ঢাকা ০২:০৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফের ফুঁসে উঠেছে সর্বনাশা তিস্তা

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ১০:৩৯:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
  • / ১০২৪ বার পড়া হয়েছে

ফের ফুঁসে উঠেছে সর্বনাশা তিস্তা

স্টাফ রিপোর্টারঃ

তিস্তার উজানে গজলডোবা ব্যারেজ নামকস্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি ভারত তাদের খেয়াল খুশি মতো নিয়ন্ত্রণ করেই যাচ্ছে। এই ঘটনা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ’ ভারতের অমানবিক আচরণের প্রমাণ।

শুকনো মৌসুমে ভারত গজলডোবা ব্যারেজের সবগুলো গেট বন্ধ করে রাখে, যার ফলে বাংলাদেশে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। আর বর্ষাকালে কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে।তিস্তার পানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই অমানবিক খেলা। ভারতের এই আচরণ শুধুমাত্র বিষম ব্যবহারই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিরও চরম লঙ্ঘন।

বর্ষা মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট দিয়ে অতিরিক্ত পানি তিস্তার মূলধারায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু পূর্ব তীর রক্ষা বাঁধ না থাকায় এ সময়ে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ এ অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। নষ্ট হয়ে যায় বিপুলপরিমাণ কৃষিপণ্য ও ফসল। একই রকম দুর্ভোগ শুষ্ক মৌসুমেও।

এ সময় খরা আর তিস্তায় পানি না থাকায় মরুভূমিতে পরিণত হয় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ তিস্তা তীরবর্তী বেশ কয়েকটি জেলার বৃহৎ এলাকা।

তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী মানুষজন বলছেন, যখন পানি চাই, তখন পাই না, আর যখন পানির কোনো প্রয়োজন নেই, তখন পানিতে ভেসে বেড়াই, এভাবে আক্ষেপের সূরে কথাগুলো জানালেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের তিস্তাতীরবতী গ্রামের কফিল উদ্দিন (৬৫)।

তিনি ভারতের অমানবিক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ভারতে যখন প্রবল বৃষ্টিপাত হয় অথ্যাৎ বন্যা দেখা দেয়, তখন তাদের দেশের পানি নিয়ন্ত্রনে রাখতে গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দিয়ে আমাদেরকে থেমে থেমে ভাসিয়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে আর কতদিন তিস্তা পারের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

তথ্যমতে, ব্যারেজ নির্মাণের ৩৫ বছরে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনাবাদী হয়েছে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর আর বালুচরে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি। এ সময়ে গৃহহারা হয়েছে প্রায় লাখো মানুষ।

তিস্তা ব্যারেজের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের গড্ডিমারী এলাকার আকবর আলী, বলেন, ‘’শুকান (শুষ্ক মৌসুমে) পানির জন্য হাহাকার অবস্থা। আর বন্যার সময় পানি দিয়ে হামাকে ডুবি থোয় (পানিবন্দি রাখে), এটা কোন নিয়ম বাহে?’’

এদিকে চলতি মৌসুমে গত ২৩ জুন তিস্তার পানি সর্বপ্রথম বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যা পরদিনই বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে।

হালকা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে রোববার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় আবারও তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ বেড়ে গিয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করে।সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

যদিও সোমবার ২৯ জুন সকাল ৯টায় পানি প্রবাহ সামান্য কমে গিয়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ সময় শতশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্রমেই বাড়ছে পানিবন্দির সংখ্যা। ইতোমধ্যে তিস্তা চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।

জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদীতীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে হাতীবান্ধ উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী ও ডাউয়াবাড়ী; কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী ও নোহালী; আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, কালমাটি, বাহাদুরপাড়া ও পলাশী এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, তাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।

সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের দবিয়ার হোসেন বলেন, শুনেছি ভারত গেট খুলে দিযেছে এ কারনে রোববার রাত থেকে চারদিকে পানি আর পানি। বন্যার সময় আমাদেরকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়, ভয় হয় ভারত কখন যে গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে আমাদেরকে ভাসিয়ে দেয়।

আদিতমারী উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী কুটিরপাড় গ্রামের কাচুয়া শেখ বলেন, কয়েক দিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছে চরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে পানি উঠেছে। তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি এলাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চরম কষ্টে থাকতে হয়। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়েও আমাদের কষ্টের শেষ নেই। এ সবের মাঝেও থাকে সাপ-পোকার প্রাদুর্ভাব। বন্যা যত দিন থাকে, আমাদের কষ্ট তার চেয়েও বেশি।

জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরসহ সদর উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। বালু চর ও নিম্নাঞ্চলের বাদামক্ষেত, ধানের বীজ তলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল গুলোতে ইতিমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে।

তিস্তাপাড়ের কৃষক জাফর উদ্দিন বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এনিয়ে আমরা আতংকে আছি। এতে আমাদের চরের ফসল গুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে।

গড্ডিমারী গ্রামের কৃষক শাহেদ মিয়া বলেন, শুনছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। এ পানি যদি এভাবে আসতে থাকে চরাঞ্চলের আমন ধানের চারা গুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়াও বাদাম, মিষ্টি কুমড়াসহ অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।

তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানির লেভেল পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, পানি প্রবাহ সামান্য কমে গিয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, উজানের পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি থেমে থেমে বাড়ছে। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজানের ঢলে রোববার সন্ধায় তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। তাই হালকা বন্যা দেখা দিয়েছে। তবে সোমবার সকাল ৯টায় পানি প্রবাহ কিছুটা কমে গিয়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ।

তিনি আরো বলেন, উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে। উজানের ঢলের ওপরই নির্ভর করছে পানির চাপ।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পাশাপাশি পানি কমে যাওয়ার পর নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার ডান তীর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

ফের ফুঁসে উঠেছে সর্বনাশা তিস্তা

আপডেট সময় : ১০:৩৯:০৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

ফের ফুঁসে উঠেছে সর্বনাশা তিস্তা

স্টাফ রিপোর্টারঃ

তিস্তার উজানে গজলডোবা ব্যারেজ নামকস্থানে একটি বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানি ভারত তাদের খেয়াল খুশি মতো নিয়ন্ত্রণ করেই যাচ্ছে। এই ঘটনা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং প্রতিবেশী দেশ’ ভারতের অমানবিক আচরণের প্রমাণ।

শুকনো মৌসুমে ভারত গজলডোবা ব্যারেজের সবগুলো গেট বন্ধ করে রাখে, যার ফলে বাংলাদেশে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। আর বর্ষাকালে কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে অতিরিক্ত পানি ছেড়ে দিয়ে বন্যার সৃষ্টি করে।তিস্তার পানি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই অমানবিক খেলা। ভারতের এই আচরণ শুধুমাত্র বিষম ব্যবহারই নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতিরও চরম লঙ্ঘন।

বর্ষা মৌসুমে তিস্তা ব্যারেজের ৪৪টি গেট দিয়ে অতিরিক্ত পানি তিস্তার মূলধারায় প্রবাহিত হয়। কিন্তু পূর্ব তীর রক্ষা বাঁধ না থাকায় এ সময়ে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ এ অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। নষ্ট হয়ে যায় বিপুলপরিমাণ কৃষিপণ্য ও ফসল। একই রকম দুর্ভোগ শুষ্ক মৌসুমেও।

এ সময় খরা আর তিস্তায় পানি না থাকায় মরুভূমিতে পরিণত হয় লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামসহ তিস্তা তীরবর্তী বেশ কয়েকটি জেলার বৃহৎ এলাকা।

তিস্তা পাড়ের ভুক্তভোগী মানুষজন বলছেন, যখন পানি চাই, তখন পাই না, আর যখন পানির কোনো প্রয়োজন নেই, তখন পানিতে ভেসে বেড়াই, এভাবে আক্ষেপের সূরে কথাগুলো জানালেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ ইউনিয়নের তিস্তাতীরবতী গ্রামের কফিল উদ্দিন (৬৫)।

তিনি ভারতের অমানবিক আচরণের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন, ভারতে যখন প্রবল বৃষ্টিপাত হয় অথ্যাৎ বন্যা দেখা দেয়, তখন তাদের দেশের পানি নিয়ন্ত্রনে রাখতে গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দিয়ে আমাদেরকে থেমে থেমে ভাসিয়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে আর কতদিন তিস্তা পারের মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে।

তথ্যমতে, ব্যারেজ নির্মাণের ৩৫ বছরে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলার প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি তিস্তাগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। অনাবাদী হয়েছে প্রায় দেড় লাখ হেক্টর আর বালুচরে পরিণত হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার হেক্টর জমি। এ সময়ে গৃহহারা হয়েছে প্রায় লাখো মানুষ।

তিস্তা ব্যারেজের প্রভাব সম্পর্কে জানতে চাইলে লালমনিরহাটের গড্ডিমারী এলাকার আকবর আলী, বলেন, ‘’শুকান (শুষ্ক মৌসুমে) পানির জন্য হাহাকার অবস্থা। আর বন্যার সময় পানি দিয়ে হামাকে ডুবি থোয় (পানিবন্দি রাখে), এটা কোন নিয়ম বাহে?’’

এদিকে চলতি মৌসুমে গত ২৩ জুন তিস্তার পানি সর্বপ্রথম বিপৎসীমার এক সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়, যা পরদিনই বিপৎসীমার নিচে নেমে আসে।

হালকা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে রোববার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় আবারও তিস্তা নদীর পানিপ্রবাহ বেড়ে গিয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমা অতিক্রম করে।সন্ধ্যা ৬টায় ডালিয়া পয়েন্টে পানিপ্রবাহ বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।

যদিও সোমবার ২৯ জুন সকাল ৯টায় পানি প্রবাহ সামান্য কমে গিয়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে তিস্তা নদীর তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ সময় শতশত পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ক্রমেই বাড়ছে পানিবন্দির সংখ্যা। ইতোমধ্যে তিস্তা চরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করেছে।

জেলার পাঁচটি উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকা বন্যায় প্লাবিত হচ্ছে। পানির চাপ বেড়ে যাওয়ায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ নদীতীরবর্তী এলাকার উঁচু রাস্তাগুলো চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না করা এসব বাঁধ চলতি বন্যায় বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ, আদিতমারী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে হাতীবান্ধ উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, ছয়আনী, সানিয়াজান, সিঙ্গামারী, সিন্দুর্না, হলদিবাড়ী ও ডাউয়াবাড়ী; কালীগঞ্জের ভোটমারী, শৈলমারী ও নোহালী; আদিতমারীর মহিষখোচা, গোবর্ধন, কালমাটি, বাহাদুরপাড়া ও পলাশী এবং সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, তাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল।

সদর উপজেলার রাজপুর গ্রামের দবিয়ার হোসেন বলেন, শুনেছি ভারত গেট খুলে দিযেছে এ কারনে রোববার রাত থেকে চারদিকে পানি আর পানি। বন্যার সময় আমাদেরকে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়, ভয় হয় ভারত কখন যে গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে আমাদেরকে ভাসিয়ে দেয়।

আদিতমারী উপজেলার তিস্তা তীরবর্তী কুটিরপাড় গ্রামের কাচুয়া শেখ বলেন, কয়েক দিন ধরে পানি বাড়া-কমা করছে চরাঞ্চলের অনেক বাড়িতে পানি উঠেছে। তারা পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। পানিবন্দি এলাকায় শিশু, বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চরম কষ্টে থাকতে হয়। গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি নিয়েও আমাদের কষ্টের শেষ নেই। এ সবের মাঝেও থাকে সাপ-পোকার প্রাদুর্ভাব। বন্যা যত দিন থাকে, আমাদের কষ্ট তার চেয়েও বেশি।

জানা গেছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বাড়ায় হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, দোয়ানী, সানিয়াজান ইউনিয়নের নিজ শেখ সুন্দর, বাঘের চর, সিঙ্গামারি ইউনিয়নের ধুবনী, সিন্দুর্না, পাটিকাপাড়া, ডাউয়াবাড়ি ইউনিয়নের তিস্তা নদীর তীরবর্তী চরসহ সদর উপজেলার তিস্তা চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। বালু চর ও নিম্নাঞ্চলের বাদামক্ষেত, ধানের বীজ তলা, মিষ্টি কুমড়াসহ বিভিন্ন ফসল গুলোতে ইতিমধ্যে পানি ঢুকে পড়েছে।

তিস্তাপাড়ের কৃষক জাফর উদ্দিন বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পেয়ে চরঞ্চলে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। এনিয়ে আমরা আতংকে আছি। এতে আমাদের চরের ফসল গুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হবে।

গড্ডিমারী গ্রামের কৃষক শাহেদ মিয়া বলেন, শুনছি ভারত পানি ছেড়ে দিয়েছে। এ পানি যদি এভাবে আসতে থাকে চরাঞ্চলের আমন ধানের চারা গুলো নষ্ট হয়ে যাবে। এছাড়াও বাদাম, মিষ্টি কুমড়াসহ অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যাবে।

তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে পানির লেভেল পরিমাপক নুরুল ইসলাম বলেন, পানি প্রবাহ সামান্য কমে গিয়ে ডালিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানান, উজানের পানিপ্রবাহ অব্যাহত থাকায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি থেমে থেমে বাড়ছে। বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, উজানের ঢলে রোববার সন্ধায় তিস্তা নদীতে পানিপ্রবাহ বেড়ে যায়। সন্ধ্যা ৬টায় বিপৎসীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানিপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। তাই হালকা বন্যা দেখা দিয়েছে। তবে সোমবার সকাল ৯টায় পানি প্রবাহ কিছুটা কমে গিয়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ।

তিনি আরো বলেন, উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘ হতে পারে। উজানের ঢলের ওপরই নির্ভর করছে পানির চাপ।

লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুনীল কুমার জানান, আগামী ৭২ ঘণ্টা দেশে ও উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি বা তার ওপরে থাকতে পারে। এতে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পাশাপাশি পানি কমে যাওয়ার পর নদীভাঙনের আশঙ্কাও রয়েছে। সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রস্তুত রয়েছে। বিশেষ করে তিস্তার ডান তীর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ