বিয়ের পর নববধূর ধর্ষণ মামলায় কারাগারে বর
- আপডেট সময় : ০৩:১৬:৫৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০২০ বার পড়া হয়েছে
বিয়ের পর নববধূর ধর্ষণ মামলায় কারাগারে বর
ফরিদপুর প্রতিনিধিঃ
ছেলে ও মেয়ের পরিবারের আয়োজনে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিতে ধুমধাম করে বিয়ে করেও অপহরণের পর ধর্ষণের অভিযোগ তুলে স্ত্রীর দায়ের করা মামলায় প্রায় দেড় মাস ধরে কারাগারে রয়েছে রুমন খন্দকার (২০) নামে এক যুবক।
ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের মনোহরপুর গ্রামের বিল্লাল খন্দকারের ছেলের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে।
গতকাল শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে গণমাধ্যমের কাছে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ।
ভুক্তভোগীর পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২২ মে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী একই উপজেলার ডাঙ্গী ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামের মিরাজ মাতুব্বরের মেয়ে মিলা আক্তারের (১৫) সঙ্গে দুই পরিবারের মতামতের ভিক্তি সামাজিকভাবে সকল সামাজিকতা সম্পন্ন করে বিয়ে হয় রুমনের। ৪২ জন বরযাত্রী নিয়ে খাওয়া-দাওয়া শেষে দুই পরিবারের স্বজন, গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতে বিয়ের কার্য সম্পন্ন হয়।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, যদিও কনের বয়স কম হওয়ায় তা আর নিবন্ধন করা হয়নি এবং দুই পরিবারই সম্মতি জানিয়েছিল, প্রাপ্ত বয়স্ক হলে নিবন্ধন করে নেওয়া হবে। পরে কনেকে বিয়ের রঙে সাজিয়ে জমকালো আয়োজনের মধ্যেই নিয়ে যাওয়া হয় বরের বাড়িতে। যে বিয়ের সামাজিক ও ধর্মীয় রীতির প্রমাণাদি ও অনুষ্ঠানের ভিডিও সাংবাদিকদের সরবরাহ করে ভুক্তভোগী রুমনের পরিবার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বিয়ের দুদিন পর সামাজিক রীতি অনুযায়ী কনের বাড়িতে গেলে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। রুমনের মামা হাফিজুর রহমান বলেন, আমার ভাগনের সঙ্গে বাসর রাত থেকে ওই মেয়ের মনোমালিন্য হয়। বাবার বাড়িতে গিয়ে ওই মেয়ে আর আসতে চায় না। কিন্তু আমরা কিছুই বুঝতে পারি না। পরে জানতে পারি, অন্য একজনের সঙ্গে ওই মেয়ের প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। এর পরও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ফিরিয়ে আনা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবারও বাড়িতে ফিরে গেলে আর আসেনি, মেয়েটির পরিবারও আমাদের সঙ্গে কথা বলতে চায়নি।
তার ভাষ্য মতে, এর প্রায় এক মাস পর গত ২ জুলাই গভীর রাতে হঠাৎ করেই তার ভাগনে রুমনকে আটক করে নিয়ে যায় নগরকান্দা থানা পুলিশ। পরদিন থানায় গিয়ে জানতে পারি, ধর্ষণ মামলায় ভাগনেকে আটক করা হয়েছে। ওই মামলায় আদালতে শুনানি হলেও তাদের কোনো কথা শোনেননি সংশ্লিষ্ট বিচারক।
থানা সূত্রে জানা যায়, ২ জুলাই থানায় ওই মামলাটি করেন জহুরন খাতুন (৫২) নামে এক নারী। তিনি বিয়ে হওয়া কিশোরীর সম্পর্কে আপন দাদি।
মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, গত ১৯ জুন বিকেল ৫টায় বাড়ির পাশ থেকে নাতনি মিলাকে একটি মাইক্রোবাসে করে অপহরণ করে নিয়ে যায়। এরপর রুমন খন্দকারদের বাড়িতে রেখে রাতভর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ধর্ষণ করা হয় এবং শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে আঘাত করা হয়। পরদিন সকালে কৌশলে ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে পরিবারকে ঘটনাটি খুলে বলে। পরে তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ওই কিশোরী দাদী ও মামরার বাদী জহুরন খাতুন দাবি করেন, কোনো বিয়ে হয়নি। তবে, ছবি ও ভিডিও বিষয়ে জানতে চাইলে এড়িয়ে যান।
নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রাসুল সামদানি আজাদ বলেন, গত ২ জুলাই জহুরন খাতুন তার নাতিকে নিয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসি সেন্টারের চিকিৎসার ছাড়পত্রসহ নিয়ে থানায় আসেন। যেখানে ধর্ষণের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। তার লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা রুজু করা হয়।
ওসি বলেন, এজাহারে বিয়ের বিষয় উল্লেখ করা হয়নি এবং পুলিশকে কখনো জানানো হয়নি। মেয়েটির বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় সরকারিভাবে বিয়ের কোনো সুযোগই নেই। সামাজিক বিয়ে আইনগত স্বতঃসিদ্ধ নয়। এ ছাড়া কেউ যদি মেডিকেল রিপোর্ট নিয়ে এসে অভিযোগ করে সেক্ষেত্রে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই মামলা নিয়ে থাকি। এক্ষেত্রেও সেটি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে উপ-পরিদর্শক শহিদুল ইসলামকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তদন্ত শেষে আদালতে পুলিশি প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
ফরিদপুর জজ কোর্টের আইনজীবী মোঃ ফারুক হোসেন বলেন, আমাদের দেশে দুই পরিবার ও ছেলে-মেয়ের সম্মতিতে অহরহ বাল্যবিয়ে হচ্ছে, এখানেও তেমনটা হয়েছে। পারিবারিকভাবে বিয়ের পর সংসার হয়েছে তাদের। তবে, আইনের দৃষ্টিতে এই বিবাহ স্বীকৃত নয়। যার কারণে পারিবারিক কলহের জেরে ধর্ষণের মতো অভিযোগে ছেলেটিকে কঠিন মামলার মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছে, যেটি আসলেই অমানবিক।
তিনি আরও বলেন, এটি শুধু রেজিস্ট্রেশনবিহীন বিয়ের কারণে নয়, আমি মনে করি, এটি নৈতিকতার অবক্ষয়। এখানে প্রকাশ্যে মেয়েটি ছেলের বাড়িতে সংসার করেছে, এরপরও সামান্য তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে রেজিস্ট্রেশনের সুযোগ নিয়ে ছেলেটিকে ফাঁসাচ্ছে। আসলে নৈতিকতার কাছে পরিবারটি পরাজিত হয়েছে। নৈতিক আইনকে লঙ্ঘন করে মামলাটি করা হয়েছে।
নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, বিয়েতে সামাজিক ও আইনি সুরক্ষা হিসেবে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। প্রথমে তারা অবৈধ কাজ করেছে, বাল্যবিয়ে আড়াল করতে নিবন্ধন করেননি। পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে কনেপক্ষ এই সুযোগটাকে ব্যবহার করছেন। এখানে কোনো বিয়ে নিবন্ধক (কাজি) যদি জড়িত থাকেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
দৈনিক আস্থা/এমএইচ


















