ভীতি তৈরি হয় যে, সে বুঝি তাকে আবারও আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করবে। এভাবে একটি শিশু সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হতে পারে না।’
মাসভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে ধর্ষণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ধর্ষণের ভুক্তভোগী ছিল ১৯টি শিশু। চলতি বছরের জানুয়ারিতে এ সংখ্যা ছিল ১৭টি। ফেব্রুয়ারিতে তা কিছুটা কমে হয় ১৩টি। মার্চে এ সংখ্যা ছিল ১৮টি। এপ্রিলে এটি ৪২টিতে পৌঁছায়। আর মে মাসে সব রেকর্ড ছাড়িয়ে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৫টিতে।
ডিসেম্বর থেকে মার্চ, এই চার মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৬৭ শিশু। আর শুধু মে মাসেই ভুক্তভোগীর সংখ্যা ৫৫। অর্থাৎ, এই এক মাসেই চার মাসের কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার মনে হয় আমাদের সমাজ একটা অপরাধপ্রবণ সমাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে মানুষের আচরণ ক্রমান্বয়ে হিংস্র হয়ে উঠছে। সাধারণ ইস্যুতেই মানুষ হিংস্র হয়ে যাচ্ছে।
জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, গত ছয় মাসে সর্বোচ্চ ১২টি ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম জেলায়। দ্বিতীয় অবস্থানে একই বিভাগের জেলা কুমিল্লায় আটটি ঘটনা। সাতটি করে ঘটনা নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে ঢাকা এবং পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ। একই সময়ে গাইবান্ধা ও যশোরে ছয়টি করে ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ৪৯টি ঘটনা নিয়ে শীর্ষে ঢাকা বিভাগ। দ্বিতীয় চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৭টি, তৃতীয় রাজশাহীতে ২০টি। ময়মনসিংহে ১৬টি, খুলনায় ১১টি এবং রংপুরে ১০টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
তুলনামূলকভাবে কম ঘটনা ঘটেছে বরিশাল ও সিলেট বিভাগে। বরিশালে আটটি এবং সিলেটে পাঁচটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে এই ছয় মাসে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে এই পরিস্থিতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফাওজিয়া মোসলেম। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যে অপরাধী সে বারবার অপরাধ করে, কারণ তার অপরাধের কোনো বিচার হয় না। সে যে অপরাধ করছে এই বার্তাটাই তার কাছে থাকে না। ক্ষমতার যে দাপট এখানে, এর কারণে অপরাধীরা হয়ে যাচ্ছে নায়ক আর ন্যায় কাজগুলো হয়ে যাচ্ছে অপরাধ। বিচারের দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে না পারলে এসব অপরাধ কখনো কমবে না, বরং বাড়তে থাকবে।’
ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এই নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই তিক্ত অভিজ্ঞতা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ভবিষ্যতে বড় হয়ে ওই শিশু নিজেও এ ধরনের বিকৃত আচরণ শিখতে পারে এবং অন্যকে নির্যাতন করতে পারে। এ ছাড়া, শৈশবের এই শারীরিক নির্যাতনের স্মৃতি তাকে পরবর্তী জীবনে বিয়ে করতে বা স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী হতে বাধা দিতে পারে। যা তার জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।’
রেজিনা ইকবাল বলেন, ‘শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থে এই অপরাধগুলো থামানো অত্যন্ত জরুরি। এজন্য দেশে সঠিক ও কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বাবা-মাকে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করলেই হবে না বা যে কারও কাছে পড়তে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















