প্রত্যর্পণ না প্রত্যাবর্তন শব্দে চলছে আলোচনা
- আপডেট সময় : ১০:৩৪:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০২৪ বার পড়া হয়েছে
প্রত্যর্পণ না প্রত্যাবর্তন শব্দে চলছে আলোচনা
আস্থা ডেস্কঃ
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরানো নিয়ে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা শুরু হয়েছে। প্রত্যর্পণ না প্রত্যাবর্তন শব্দ নিয়ে আটকে আছে শেখ হাসিনার বিষয়টি।
এই দুই প্রক্রিয়া নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে, ঠিক তখনই ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) প্রধান পরাগ জৈনসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের আকস্মিক ঢাকা সফর ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নানা আলোচনা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া কীভাবে এগোতে পারে, দেশের মধ্যে এ বিষয়ে কী ধরনের সমঝোতা প্রয়োজন এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে বিষয়টি কীভাবে সমাধান করা যায়-এসব নিয়ে আলোচনা চলছে উচ্চপর্যায়ে।
২৪ ঘণ্টার সফরে গত রবিবার দুপুর ২টা ৫৭ মিনিটে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি ফ্লাইটে ‘র’-এর প্রতিনিধিদল ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে রয়েছেন ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈন। তার সঙ্গে ছিলেন সংস্থাটির পরিচালক অশ্বিন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৩টার ফ্লাইটে প্রতিনিধিদলটি ঢাকা ত্যাগ করে।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, প্রতিনিধিদলের সদস্য শৈবাল রায় চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ রয়েছে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভিন্ন বিষয় সমন্বয়ের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল বলে দাবি সূত্রটির।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত দুই বছরে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতকে কয়েকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু দিল্লির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যর্পণ না প্রত্যাবর্তণ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এ অবস্থায় ‘র’-এর প্রধানের ঢাকা সফরকে সংশ্লিষ্ট মহলের কেউ কেউ ঢাকার সঙ্গে ভারতের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের নতুন ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
কূটনৈতিক সূত্রের ভাষ্য, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টার অংশ হিসেবেই সফরটি হয়েছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সেনা বাহীনি সেনা হেলিকাপ্টারে পরে বিমান যোগে শেখ হাসিনাকে ভারতে পাঠিয়ে দেয়। পরে শেখ হাসিনাকে ফেরত আনতে ২০২৪ সালের ২০ ও ২৭ ডিসেম্বর ভারতকে দুটি চিঠি দিয়েছিল ইউনুচ সরকার এরপর ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেন। রায় ঘোষণার পর ২১ নভেম্বর শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতকে আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও চিঠি দেয় ইউনুচ।
পরে বিএনপি সরকার গঠনের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সর্বশেষ গতকাল ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে আলোচনায় শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়টি উত্থাপিত হয়েছে বলে জানা গেছে।
এর আগে গত ২৯ জুলাই দীনেশ ত্রিবেদী জানিয়েছিলেন, নয়াদিল্লি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরে স্বাগত জানানোর জন্য অপেক্ষা করছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গেও বৈঠকে করেন। সেখানেও শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে।
জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার বিষয়গুলো ভারত আইনগতভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক সাহাব এনাম খান বললেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও বিষয়টি শুধু আইনি নয়, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও নিরাপত্তার প্রশ্নও জড়িত।
তার মতে, ‘শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো শঙ্কা বা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আশঙ্কা বিবেচনায় এলে প্রত্যর্পণের আগে দিল্লি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবে।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) মনিরুল ইসলাম আকন্দের মতে, দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়া সবসময়ই ইতিবাচক। তবে তিনি মনে করেন, “স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাধারণত সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে আলোচনা হয়। সেখানে যদি ‘র’-এর প্রধানের সঙ্গে বাংলাদেশের শীর্ষ মহলের বৈঠকে শেখ হাসিনার মতো স্পর্শকাতর বিষয় উঠে থাকে, তাহলে সেটিকে সাধারণ কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখার সুযোগ কম।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর ক্ষেত্রে এখন তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এক. ভারত সরকার প্রত্যর্পণ অনুরোধের বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেয়। দুই. বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় আইনি প্রক্রিয়া কীভাবে এগোয়। তিন. শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমঝোতার কোনো বিষয় যুক্ত হয় কি না। এর মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী আইনি পথই মূল ভিত্তি হলেও রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বাস্তবতাও পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ



















