গ্লাসগোর রাস্তায় বর্ণবাদের ছায়া
- আপডেট সময় : ০৬:১৩:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬
- / ১০০২ বার পড়া হয়েছে
গ্লাসগোর রাস্তায় বর্ণবাদের ছায়া
আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ
স্কটল্যান্ডের মানুষ সবসময়ই তাদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের জন্য পরিচিত। তারা বলেন, ‘আমরা আমাদের দক্ষিণের প্রতিবেশীদের মতো নই।’ এখানে দক্ষিণের প্রতিবেশী বলতে ইংল্যান্ডকে বোঝানো হয়। স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর গ্লাসগোর সরকারি স্লোগান হলো, ‘People make Glasgow’। শহরের সর্বত্র এই কথাটি দেখা যায়। টি-শার্টে, ভবনের গায়ে, বাসস্টপে, এমনকি মলেও। ২০১৮ সালে ভারত থেকে স্কটল্যান্ডে আসার পর প্রথমেই আমি অপরিচিত মানুষের আন্তরিকতা এবং প্রতিবেশীদের সহযোগিতা পেয়েছিলাম।
মানুষ আমার বিষয়ে কৌতূহলী ছিল। কিন্তু সেই কৌতূহল কখনো অনধিকারচর্চার পর্যায়ে যায়নি। মানুষ সারিতে দাঁড়ানোর নিয়ম মেনে চলত। আমাকে বলত, আমি যেন এখানকারই একজন। শহরের সংগীত, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলো ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। সেখানে বৈচিত্র্য, সৃজনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তির কথা বলা হতো। সব ভালো বিষয়কেই যেন স্বাগত জানানো হতো। একজন বহিরাগত হিসেবে এটি ছিল আমার স্বপ্নপূরণের মতো।
নিজের মতো করে বাঁচা, নিজের মতো করে একা থাকা। মানুষের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও একটি সম্প্রদায়ের অংশ হয়ে ওঠা। এই অভিজ্ঞতা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল। আমি যা ইচ্ছা করতে পারতাম, যা ইচ্ছা পরতে পারতাম। এমনকি রাতেও একা রাস্তায় হাঁটতে পারতাম। বিশেষ করে একজন নারীর জন্য এটি বিরাট এক স্বাধীনতা।
কিন্তু কিছু একটা বদলে গেছে। বিশেষ করে কভিডের পর, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং বছরের পর বছর ধরে চলা কৃচ্ছ্রসাধনের সময়ের পর পরিস্থিতি অন্য রকম হয়ে উঠেছে। এখন আমি উগ্র ডানপন্থি ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার ক্রমবর্ধমান বিস্তার দেখতে পাচ্ছি। আর আমার মনে হচ্ছে, বিশেষভাবে যেন আমার ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
জুনে আমরা গ্লাসগোতে বিশৃঙ্খলা ও বর্ণবাদী হামলার ঘটনা দেখেছি। মুখোশ পরা শত শত বিক্ষোভকারী শহরের রাস্তায় মিছিল করেছে। এশীয় ব্যবসায়ীদের হয়রানি করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, মানুষকে ‘তাদের গায়ের রঙের কারণে’ হামলার শিকার হতে হয়েছে। সেই মাসের শেষ দিকে এডিনবরায় একটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসা কয়েকজন ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়। একটি ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, সে ‘দেশকে রক্ষা করছে’।
জুলাইয়ে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারীরা আবারও গ্লাসগোর রাস্তায় ‘তাণ্ডব’ চালায়। তাদের অনেকের মুখে মুখোশ ছিল। কেউ কেউ বর্ণবাদী গালাগালও করছিল। এ সময় একজন ডেলিভারি কর্মী হামলার শিকার হন।
আমরা মসজিদে ‘বিদ্বেষমূলক গ্রাফিতি’ দেখেছি। নতুন এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ব্রিটেনে প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদ হামলার শিকার হচ্ছে। ফালকার্কে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য ব্যবহৃত একটি হোটেলের বাইরে বিক্ষোভে এক বক্তাকে বলতে শোনা গেছে, জনতাকে ‘ব্রিটেনকে শ্বেতাঙ্গ রাখার’ জন্য এগিয়ে আসতে হবে। স্কটিশ পার্লামেন্টের বাইরেও কর্মীরা ফ্যাসিবাদী কায়দায় বিক্ষোভ করেছে। এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, ওপর থেকে ছড়ানো প্রচারণা কীভাবে বাস্তব জীবনের সহিংস ঘটনায় রূপ নেয়।
এই বাড়তে থাকা শত্রুতার প্রভাব আমিও ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করছি। অপরিচিত মানুষ সরাসরি আমাকে আমার জাতীয়তা, উচ্চারণ, ধর্ম কিংবা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করে। একবার একজন অপরিচিত ব্যক্তি আমাকে বলেছিল, আমার উচ্চারণ অদ্ভুত। এক পরিচিত ব্যক্তি আমাকে বলেছিল, অভিবাসীরা স্থানীয় মানুষের চাকরি কেড়ে নিচ্ছে। অথচ তখন আমি তাকে বলেছিলাম, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি খুঁজে পেতে আমি হিমশিম খাচ্ছি।
মানুষ এখন লাইনে দাঁড়ানোর নিয়মও ভাঙে। সামান্যতেই তারা সংঘাতপূর্ণ আচরণ করে। একসময় গ্লাসগো যে ‘বহিরাগতদের’ ভালোবাসত এবং আপন করে নিয়েছিল, মনে হচ্ছে এখন সেই বহিরাগতরাই উপহাস ও সন্দেহের বিষয় হয়ে উঠেছে। আমি লক্ষ করছি, মানুষ অস্বস্তিকরভাবে দীর্ঘ সময় ধরে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে। গোভানের একটি পানশালায় এক ক্রেতা হঠাৎ জোরে বলে উঠলেন, অভিবাসীরা অপরাধী এবং আমাদের ‘নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া উচিত’।
একদিন বাসে এক বৃদ্ধা মহিলা আমাকে এবং আমার খুব ফর্সা চেহারার, পুরোপুরি ব্রিটিশ স্বামীকে কথা বলা থামাতে বললেন। তিনি বললেন, আমরা যেভাবে কথা বলছিলাম, সেভাবে কথা বলা উচিত নয়। এর কারণ আমরা স্পষ্টতই ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর দম্পতি, অথবা আমাদের কথাবার্তায় স্থানীয়দের মতো উচ্চারণ নেই।
যেসব সহকর্মী সেই আশির দশক বা তারও আগে থেকে এখানে বসবাস করছেন, তারা আমাকে বলেন, স্কটল্যান্ডে আগেও বর্ণবাদী সহিংসতা ঘটেছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতি অন্য রকম মনে হচ্ছে। এখন আমরা বাইরে বের হতেও ভয় পাই। আমাদের উদ্বেগের মাত্রায় স্পষ্ট ও লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। বিপদটি যেন আরও আসন্ন এবং খুব কাছেই।
এ অস্বস্তিকর পরিবর্তনের জন্য আমি কয়েকটি কারণকে দায়ী করি। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়, ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে ওঠা জলবায়ু সংকট এবং মূলধারার কিছু সংবাদমাধ্যমের ডানপন্থি অবস্থান মানুষের মধ্যে প্রতিবেশীদের প্রতি ক্ষোভ ও সন্দেহ বাড়িয়ে দিয়েছে। এরপর এলো করোনা মহামারি। তখন অনেক মানুষ মনে করেছিলেন, তাদের একা ফেলে রাখা হয়েছে। তাদের দেখাশোনা করার কথা যে রাষ্ট্রের, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে সেই দায়িত্ব রাষ্ট্র পালন করছে না। মনে হয়েছিল, একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটও পৃথিবীকে আরও ভালো করতে পারল না। আমরা আরও ন্যায়সংগত, আরও সমতাভিত্তিক কিংবা সবার জন্য আরও সহজলভ্য একটি সমাজ পেলাম না। তার বদলে আমরা দেখছি চরম বৈষম্য। এ বৈষম্য শুধু টিকে নেই, দিন দিন আরও বাড়ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমগুলোও পরিস্থিতি সহজ করছে না। উত্তেজনামূলক ও উসকানিমূলক পোস্টগুলোই সেখানে বেশি গুরুত্ব পায়। সবকিছু মিলিয়ে এমন একটি বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ভিন্ন বর্ণের মানুষের ভয় পাওয়াটা খুবই স্বাভাবিক।
লেইথ ও গ্লাসগোসহ অনেক জায়গায় বর্ণবাদবিরোধী, অভিবাসনপন্থি এবং মানবিকতার পক্ষে সমাবেশ হয়েছে। তারা কুসংস্কার ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট? হাজার হাজার মানুষকে রাস্তায় নেমে বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও বহুসাংস্কৃতিকতার পক্ষে একত্রিত হতে দেখে মন ভালো হয়েছে। কিন্তু এতে আমার মতো মানুষের প্রতি বাড়তে থাকা বিদ্বেষ ও ভয় থেমে যাবে না। তাই এখন যখনই আমি জনসমক্ষে বের হই, আমার মানসিক চাপ বেড়ে যায়। আমি কি একা নিরাপদ? বিপদে পড়লে কীভাবে বের হবো? এমনকি রাগ প্রকাশ করার সামর্থ্যও কি আমার আছে?
অন্যরাও একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমি বুঝতে পারি, কেন অনেক ব্রিটিশ মনে করেন যে, তাদের উপেক্ষা করা হয়েছে এবং তাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। সত্যিই ব্রিটেন একটি বৈষম্যপূর্ণ ও অন্যায্য সমাজ। কিন্তু আমি চাই না সংবাদমাধ্যম মানুষের সহজাত পক্ষপাত ও ভুল ধারণাকে বৈধতা দিক। আমি এটাও চাই না, রাজনীতিকরা ‘নির্মম, ঠান্ডা ক্রোধের’ মতো প্রতিক্রিয়ার আহ্বান জানিয়ে মানুষের সবচেয়ে খারাপ অনুভূতিগুলোকে বৈধতা দিন।
প্রতিবেশীদের মধ্যে ঘৃণা উসকে দেওয়া খুব সহজ। কিন্তু পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা ঘৃণা ও বিভাজন দূর করতে কয়েক দশক লেগে যেতে পারে। যারা অন্যদের বলির পাঁঠা বানিয়ে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়, তারা হলো ক্ষমতাবানরা। আমাদের অবশ্যই বিদ্বেষ, সহিংসতা এবং মানুষকে ‘অন্য’ হিসেবে দেখার প্রবণতার বিরোধিতা করতে হবে।
আমাদের সবার নজর দিতে হবে অভিন্ন জীবনযাপন ও বৈষম্যের দিকে। মনে রাখতে হবে, যে কোনো বিলিয়নিয়ারের চেয়ে আমাদের একে অন্যের সঙ্গে মিল অনেক বেশি। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রকৃত দায় সেই ব্যবস্থার, যে ব্যবস্থা আমাদের বিভক্ত করে রাখতে চায়। যারা দেখতে ও শুনতে আপনার চেয়ে আলাদা, তাদের সঙ্গে কথা বলুন। আপনি বুঝতে পারবেন, আমরা সবাই মানুষ। আমরা এর চেয়ে ভালো কিছু করতে পারি।
লেখক: মানবাধিকার আইনজীবী ও লেখক। গার্ডিয়ানে প্রকাশিত নিবন্ধটি ভাষান্তর করেছেন তহমিনা মিলি।
আস্থা/এমএইচ

















