সংসদে সার সংকট নিয়ে দুই এমপির ভুল তথ্য
- আপডেট সময় : ০২:৪৬:৩০ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ৯৯৮ বার পড়া হয়েছে
সংসদে সার সংকট নিয়ে দুই এমপির ভুল তথ্য
স্টাফ রিপোর্টারঃ
সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের গুলি করে হত্যার ঘটনা ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের নয়, ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৫ সালের মার্চে। অথচ জাতীয় সংসদে সার সংকট নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ এবং বিএনপি থেকে বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি ঘটনাটিকে ২০০১-০৬ সালের সঙ্গে যুক্ত করেছেন।
একই সঙ্গে ওই সময়ে মতিউর রহমান নিজামী পুরো সময় কৃষিমন্ত্রী ছিলেন বলেও দাবি করেছেন চিফ হুইপ।
গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সার সংকট প্রসঙ্গে শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ‘সার সংকটের মধ্যে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত গুদাম ভর্তি, সরকারের সারের মজুদ আবার সেই ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সিনড্রোম; যখন এক বস্তা সারের পরিবর্তে আমার কৃষককে গুলির মুখে জীবন দিতে হয়েছিল।’
পরে শফিকুল ইসলামের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘২০০১ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমি যখন সরকারে ছিলাম, মতিউর রহমান নিজামী সাহেব ছিলেন কৃষিমন্ত্রী। সেই সময়ে কৃষকরা গুলি খেয়েছিল। এই গুলিটার ব্যবস্থা করেছিল তৎকালীন যারা এই দেশের উৎখাত চায়, ধ্বংস চায় তারা।’
দ্য ডিসেন্টের যাচাই অনুযায়ী, উভয়ের বক্তব্যেই দুটি অসত্য তথ্য রয়েছে। প্রথমত, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সারের দাবিতে আন্দোলন করে কৃষক নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পুরো সময় মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী ছিলেন না।
সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর গুলি চালিয়ে হত্যার ঘটনা ২০০১-০৬ সালের নয়; ঘটনাটি ঘটে ১৯৯৫ সালের মার্চে। প্রাসঙ্গিক সার্চ করে ২০০১-০৬ সালে এ ধরনের কোনো ঘটনার খবর মূলধারার সংবাদমাধ্যমে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সালের ওই ঘটনার সময় কৃষিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা মেজর জেনারেল (অব.) এম. মজিদ-উল হক। তিনি ১৯৯১ সালের ১ মার্চ থেকে ১৯৯৫ সালের ২৭ জুন পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন।
অর্থাৎ, ১৯৯৫ সালে সারের দাবিতে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর গুলি চালানোর সময় জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী ছিলেন না। এমনকি ১৯৯১-১৯৯৫ সালের বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভাতেও মতিউর রহমান নিজামী ছিলেন না বলে উইকিপিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়।
২০২৩ সালের ১৫ মার্চ ‘সারের জন্য কৃষক হত্যা, ২৮ বছরে বিচার পায়নি স্বজনরা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে একুশে টিভি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৫ সালের এই দিনে সার, জ্বালানি তেল, কীটনাশক ও কৃষিপণ্যের সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে কৃষকরা আন্দোলন করছিলেন। আন্দোলন দমাতে বিভিন্ন স্থানে পুলিশ গুলি চালায়। ওই মাসে সারা দেশে অন্তত ১২ জন কৃষক নিহত হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে সিন্ডিকেটের কারণে ১শ ৮৬ টাকা বস্তার সার ১ হাজার ৫শ থেকে ১ হাজার ৬শ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল। ন্যায্যমূল্যে সার পাওয়ার দাবিতে জামালপুর, গাইবান্ধা, নাটোর, কুড়িগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় কৃষকরা বিক্ষোভ করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৫ মার্চ জামালপুর সদরের রশিদপুর গ্রামের আব্দুল খালেক এবং ২৯ মার্চ মেলান্দহ বাজারে কবির হোসেন নিহত হন। এ ছাড়া ২২ মার্চ গাইবান্ধার সরকারি গোডাউনে সার নিতে জমায়েত হওয়া কৃষকদের ওপর পুলিশ গুলি চালালে সদর উপজেলার বলমঝাড়ের কৃষক মমিন মণ্ডল এবং গোবিন্দগঞ্জের মহিমাগঞ্জের টুকু মিয়া নিহত হন।
১৯৯৫ সালের ১৬ মার্চ ইত্তেফাকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, আগের দিন অর্থাৎ ১৫ মার্চ টাঙ্গাইলের ঘাটাইলে পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই এক আন্দোলনকারী কৃষক নিহত হন। ওই ঘটনায় আন্দোলনকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ১০ জন আহত হন।
এর পরদিন ২২ মার্চ গাইবান্ধায় দুইজন নিহত হওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়। একই বছরের ২৯ মার্চ ‘সারের দাবিতে বিক্ষোভ, পুলিশসহ নিহত ২’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। মার্চ ও এপ্রিল মাসে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনেও ওই সময়ের সার আন্দোলন ও সহিংসতার ধারাবাহিক বিবরণ পাওয়া যায়।
১৯৯৫ সালের ৪ এপ্রিল ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদ, ছবি ও তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনাল (UPI) এক প্রতিবেদনে জানায়, সারের দাম বৃদ্ধি নিয়ে আগের মাসে সংঘটিত সহিংসতায় ১২ জন কৃষক নিহত হন।
এছাড়া কানাডার ইমিগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি বোর্ডের (Refworld) প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, সার সংকটকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী কৃষকদের বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর অন্তত ১২ জন নিহত হন। ওই সংকটের পেছনে দুর্নীতি, মজুতদারি এবং সরকারি মজুত ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করা হয়।
অর্থাৎ, সারের দাবিতে বিক্ষোভে কৃষক নিহতের ঘটনাটি ২০০১-২০০৬ সালের নয়, ১৯৯৫ সালের।
চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি দাবি করেছেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মতিউর রহমান নিজামী কৃষিমন্ত্রী ছিলেন। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে তিনি পুরো মেয়াদে কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন না।
জামায়াতে ইসলামী থেকে নির্বাচিত মতিউর রহমান নিজামী ২০০১ সালের ১০ অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ২২ মে পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৩ সালের ২২ মে থেকে ২০০৬ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এম. কে. আনোয়ার।
অর্থাৎ, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছরের মেয়াদের মধ্যে নিজামী কৃষিমন্ত্রী ছিলেন প্রায় দেড় বছর। পরবর্তী সময়ে এম. কে. আনোয়ার কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
যদিও সংসদে দেওয়া বক্তব্যে শফিকুল ইসলাম মাসুদ ঘটনাটিকে ২০০১-২০০৬ সালের সময়কালের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, তার বক্তব্যে সারের পরিবর্তে কৃষকদের গুলিতে জীবন দেওয়ার যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে ১৯৯৫ সালের সার আন্দোলনের ঘটনাই মিলে যায়।
আস্থা/এমএইচ



















