ঢাকা ০৪:২০ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬, ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে!

Astha DESK
  • আপডেট সময় : ০২:৫৮:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬
  • / ১০২৩ বার পড়া হয়েছে

মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে!

স্টাফ রিপোর্টারঃ

ডাক্তারদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দাও! কিংবা সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা- মন্ত্রীদের এমন বিতর্কিত কথায় গত ছয় মাসে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকারের স্বাস্থ্য, সড়ক পরিবহন , বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোথাও বেফাঁস মন্তব্য! কোথাও না জেনে কথা বলা -এমন চর্চা দেখা গেছে মন্ত্রীদের মধ্যে। যে কারণে নেতিবাচকভাবে সংবাদ শিরোনামেও ছিলেন তারা। এরমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বিব্রত হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও।

আর কয়েক দিনের মধ্যে সরকার তার প্রথম ১৮০ দিন পূর্ণ করবে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের যাত্রাপথে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা নীতিগত অগ্রগতির চেয়েও গণমাধ্যম ও জনপরিসরে বেশি আলোচনায় এসেছে একাধিক মন্ত্রীর বিতর্কিত ভূমিকা।

একের পর এক দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক কেন্দ্র করে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার।

জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এমন কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা উঠে এসেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছে। অস্বস্তি হয়ে পড়েছে সরকার।

সরকারের শুরুতেই চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ আখ্যা দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী। ডাক্তারদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা বা ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ফুল হাতা শার্ট পরে থাকা-এমন বক্তব্য দিয়ে সমালোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন হাসপাতালের তরকারি টেস্ট-করতে দেখা গেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে। এমডিকে রাতে ডেকে নির্দেশ, আত্মীয়দের সচিবালয়ের পাস। বদলি পদোন্নতি নিয়ে ডাক্তারদের অসন্তোষের চিত্র হরহামেশা।

এদিকে সড়ক ও পরিবহন খাতে বহু বছরের পুঞ্জীভূত নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিলেও শুরুতেই চরম বিতর্কের জন্ম দেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সড়কের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে বলেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে যে টাকা তোলে, সেটিকে তিনি ‘চাঁদা’ হিসেবে দেখেন না। বাধ্য করে টাকা নেওয়াকে চাঁদা দাবি করে তাঁর এই বক্তব্য পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার শামিল বলে অভিযোগ করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। নতুন সরকারের শুরুতেই মন্ত্রীর এমন অবস্থান সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশাবোধ তৈরি করে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য গত কয়েক মাসে স্বাস্থ্য খাতকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর রাজধানীর শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি একপর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত”।

কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দেশের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এভাবে জনসমক্ষে ‘ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো’ সংক্রান্ত মন্তব্য চিকিৎসকদের পেশাগত চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কিত মন্তব্য করায় চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ ও তোপের মুখে পড়েন তিনি। নিজের লোকজনকে স্বাস্থ্যের টেন্ডার দিতে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়টিতে তিনি টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ করেছেন বলে অভিযোগ।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঢিলেঢালা ভাব

দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক আড়ালে সহিংসতার ঘটনা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলেও মন্ত্রণালয় থেকে জোরালো কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যেসব বক্তব্য বা ব্যাখ্যা এসেছে, তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে মন্ত্রণালয়ের চরম দুর্বলতা ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যকারিতা ফেরাতে না পারা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সব মহল থেকেই চরম সমালোচনার শিকার হচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে সরকার এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রের নতুন মন্ত্রী আসছেন। পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনি নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা কেবল বাকি।

দুই ছেলের নামে ইউপি গঠন ও ঠিকাদারি কাজ: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ‘মিরাকল’ বিতর্ক

সবচেয়ে বড় স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে। প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় নতুন গঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ তাঁর দুই ছেলে (মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত) এবং পরিবারের নামে করা হলে জাতীয় সংসদেও এটি নিয়ে চরম হট্টগোল হয়। সমালোচনার জবাবে তিনি সংসদে দাবি করেন, এটি কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়নি বরং ‘অলৌকিক বা মিরাকেলি’ মিলে গেছে। তবে বিতর্কের এখানেই শেষ নয়; পরে অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে তাঁর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং’ সরকারি বিভিন্ন বড় বড় উন্নয়ন কাজের কাজ পেয়েছে। একই সাথে নিজের এলাকায় বিপুল পরিমাণ প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া ও পরিবারতন্ত্র কায়েমের ঘটনায় সরকারের সততা ও সুশাসনের অবস্থান বড় ধাক্কা খেয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে অন্ধকার! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে

সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা কাটেনি।পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে এখন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সমালোচনার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এর আগেও বিএনপি সরকারে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার নানা মন্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বলছেন সময় গোনা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। তার এমন মন্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই বেশি আসছে। গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে এই লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের।ধারাবাহিক লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে। এদিকে, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহকরা হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

ভাইরাল ভিডিও ও নেতিবাচক ভাবমূর্তিতে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

এদিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে নিয়ে নেটদুনিয়ায় দেখা গেছে তীব্র বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি আপত্তিকর ও বিতর্কিত ভিডিও ফাইল ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শুরুতে বিষয়টিকে প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ডিপফেক বলে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও একাধিক অনুসন্ধানে ভিডিওটি ঘিরে নতুন নতুন প্রশ্ন ও তথ্যের জট তৈরি হয়। কাজের সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের এই নেতিবাচক ভিডিও ট্রোল ও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসায় মন্ত্রিত্বের দায়িত্বশীলতা ও ভাবমূর্তি নিয়ে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সরকারের দায়িত্ব পালনের প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করবেন এবং সে আলোকে মন্ত্রণালয় পুনর্বাণ্টন বা বাদ পড়তে পারেন এমন আগাম ঘোষণা ছিল। যে কারণে মন্ত্রণালয় পারফরম্যান্সের চেয়ে নানা সমালোচনা এবং বিতর্কে জড়িয়ে পড়া মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে। স্বরাষ্ট্রের পর স্বাস্থ্য ও সড়ক পরিবহনসহ অন্তত চারটি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন আসন্ন এমন আলোচনা গুঞ্জন আছে।

সরকারের ছয় মাসে মন্ত্রিত্ব এবং মন্ত্রণালয়ের কাজের সমালোচনায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুর নূর তুষার বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কাজকর্ম দেখে মনে হয়—স্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর আরও পড়াশোনা দরকার, কিংবা বিষয়টি বোঝেন এমন মানুষের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, স্বাস্থ্য বিভাগ এভাবে চলতে পারে না।”

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, “সরকার পরিচালনা এখন আরও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং, জটিল এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিষয়। এটি কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা বা জবাবদিহিতার বিষয় নয়, বরং দক্ষতার সাথে প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় পরিচালনা করার একটি আধুনিক কনসেপ্ট।”

তিনি মন্তব্য করেন, প্রতিটি পেশাতেই দক্ষতা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

অতীতের রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান তাঁর দলের নেতাকর্মী ও এমপিদের জন্য রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে সরকারকে তারচেয়েও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ বিশ্বজুড়ে নিত্যনতুন পরিবর্তনের সাথে সাথে সরকার পরিচালনার ধরনও বদলে গেছে।”

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুমা সাহারা খাতুনের উদাহরণ টেনে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, দক্ষতার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাউকে এক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তিভিত্তিক অন্য মন্ত্রণালয়ে (যেমন টেলিযোগাযোগ) দায়িত্ব দেওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত ছিলনা।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ

ট্যাগস :

মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে!

আপডেট সময় : ০২:৫৮:৪৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৬

মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে!

স্টাফ রিপোর্টারঃ

ডাক্তারদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দাও! কিংবা সড়কে সমঝোতার ভিত্তিতে চাঁদা- মন্ত্রীদের এমন বিতর্কিত কথায় গত ছয় মাসে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকারের স্বাস্থ্য, সড়ক পরিবহন , বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কোথাও বেফাঁস মন্তব্য! কোথাও না জেনে কথা বলা -এমন চর্চা দেখা গেছে মন্ত্রীদের মধ্যে। যে কারণে নেতিবাচকভাবে সংবাদ শিরোনামেও ছিলেন তারা। এরমধ্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্যে প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে বিব্রত হয়েছেন খোদ প্রধানমন্ত্রীও।

আর কয়েক দিনের মধ্যে সরকার তার প্রথম ১৮০ দিন পূর্ণ করবে। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসের যাত্রাপথে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা কিংবা নীতিগত অগ্রগতির চেয়েও গণমাধ্যম ও জনপরিসরে বেশি আলোচনায় এসেছে একাধিক মন্ত্রীর বিতর্কিত ভূমিকা।

একের পর এক দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, স্বজনপ্রীতি ও ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক কেন্দ্র করে চরম অস্বস্তিতে পড়েছে সরকার।

জাতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারের অন্তত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের এমন কিছু নির্দিষ্ট ঘটনা উঠে এসেছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছে। অস্বস্তি হয়ে পড়েছে সরকার।

সরকারের শুরুতেই চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতা’ আখ্যা দিয়ে তোপের মুখে পড়েছিলেন সড়ক পরিবহন মন্ত্রী। ডাক্তারদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারা বা ডেঙ্গু থেকে বাঁচতে ফুল হাতা শার্ট পরে থাকা-এমন বক্তব্য দিয়ে সমালোচনায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী। বিভিন্ন হাসপাতালের তরকারি টেস্ট-করতে দেখা গেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে। এমডিকে রাতে ডেকে নির্দেশ, আত্মীয়দের সচিবালয়ের পাস। বদলি পদোন্নতি নিয়ে ডাক্তারদের অসন্তোষের চিত্র হরহামেশা।

এদিকে সড়ক ও পরিবহন খাতে বহু বছরের পুঞ্জীভূত নৈরাজ্য ও চাঁদাবাজি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দায়িত্ব নিলেও শুরুতেই চরম বিতর্কের জন্ম দেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সড়কের চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে বলেন, মালিক ও শ্রমিক সমিতিগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে যে টাকা তোলে, সেটিকে তিনি ‘চাঁদা’ হিসেবে দেখেন না। বাধ্য করে টাকা নেওয়াকে চাঁদা দাবি করে তাঁর এই বক্তব্য পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেওয়ার শামিল বলে অভিযোগ করেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। নতুন সরকারের শুরুতেই মন্ত্রীর এমন অবস্থান সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন চালকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশাবোধ তৈরি করে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনের একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য গত কয়েক মাসে স্বাস্থ্য খাতকে বারবার আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভেন্টিলেটরের অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর রাজধানীর শাহবাগে এক অনুষ্ঠানে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি একপর্যায়ে হাসপাতালের পরিচালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো উচিত”।

কোনো প্রশাসনিক বা আইনগত প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দেশের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর এভাবে জনসমক্ষে ‘ফাঁসির কাষ্ঠে চড়ানো’ সংক্রান্ত মন্তব্য চিকিৎসকদের পেশাগত চরম অসন্তোষের জন্ম দেয়। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকদের নৈতিকতা ও ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে প্রকাশ্যে বিতর্কিত মন্তব্য করায় চিকিৎসকদের শীর্ষ সংগঠনগুলোর তীব্র প্রতিবাদ ও তোপের মুখে পড়েন তিনি। নিজের লোকজনকে স্বাস্থ্যের টেন্ডার দিতে সম্প্রতি মন্ত্রণালয়টিতে তিনি টেন্ডার কার্যক্রম বন্ধ করেছেন বলে অভিযোগ।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঢিলেঢালা ভাব

দেশের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা গত ছয় মাসে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে খুন হত্যা, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং রাজনৈতিক আড়ালে সহিংসতার ঘটনা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলেও মন্ত্রণালয় থেকে জোরালো কোনো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ দেখা যায়নি। একের পর এক অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষ থেকে যেসব বক্তব্য বা ব্যাখ্যা এসেছে, তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার বদলে মন্ত্রণালয়ের চরম দুর্বলতা ও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেই ফুটিয়ে তুলেছে। মাঠপর্যায়ে পুলিশের কার্যকারিতা ফেরাতে না পারা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—সব মহল থেকেই চরম সমালোচনার শিকার হচ্ছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদকে সরকার এরই মধ্যে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বরাষ্ট্রের নতুন মন্ত্রী আসছেন। পানি সম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এনি নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘোষণা কেবল বাকি।

দুই ছেলের নামে ইউপি গঠন ও ঠিকাদারি কাজ: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর ‘মিরাকল’ বিতর্ক

সবচেয়ে বড় স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের বিরুদ্ধে। প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় নতুন গঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ তাঁর দুই ছেলে (মীর সীমান্ত ও মীর দিগন্ত) এবং পরিবারের নামে করা হলে জাতীয় সংসদেও এটি নিয়ে চরম হট্টগোল হয়। সমালোচনার জবাবে তিনি সংসদে দাবি করেন, এটি কোনো উদ্দেশ্যে করা হয়নি বরং ‘অলৌকিক বা মিরাকেলি’ মিলে গেছে। তবে বিতর্কের এখানেই শেষ নয়; পরে অনুসন্ধানে বের হয়ে আসে তাঁর ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর সীমান্ত ইঞ্জিনিয়ারিং’ সরকারি বিভিন্ন বড় বড় উন্নয়ন কাজের কাজ পেয়েছে। একই সাথে নিজের এলাকায় বিপুল পরিমাণ প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়া ও পরিবারতন্ত্র কায়েমের ঘটনায় সরকারের সততা ও সুশাসনের অবস্থান বড় ধাক্কা খেয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতে অন্ধকার! পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে

সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে অস্থিরতা কাটেনি।পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে এখন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকারের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে সমালোচনার সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে। এই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এর আগেও বিএনপি সরকারে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তার নানা মন্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া এসেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে তিনি বলছেন সময় গোনা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। তার এমন মন্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়াই বেশি আসছে। গ্যাস সংকটের মধ্যেই দেশজুড়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে এই লোডশেডিং। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নাজেহাল অবস্থা সাধারণ মানুষের।ধারাবাহিক লোডশেডিং নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও অনেককে প্রতিবাদ জানাতে দেখা গেছে। এদিকে, দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে দেশের কিছু জায়গায় বিদ্যুৎ অফিসে গ্রাহকরা হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

ভাইরাল ভিডিও ও নেতিবাচক ভাবমূর্তিতে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী

এদিকে পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদকে নিয়ে নেটদুনিয়ায় দেখা গেছে তীব্র বিতর্ক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর একটি আপত্তিকর ও বিতর্কিত ভিডিও ফাইল ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। শুরুতে বিষয়টিকে প্রযুক্তির অপব্যবহার বা ডিপফেক বলে ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও একাধিক অনুসন্ধানে ভিডিওটি ঘিরে নতুন নতুন প্রশ্ন ও তথ্যের জট তৈরি হয়। কাজের সাফল্যের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের এই নেতিবাচক ভিডিও ট্রোল ও বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসায় মন্ত্রিত্বের দায়িত্বশীলতা ও ভাবমূর্তি নিয়ে বড় ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

সরকারের দায়িত্ব পালনের প্রথম ছয় মাসে প্রধানমন্ত্রী পারফরম্যান্স মূল্যায়ন করবেন এবং সে আলোকে মন্ত্রণালয় পুনর্বাণ্টন বা বাদ পড়তে পারেন এমন আগাম ঘোষণা ছিল। যে কারণে মন্ত্রণালয় পারফরম্যান্সের চেয়ে নানা সমালোচনা এবং বিতর্কে জড়িয়ে পড়া মন্ত্রীদের ভাগ্য ঝুলছে প্রধানমন্ত্রী টেবিলে। স্বরাষ্ট্রের পর স্বাস্থ্য ও সড়ক পরিবহনসহ অন্তত চারটি মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন আসন্ন এমন আলোচনা গুঞ্জন আছে।

সরকারের ছয় মাসে মন্ত্রিত্ব এবং মন্ত্রণালয়ের কাজের সমালোচনায় গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুর নূর তুষার বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সিদ্ধান্ত ও কাজকর্ম দেখে মনে হয়—স্বাস্থ্য বিষয়ে তাঁর আরও পড়াশোনা দরকার, কিংবা বিষয়টি বোঝেন এমন মানুষের পরামর্শ নেওয়া উচিত। কারণ, স্বাস্থ্য বিভাগ এভাবে চলতে পারে না।”

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেছেন, “সরকার পরিচালনা এখন আরও অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং, জটিল এবং বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনার বিষয়। এটি কেবল আইনি বাধ্যবাধকতা বা জবাবদিহিতার বিষয় নয়, বরং দক্ষতার সাথে প্রতিষ্ঠান ও মন্ত্রণালয় পরিচালনা করার একটি আধুনিক কনসেপ্ট।”

তিনি মন্তব্য করেন, প্রতিটি পেশাতেই দক্ষতা ঝালিয়ে নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

অতীতের রাজনৈতিক উদ্যোগের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “জিয়াউর রহমান তাঁর দলের নেতাকর্মী ও এমপিদের জন্য রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনা করে সরকারকে তারচেয়েও আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। কারণ বিশ্বজুড়ে নিত্যনতুন পরিবর্তনের সাথে সাথে সরকার পরিচালনার ধরনও বদলে গেছে।”

সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মরহুমা সাহারা খাতুনের উদাহরণ টেনে মাহফুজ আনাম উল্লেখ করেন, দক্ষতার অভাব ও অব্যবস্থাপনার কারণে কাউকে এক মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে নিত্যনতুন প্রযুক্তিভিত্তিক অন্য মন্ত্রণালয়ে (যেমন টেলিযোগাযোগ) দায়িত্ব দেওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত ছিলনা।

দৈনিক আস্থা/এমএইচ